আঁতকে উঠল পটেটো। পাগল নাকি! খবরদার, ওই টিকটিকিগুলোর কথা ভুলো না। ওদের ছোট করে দেখলে ভুল করবে। বিশেষ করে কোঁকড়াচুলোটাকে। ওর চোখ দেখেছ? চোখের দিকে তাকালেই ভয় লাগে। মনের ভেতর কি আছে সব যেন দেখতে পায়। মিস্টার হাওয়ার্ডের ক্ষতি করতে যাওয়া তোমার ঠিক হবে না, বিলি। আরেকটা কথা ভেবেছ? ওর। মেয়ে যদি বুঝে ফেলে তুমি ওর বাপকে খুন করেছ, কোনদিন আর ভালবাসবে? চরম ঘৃণা করবে তখন। বরং, অন্য কোনভাবে মিলির মন জয়। করার চেষ্টা চালাও।
ঠিক কথাই বলেছে পটেটো। কিন্তু কোন কিছু নিয়ে বেশি ভাবনা-চিন্তা করতে ভাল লাগে না বিলির। ঝট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শেষ করে ফেলাই ওর পছন্দ। দেরি সহ্য হয় না। তবু এক্ষেত্রে চিন্তা এবং সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।
মিলি সুন্দরী, পটেটো বলল, তা ছাড়া ধনীর একমাত্র কন্যা। ওর মত মেয়ে কোন গুণধর লোককেই বিয়ে করতে চাইবে।
পটেটোর চোখের দিকে তাকাল বিলি, আমার গুণ আছে।
চোখ সরিয়ে নিল পটেটো, হ্যাঁ, তা আছে।
দূরে পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে একটা বড় ট্রাককে নেমে আসতে দেখা গেল। অন্যদিকে হিলটাউন পাস ধরে ছুটে আসছে একটা সাদা ফোর্ড গাড়ি।
বেশ, বিলি বলল, কতটা গুণ আর যোগ্যতা আমার আছে, মিলিকে দেখাব আমি।
মুখ ফেরাল পটেটো। দীর্ঘ একটা মুহূর্ত তাকিয়ে রইল বিলির দিকে। কি করে দেখাবে? গলা কাঁপছে ওর।
হাসল বিলি। আমার ক্ষমতা সম্পর্কে এখনও তোমার পুরোপুরি ধারণা নেই, পটেটো। অনেক কিছু করতে পারি আমি। রাস্তার গাড়িগুলোর দিকে চোখ ফেরাল সে। খেলাটা এখন আর খেলা নেই ওর কাছে, জরুরী কাজ হয়ে উঠেছে। ওর পরিকল্পনার একটা অংশ। একটা সাংঘাতিক পরীক্ষা। ভাবতে গিয়ে হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে। এ পরীক্ষায় জয়ী হতে পারলে A+ দেয়া উচিত তাকে, ভাবল সে।
মিলিও তখন বুঝে যাবে ওর ক্ষমতা। ওর যোগ্যতার প্রমাণ পাবে। ওর। প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে।
কাছাকাছি চলে এসেছে দুটো গাড়ি। ট্র্যাফিক লাইটের দিকে মন ফেরাল বিলি। মগজের কোন এক রন্ত্রে যেন নাড়ীর স্পন্দনের মত টিকটিক করে বাজতে শুরু করল একটা বিশেষ শক্তি। স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। অনুভব করতে পারছে। মাইন্ড-পালসকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছাশক্তির জোরে বিদ্যুৎ সঙ্কেত পাঠিয়ে দুদিকের লাল আলোকে সবুজ করে দিল। গুনতে শুরু করল: এক…দুই…তিন…
ধ্রাম!
প্রচণ্ড শব্দ। সাদা গাড়িটার পেটে গুলো মেরেছে ট্রাক। ডিগবাজি খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে পথের পাশের খাদে গিয়ে পড়ল গাড়িটা। ট্রাকের ড্রাইভারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এলোপাতাড়ি ছুটছে। ঝাঁকি লেগে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল ওতে বোঝাই বাঁধাকপি। একটা টেলিফোন পোস্টে তো খেয়ে অবশেষে থামল ওটা।
হেসে উঠল বিলি। আহ, কি খেলটাই না দেখাল! পায়ের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিল সে। উঠে দাঁড়াল। সত্যি দারুণ! এমনটা সচরাচর দেখা যায় না!
