প্রসঙ্গ থেকে সরে যাওয়ার জন্যে বলল কিশোর, স্যার, বজ্রপাতে মারা। যাওয়া মানুষদের রেকর্ড রাখেন আপনারা?
কাধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্নটাকে যেন ঝেড়ে ফেলে দিলেন ডক্টর। না, রাখি না। আমরা শুধু কবে কোথায় কতবার বজ্রপাত ঘটল, তার রেকর্ড রাখি। মানুষ মরল কি বাচল, সে-খবরে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই।
তারমানে হিলটাউনে বজ্রাহত হয়ে কতজন বেচে গেল, সেটাও নিশ্চয়। বলতে পারবেন না?
ভুরু কুঁচকে ফেললেন বেল। সেটা জানলে কি লাভ হবে তোমার?
দেখতাম আরকি, গায়ে বাজ পড়ার পরেও বেঁচে যায়, ওরা কেমন মানুষ?
কেমন আবার। তোমার আমার মতই স্বাভাবিক মানুষ।
কোনও অসাধারণ ক্ষমতা নেই ওদের বলতে চাইছেন?
নিরাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন ডক্টর, কিশোর পাশা, অযথা সময় নষ্ট করছ তুমি আমার। আমাদের এই প্রতিষ্ঠান একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার। ভুডু কিংবা ব্ল্যাক ম্যাজিকের আখড়া নয়।
একটা ব্রোঞ্জের মূর্তির দিকে তাকাল কিশোর। দেবরাজ জিউসের মূর্তি। হাতের দণ্ড থেকে বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ ছুটছে। মিথলজি যদি বিজ্ঞান গবেষণাগারে থাকতে পারে ম্যাজিক থাকলে দোষ কি?–প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করল তার। বলল, আমিও বিজ্ঞানের কথাই বলছি, স্যার। জাদুবিদ্যা নয়। জানতে চাইছি, বজ্রপাতে আহত মানুষদের মধ্যে এমন কোন পরিবর্তন ঘটে কিনা, এমন কোন ক্ষমতা জন্মায় কিনা, যেটা বিস্ময়কর, অথচ তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে।
কাধ ঝাঁকালেন ডক্টর। শুন্যে দুই হাতের তালু চিত করে বললেন, ক্ষমতা জন্মায় কিনা জানি না, তবে বজ্রাহত হয়েও বেঁচে যায় কিছু কিছু মানুষ। বিদ্যুৎ সহ্য করার ক্ষমতা খুব বেশি ওদের। সব মানুষের সব কিছু সহ্য করার ক্ষমতা এক রকম হয় না। সহজ একটা উদাহরণ দিচ্ছি। পেটের কথাই ধরো। বাদুড়ের পোকা লাগা কাঁচা মাংস খেয়ে হজম করে ফেলতে দেখেছি– আমি অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের। তুমি-আমি কি সেসব খাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারব? যদি বা গিলি, পেটে সহ্য হবে না। ফুড পয়জনিং হয়েই মরে। যাব। মানুষের নানা রকম সহ্য ক্ষমতার এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ দেয়া যায়। তাই বলে ওদেরকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না কোনমতেই।
আমিও ঠিক এই কথাটাই জানতে চাইছি, স্যার, নিজের ধারণার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় খুশি হলো কিশোর। ওসব জিনিস গিলে হজম করতে পারাটাও একটা বিশেষ ক্ষমতা, এটা নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না। নইলে আমি-আপনি পারি না কেন?
তা অবশ্য ঠিক। তবে ক্ষমতা না বলে একে অভ্যাস বললেই ঠিক হবে। আফ্রিকায় কিছু ওঝাকে দেখেছি, ভয়াবহ বিষাক্ত মাম্বা সাপের কামড়েও কিচ্ছু হয় না ওদের। জিজ্ঞেস করেছিলাম। প্রথমে মুখ খুলতে চাইল না। পরে বলল, ছোটবেলা থেকে, অল্প অল্প করে বিষ রক্তে ঢুকিয়ে সহ্য করতে করতে শেষে এমন সহ্যক্ষমতা জন্মেছে, কোন বিষেই আর কিছু হয় না। ঘড়ি দেখলেন ডক্টর বেল। তোমার আর কোন প্রশ্ন আছে?
