বিলির আলমারি খুঁজতে লাগল মুসা আর রবিন।
আজেবাজে জিনিসের মধ্যে ঘাটতে ঘাটতে একটা ছেঁড়া জুতো পেয়ে গেল মুসা। বের করে দেখাল। কিশোর, দেখো, সাইজটা বোধহয় ঠিকই আছে।
সাড়ে আট?
মাথা ঝাঁকাল মুসা।
শুধু এতেই প্রমাণ হয় না লেসলি কার্টারিসকে খুন করেছে সে, রবিন বলল।
জবাব না দিয়ে আবার ছবিটার দিকে ফিরল কিশোর।
পেলে কিছু ওর মধ্যে? ছবিটা দেখিয়ে জানতে চাইল রবিন।
বুঝতে পারছি না, নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। তবে মনে হচ্ছে কোন বৈশিষ্ট্য আছে।
কিশোরের পাশে এসে দাঁড়াল রবিন।
আরও জুতো পাওয়া যায় কিনা খুঁজছে মুসা।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল রবিন, মেয়েটা কে?
জানি না, চিন্তিত ভঙ্গিতে কিশোরও তাকিয়ে আছে ওটার দিকে। মনে হচ্ছে কোন বর্ষপঞ্জি থেকে কেটে নেয়া।
ঘুরে দাঁড়াল মুসা। আলমারি থেকে একটা বর্ষপঞ্জি বের করে দেখিয়ে বলল, এটা থেকে নেয়নি তো?
কোন পাতা থেকে ছবিটা কাটা হয়েছে, বের করতে সময় লাগল না। যে পাতায় ছবিটা ছিল, সেখানে চারকোনা কাটা। নিচে একটা নাম।
মিলি হাওয়ার্ড, পড়ল রবিন।
হাওয়ার্ড! চোখের পাতা সরু করে ফেলল কিশোর। পরিচিত লাগছে না!
*
টো ট্রাকে বসে কফি খাচ্ছেন জোসেফ হাওয়ার্ড, এই সময় ফোন এল। দুই ঢোকে বাকি কফিটুকু শেষ করে কাগজের কাপটা ছুঁড়ে ফেললেন বাইরে। এঞ্জিন চালু করে গিয়ার দিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘোরালেন। ছুটলেন হিলটাউন পাসে।
গত দুই মাসে কতবার যে তিনি এখানে এসেছেন, হিসেব নেই আর। চৌরাস্তায় অতিরিক্ত অ্যাক্সিডেন্ট হচ্ছে ইদানীং। বহুবার আসতে হয়েছে তাকে এখানে, দোমড়ানো গাড়ি সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। ব্যাপারটা খুব রহস্যময় মনে হচ্ছে তার কাছে। বিশেষজ্ঞ ডেকে এনে চৌরাস্তার ট্র্যাফিক লাইটগুলো পরীক্ষা করে জানা দরকার, সমস্যাটা কোথায়? কাউন্টি প্ল্যানিং কমিশনে চিঠি লেখার কথাও ভেবেছেন তিনি।
তবে আজ আর ওসব কথা ভাবছেন না। আনমনে গাড়ি চালাতে চালাতে বরং ভাবছেন ছেলেটার কথা। বিলি ফক্স। গতকাল লাঞ্চের সময় গ্যারেজে গিয়েছিল মিলি। ওকে নার্ভাস মনে হয়েছে। আচরণে অস্থিরতা ছিল। কয়েকবার ওকে জিজ্ঞেস করার পর শুধু বিলির নামটা বলেছে। আর কিছু বলেনি।
কয়েক মাস আগে মিলির চাপাচাপিতে ছেলেটাকে কাজে নিয়েছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে একটা মায়া জন্মে গেছে ওর ওপর। পিতৃস্নেহই বলা যায়। ছেলেটার ভাঙা স্বাস্থ্য, বিষণ্ণতা, অমিশুক আচরণ এবং কাজের দক্ষতা ও বিশ্বস্ততা এ সব কিছু তার প্রতি মমতা বাড়িয়ে দিয়েছে তার।