জোর করে হাসল পটেটো। না হাসলে যদি আবার বিলি রেগে যায়। কিন্তু খুশি মনে হলো না ওকে।
ওর বাহুতে থাবা মারল বিলি, কি ব্যাপার, খুশি না নাকি? দেখো, দেখে যাও। এমন খেলা পয়সা দিয়েও পাবে না।
জবাব দিল না পটেটো।
চলো, পটেটোর হাত ধরে টান দিল বিলি। কাছে গিয়ে দেখি।
০৯.
বিলিদের আগাছাভরা পুরানো চত্বরে বড়ই বেমানান লাগছে তিন গোয়েন্দার ভাড়া করে আনা চকচকে নতুন গাড়িটা।
টোকা দিতে দরজা খুলে দিলেন বিলির মা। ঘরে নিয়ে গেলেন তিন গোয়েন্দাকে। ওদের অনুরোধে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন বাড়ির ভেতরটা। হলের শেষপ্রান্তের একটা পুরানো দরজা ধরে টান দিলেন। ক্যাচকোচ করে প্রতিবাদ জানাল মরচে পড়া কজা। বিলির ঘরের বদ্ধ বাতাসের ভাপসা গন্ধ গোয়েন্দাদের নাকে এসে ধাক্কা মারল যেন।
আমার ছেলের স্বভাব ভাল না, মা বললেন, আমি নিজেই স্বীকার করছি সেটা। যে কারণে অনেকেই ওকে দেখতে পারে না। কিন্তু কারও ক্ষতি করার একটা পিঁপড়ে মারারও ক্ষমতা নেই ওর। কি করেছে ও?
দুই সহকারীর দিকে তাকাল কিশোর। ইঙ্গিতে চেপে যেতে বলল ওদের। বিলির মায়ের দিকে ফিরে বলল, এঘরে কয়েকটা মিনিট আমরা একা থাকতে চাই, মিসেস ফক্স। কোন অসুবিধে আছে?
ঘর থেকে পিছিয়ে বেরিয়ে গেলেন বিলির মা। আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে দিল কিশোর। যত আস্তেই লাগাক, কজার প্রতিবাদ বন্ধ করতে পারল না।
বাড়ির বাকি ঘরগুলোও শোচনীয়, তবে এটার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। নরক বানিয়ে রেখেছে বিলি। দিনের বেলাতেও অন্ধকার। জানালার সমস্ত পর্দা, টেনে দেয়া। বাতাস চলাচল করতে পারে না বলে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। ভাপসা গন্ধের মধ্যে শ্বাস নেয়া কঠিন। বিছানাটা অগোছাল। মেঝেতে ছিটানো বহুকালের অধোয়া ময়লা কাপড়-চোপড়। যেখানে সেখানে ফেলে রেখেছে মোটর গাড়ির বাতিল যন্ত্রাংশ। ছাত আর দেয়ালের হেন জায়গা নেই, যেখানে গাড়ির ছবি আর ভিডিও গেমের পোস্টার লাগায়নি। বড় একটা ফিশ অ্যাকোয়ারিয়ামও দেখা গেল। তবে ওটা বিলির কিনা বোঝা গেল না। বহু আগেই শুকিয়ে গেছে। শ্যাওলা শুকিয়ে কালো হয়ে গিয়ে লেগে রয়েছে। নোংরা কাচের দেয়াল আর তলার পাথরে। মাছের চিহ্নও নেই।
পোস্টারগুলোর ওপরে আবার বিভিন্ন ম্যাগাজিন থেকে ছবি কেটে নিয়ে লাগিয়েছে বিলি। বিখ্যাত সব খেলোয়াড়, গায়ক, মডেল আর অভিনেতার ছবি, যাদের সঙ্গে কোনকালে দেখা হয়নি ওর। ওগুলোর পাশে সাটানো ছোট একটা সাদাকালো ছবি দৃষ্টি আকর্ষণ করল কিশোরের। একটা মেয়ে। মডেলগুলোর চেয়ে কম সুন্দরী নয়। বয়েস খুবই কম। কিশোরীই বলা চলে। নিষ্পাপ চাহনি।