না, স্যার। অনেক সময় দিলেন। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। চলি, গুডবাই।
দরজার দিকে পা বাড়াল কিলোর।
*
হুয়ারটন কাউন্টি বিল্ডিঙের ফরেনসিক ল্যাবরেটরির ওয়েইটিং রূমে বসে আছে মুসা আর রবিন। দুটো কারণে অপেক্ষা করছে–একটা, ফুলগারাইটের ছাঁচ শুকানোর। আরেকটা, কিশোরের আসার।
বার বার ছাঁচটার দিকে তাকাচ্ছে রবিন। টিপে দেখছে শক্ত হলো কিনা। মুসার দিকে ফিরে বলল, ভাল একটা সূত্র পাওয়া গেল।
তা তো গেল, মুসা বলল। কিন্তু এই সূত্র ধরে এগোনোর উপায়টা কি?
ঘরে ঢুকল কিশোর।
ফুলগারাইটের স্তর থেকে আস্তে করে ছাঁচটা টেনে খুলে আনল রবিন। চমৎকার একটা নকল তৈরি হয়েছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আধখানা জুতোর ছাপ। কিশোরকে দেখিয়ে বলল, অনেক তথ্য জমা হয়ে আছে এখানে, কি বলো?
একটা ব্রাশ দিয়ে ছাঁচের গায়ে লেগে থাকা আলগা প্লাস্টিক আর বালির কণা ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে বলল, দেখে মনে হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড মিলিটারি বুট। সাড়ে আট নম্বর।
ভুরু কোঁচকাল কিশোর। বিরাট পা।
কার, কিছু অনুমান করতে পারছ?
কিশোর জবাব দেবার আগেই মুসা বলল, বিলি ফক্স?
সেই সম্ভাবনাই বেশি, কিশোর বলল। এখনই গিয়ে ওর জুতো পরীক্ষা করা দরকার।
.
০৮.
মহাসড়কের মাঝখানে একটা চৌরাস্তা। চারকোনাতেই ট্র্যাফিক লাইট আছে। গত কয়েক মাস ধরে অতিরিক্ত অ্যাক্সিডেন্ট হচ্ছে এখানে। কারণটা বুঝতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। মহাসড়কে সাধারণত একটানা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে হঠাৎ ট্রাফিকপোস্টে লাল আলো জ্বলতে দেখলে থামতে চায় না। চালকেরা, কিংবা থামতে গড়িমসি করে। সেকারণে দুর্ঘটনা ঘটে অনেক সময়। কিন্তু এ হারে নয়।
সেদিনকার বিষণ্ণ, নিরানন্দ দিনটিতে দুটো গাড়ি ছুটে যাচ্ছে চৌরাস্তার দিকে। বাদামী ক্রাইসলার গাড়িটা দূর থেকেই সবুজ আলো দেখেছে। গতি না কমিয়ে ছুটতে থাকল। অন্য রাস্তা ধরে আসা নীল ইমপালাটাও সবুজ আলো দেখে গতি কমাল না। দুটো গাড়ির একজন চালকও লক্ষ করল না-করার কথাও নয়–চারটে পোস্টের সবুজ বাতিই একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে।
তীব্র গতিতে চৌরাস্তার দিকে ছুটে গেল দুটো গাড়ি। পরক্ষণে নীরবতা খাখা হয়ে গেল টায়ারের তীক্ষ্ণ আর্তনাদে। সাই সাই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একে অন্যের পথ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল।
বেঁচে গেল নেহাত ভাগ্যের জোরে। প্রায় গায়ে গা ছুঁয়ে পাশ কাটাল। একটা আরেকটার।