কিন্তু যত মমতাই জন্মাক, বিলি যদি তাঁর একমাত্র মেয়ের অশান্তির কারণ হয়ে থাকে, ওকে বিয়ে করা ছাড়া উপায় থাকবে না। কিন্তু কি বলে ওকে বিদেয় করবেন? কাজের ব্যাপারে কোন খুত পাওয়া যায়নি তার। কোন ছুতো দেখিয়ে বরখাস্ত করা যাবে না। মিথ্যে বলতে পারবেন না তিনি। ছেলেটাকে তিনি পছন্দ করেন, মুখের ওপর এসো না-ও বলে দিতে পারবেন না। তাহলে? আজ বিলির ছুটি। সময় আছে। পরে শান্ত মাথায় ভেবেচিন্তে একটা উপায় বের করা যাবে।
অ্যামবুলেন্সের পেছন পেছন চৌরাস্তায় পৌঁছলেন হাওয়ার্ড। গাড়ি থামিয়ে কাজ শুরু করার আগে চারপাশে একবার চোখ বোলালেন। গর্তে পড়ে আছে। নতুন মডেলের একটা ফোর্ড। একটা পুরানো ট্রাক টেলিফোন পোস্টে নাক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনটা এমন করে রাস্তা জুড়ে রয়েছে, পুবদিকে। যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। গাড়ি জমে গেছে। এই শূন্যতার মাঝেও কি করে যেন ভিড় জমে গেছে কৌতূহলী দর্শকের।
পার্কিং ব্রেক টেনে দিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন হাওয়ার্ড। ট্রাকের পেছনের সরু ফাঁক দিয়ে একবারে একটামাত্র গাড়ি বেরোতে পারে। শেরিফের অফিসের একজন ডেপুটি ওখানে দাঁড়িয়ে গাড়িগুলোকে বের করে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সেদিকে এগিয়ে গেলেন হাওয়ার্ড- কি হয়েছে?
কি আর হবে, বিরক্তকণ্ঠে চেঁচিয়ে জবাব দিল ডেপুটি, পোলাপানের কাণ্ড! বাপের নতুন গাড়ি পেয়েছে। নতুন লাইসেন্স পেয়েছে। চালানো শুরু করেছে বেপরোয়া। ফলে যা ঘটার ঘটেছে। গাড়ির একেবারে পেট বরাবর মেরে দিয়েছে ট্রাক।
ছেলেটার কি অবস্থা?
বাঁচবে বলে মনে হয় না।
আহহা!
বিলির ওপর নতুন করে মায়াটা বেড়ে গেল হাওয়ার্ডের। ওকে ভাগানোর চিন্তাটা মাথা থেকে আপাতত বাদ দিলেন। কিছু করার আগে ব্যাপারটা নিয়ে মিলির সঙ্গে ভালমত আলোচনা করতে হবে। বিলির কতখানি দোষ, বিবেচনা করা দরকার। এমনও হতে পারে।
বুকের বাঁ পাশে তীক্ষ্ণ একটা ব্যথা ভেঙে তছনছ করে দিল সমস্ত চিন্তা ভাবনা। মুখ বিকৃত করে ফেললেন। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। ব্যথা সহ্য করে কোনমতে ফুসফুসে বাতাস টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়লেন।
কি হলো? বুঝতে পারছেন না তিনি। এমন লাগছে কেন? আরেকবার দম নিলেন। বাঁ কাধটা অবশ হয়ে যাচ্ছে। এটাকেই কি বলে হার্টবার্ন? হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে? মিলির আশঙ্কাই ঠিক। অনেক দিন থেকে তাকে চর্বিওয়ালা জিনিস খেতে বারণ করে আসছে। শোনেননি। চর্বিই তার বেশি পছন্দ।
খসখসে গলায় ডেপুটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ট্রাকটা সরাব?
লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া গাড়িগুলোকে সরাতে ব্যস্ত ডেপুটি। হাওয়ার্ডের দিকে না তাকিয়েই বলল, শেরিফকে জিজ্ঞেস করুন।
