অই, পাগলের বাচ্চা পাগল! গাল দিল এক ড্রাইভার।
বাপের রাস্তা পেয়েছে? বলল আরেকজন।
দুই চালক খেঁকিয়ে উঠে যেন গায়ের ঝাল মেটাতে গাড়ি ছোটাল আরও জোরে।
আপনমনে হাসল বিলি ফক্স। একটা পরিত্যক্ত বাড়ির ছাতে উঠে ছাতের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। এই লাল আর সবুজ আলোর খেলাটা ভিডিও গেমের চেয়ে তার কাছে অনেক বেশি মজার। মানুষকে ভড়কে দিতে পেরে। আনন্দ পায় সে। যাদের চমকে দিচ্ছে তারা প্রায় সবাই পরিচিত বলে মজাটা আরও বেশি।
সব মানুষকেই ভড়কে দিতে চায় না বিলি। যারা শত্রু, শুধু তাদের। ভয় দেখায় ওই সব সহপাঠীদের যারা ওকে নর্দমার কীট মনে করে। ওই সব দোকানদারদের, সে দোকানে ঢুকলেই যারা সন্দেহের চোখে তার দিকে তাকায়। ওই সব শহরবাসীদের যারা তার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকায়, পেছনে আজেবাজে কথা বলে। ওদের কাউকেই ছাড়তে রাজি নয় সে। সুযোগ পেলেই ভোগাবে, এটা তার স্থির সিদ্ধান্ত। ভিডিও আর্কেডে পিজ্জাওলাটার হৃৎপিণ্ড কাবাব বানিয়েছে। একটা মথকে আগুনে পুড়তে দেখলে যতখানি দুঃখ হবে, সেটুকুও নেই তার জন্যে। সামান্যতম অনুশোচনা নেই।
গাড়ি দুটো কোনমতে বেঁচে চলে যাওয়ার পর অপেক্ষা করে বসে আছে সে, এই সময় পটেটোকে আসতে দেখল।
বাড়ির কাছে এসে ওপরে তাকিয়ে বিলি আছে কিনা দেখল পটেটো। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে শুরু করল ওপরে।
জায়গাটা খুব পছন্দ বিলির। চারপাশে বহুদূর চোখে পড়ে। অনেক কিছু দেখা যায়। নিরিবিলি বসা যায়। তার নতুন আবিষ্কৃত এই খেলাটা এখানে বসার আনন্দ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে আরও দুটো গাড়ি আসতে দেখল বিলি। নতুন মডেলের গাড়ি। নিশ্চয় অ্যান্টিলক ব্রেক। এ ধরনের ব্রেক কতটা কাজের পরখ। করে দেখা যাক, ভাবল সে।
পটেটো এসে বসল তার পাশে। কি খবর, দোস্ত? কি করছ?
কিছু না, রাস্তার দিকে তাকিয়ে জবাব দিল বিলি।
কিছু তো একটা করছই।
জবাব দিল না বিলি। চৌরাস্তার দিকে তাকিয়ে একটা মাইন্ড-পালস ছাড়ল। মনের জোরে ঘটনা ঘটানোর ব্যাপারটার নাম দিয়েছে সে মাইন্ড পালস। এরই সাহায্যে ট্র্যাফিক লাইটের লাল আলোকে সবুজ করে দেয় সে, সবুজ আলোকে লাল। দুদিক থেকে যে দুটো গাড়ি আসছে তার একটা জীপ, আরেকটা মিনিভ্যান। সবুজ আলো দেখে গতি কমাল না কেউ। একেবারে কাছাকাছি হওয়ার আগে কেউই বুঝতে পারল না যে অন্যজন গতি কমাবে না। সবুজ আলো দেখেছে দুজনেই, কমাবে কেন? একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্রেক চেপে থেমে দাঁড়াল গাড়ি দুটো। বোঝা গেল কাজের জিনিস অ্যান্টিক ব্রেক।
বাইরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে, পটেটো বলল। এটা শহর না ইঁদুরের গর্ত! বেরোনো উচিত আমাদের। আর ভাল্লাগছে না এখানে। চলো, লাস ভেগাসে চলে যাই। ধ্বংস করার… হেসে ফেলল পটেটো। তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বলল, মানে, আমি বলতে চাইছি, খেলার অনেক নতুন জিনিস পেয়ে যাবে ওখানে।
মাথা নাড়ল বিলি। লাস ভেগাসে যাচ্ছি না আমি। কোথাও যাব না মিলিকে ফেলে।
মিলির নাম উচ্চারণ করতেও ভাল লাগে তার। মনটা আনন্দে ভরে যায়।
মিলি, মিলি বলে বার বার চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়।
বিলির দিকে তাকাল পটেটো। চোখ ঘুরিয়ে বলল, কি করে ভাবলে বললেই ও তোমার সঙ্গে চলে যাবে? স্কুলে ও তোমার দিকে তাকায় না। কথা বলে না।
কথাটা ঠিক। এ নিয়ে অনেক ভেবেছে বিলি। হতে পারে, স্কুলে অন্য কারও সামনে তার দিকে তাকাতে লজ্জা পায় মিলি। কত ধরনের লাজুক মেয়ে থাকে না। মিলিও হয়তো তেমনি। তার মানে এই নয় মিলি ওকে ভালবাসে না। অন্য কেউ সামনে না থাকলে তো কথা বলে। বলবে না-ই বা কেন? বিলি খারাপটা কিসে? স্বাস্থ্য ভাল না। ও অনেকেরই থাকে না। গরীব। সে তো পৃথিবীর বেশির ভাগ লোকই। কিন্তু তার মত অসাধারণ ক্ষমতা আর হকার আছে? এই ক্ষমতা ঠিকমত ব্যবহার করতে পারলে কোটিপতি হতে বেশিদিন লাগবে না।
স্কুলের কথা বাদ দাও, বিলি বলল। ওকে বোঝানো দরকার যে আমি ওকে ভালবাসি।
কি করে?
চৌরাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবতে শুরু করল বিলি। কি করে মন জয় করা যায় মিলির? কি করে বোঝানো যায় সে একজন যোগ্য লোক? গাড়ির দিকে মন নেই আর তার। ট্রাফিক লাইটের দিকে তাকাচ্ছে না। বিড়বিড় করছে, ওকে বোঝাতে হবে ওকে আমি কতটা ভালবাসি। ওর কথা ছাড়া। আর কিচ্ছু ভাবি না আমি।
পটেটো প্রশ্নটা করায় খুশিই হলো বিলি। কি করে মিলিকে তার প্রতি আকৃষ্ট করা যায়, এই ভাবনাটা জোরাল হলো তার মনে।
পটেটোর প্রথম প্রশ্নটার জবাব এখনও দিতে পারেনি বিলি, আরেকটা প্রশ্ন তার পাতে তুলে দিল পটেটো, জনাব মজনু সাহেব, আরও একটা কথা–মিলি তোমার বসের মেয়ে। সেকথাটা ভুলে যেয়ো না।
পা তুলে হাঁটু ভাজ করে বসল বিলি। দুই হাত দিয়ে বুকের ওপর চেপে ধরল দুই পা। সেটা কোন সমস্যাই না।
কেন, সমস্যা নয় কেন?
ওটার ব্যবস্থা আমি করে ফেলতে পারব, কাঁধ ঝাঁকাল বিলি। দিলাম নাহয় ওর মনটাও ধ্বংস করে।
বিলির কথা ঠিক বুঝতে পারল না পটেটো। ওর মন? ও তোমার বস, বিলি…
মরে গেলেই ও আর আমার বস থাকবে না, খারাপ কথাটা এরকম করে বলতে চাইল না বিলি। কিন্তু পটোটোকে নিয়ে সমস্যা হলো ভেঙে না বললে ও কিছু বুঝতে পারে না। মন থাকে হৃৎপিণ্ডে। ওটা কাবাব বানিয়ে দেব। যাবে নষ্ট হয়ে। নিজের রসিকতায় মজা পেয়ে নিজেই হেসে উঠল।
