বিশ্বাস করতে পারছে না। হাত দিয়ে ডলে সরিয়ে দিতে চাইল ছাপটা। বুঝতে চাইল, সত্যি ছাপ, না কাচের গায়ে পড়া আলোর কারসাজি।
নাহ্, সত্যিই ছাপ! কোন সন্দেহই নেই আর তাতে।
এক কাজ করো না কেন? সহকারীদের দিকে তাকিয়ে বলল কিশোর। এটা নিয়ে কোন ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে চলে যাও পরীক্ষা করানোর জন্যে।
তুমি কি করবে?
বনের দিকে মুখ ফেরাল সে, অবজারভেটরিতে যাব।
.
০৭.
হিলটাউনের বজ্রপাত সম্পর্কে কিছু বলুন, স্যার, অনুরোধ করল কিশোর।
তেমন কিছু বলার নেই। সারা বছরই বজ্রপাত ঘটে এখানে। সময় অসময় নেই।
অস্টাডোরিয়ান লাইটনিং অবজারভেটরির পরিচালক ডক্টর হোমার বেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে কিশোর। পাহাড়ের ঢালে ওক বনের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে বিরাট বিল্ডিংটা। যেন বাইরের কেউ দেখে ফেললে কি জানি কি ক্ষতি হয়ে যাবে। চ্যাপ্টা, লম্বা বাড়িটার ছাতে রেডার অ্যান্টেনা আর মাইক্রোওয়েভ ট্রান্সমিটারের মিলিত চেহারার একটা যন্ত্র। বসানো। পুরো ছাতে খাড়া করে বসানো সারি সারি লাইটনিং রড।
ভেতরে বড় একটা সাজানো গোছানো ঘরে আলোকিত ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে শো করছে বিদ্যুতের ইতিহাস। যে কোন স্কুলছাত্র বিপুল আগ্রহ নিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে ঘরটার দিকে। তবে দেখার জন্যে ওদের যে ঢুকতে দেয়া হয় না, অনুমান করে নিয়েছে কিশোর। শেরিফ রবার্টসন সাহায্য না করলে সে নিজেও ঢুকতে পারত না।
ধূসর হয়ে আসা চুলদাড়ির ফাঁক দিয়ে হাসি দেখা গেল ডক্টর বেলের। ঠোঁটে। সব সময় এখানকার আকাশে মেঘ জমে, মেঘের ফাঁকে বিদ্যুৎ চমকায়, শোনা যায় বজ্রের গুড়ুগুড়ু।
এর কারণ কি, স্যার?
ভুরু উঁচু করলেন বেল। সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি আমরা। এত বেশি জমে কেন এখানে?
স্কাইলাইটের ভেতর দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল কিশোর। ছাতের কোন জায়গা বাদ দেয়া হয়নি। এমনকি স্কাইলাইটেও বসানো হয়েছে। লাইটনিং রড। কাচের ভেতর দিয়ে ছাতের বিরাট কিস্তৃত যন্ত্রগুলো চোখে পড়ছে।
এই রড বসানোর আসলেই কি কোন দরকার ছিল?
বজুকে বিশ্বাস নেই। কখন যে কোথায় গিয়ে পড়বে কেউ জানে না। যত বেশি রড লাগানো যাবে, ওগুলোর আকর্ষণে তত বেশি ছুটে আসবে। বজ্র। কেন ওগুলো ছুটে আসে, জানা সহজ হবে। কেউ কেউ জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে একে। বলে, বজ্রের মন আছে, চিন্তা করার ক্ষমতা আছে।
ডিসপ্লের সামনে পায়চারি শুরু করলেন ডক্টর। তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে নানা প্রশ্ন করতে লাগল কিশোর। নোটবুকে টুকে নিল। ডিসপ্লেতে। নানা ধরনের বজ্রের কথা লেখা আছে। মনোযোগ দিয়ে পড়ল সেগুলো।
নানা রকম যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে টেসলা কয়েল। বাতাস থেকে বিদ্যুৎ শুষে নেয়। আরেকটা আছে জ্যাকবৃস্ ল্যাডার। সমান্তরাল দুটো দণ্ডের একটা আরেকটাকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত নীল বিদ্যুৎ ছুঁড়ে দিচ্ছে। এরকম একটা গবেষণাগারের পরিচালক হওয়ার জন্যে গর্ব বোধ করবেন যে কোন বজ্র বিজ্ঞানী। ডক্টর বেলও তাই করছেন।
ছাতের ওই যন্ত্রটা দিয়ে কি হয়, স্যার? জানতে চাইল কিশোর।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করে জবাব দিলেন ডক্টর, কেমিক্যাল স্টোরেজ। ওয়েট সেল।
রীতিমত অবাক হলো কিশোর। মানে ব্যাটারি?
আঙুল তুলে ঘরের চারপাশটা দেখালেন ডক্টর। এখানকার সমস্ত যন্ত্রপাতি বস্ত্র থেকে শক্তি আহরণ করে চলে, কিশোর। ছাতের রডগুলোতে আঘাত হানে বজ্র। তাকে ধরে ফেলি আমরা। শক্তিটাকে জমিয়ে রেখে কাজে লাগাই। ধরার ব্যবস্থাটা এখনও নিখুঁত করতে পারিনি। তবে আশা করছি, করে ফেলতে পারব।
তার মানে আকাশের যে কোনখান থেকে বুকে টেনে আনার ব্যবস্থা করেছেন আপনারা। যদি কোন কারণে আপনাদের লাইটনিং রডে আঘাত না হানে বজ্র? অন্য কোনখানে গিয়ে পড়ে, তখন? মানে, আমি বলতে চাইছি, স্যার, অ্যাক্সিডেন্ট তো ঘটতেই পারে, তাই না?
প্রশ্ন শুনে আস্তে করে ডিসপ্লের দিক থেকে কিশোরের দিকে ঘুরলেন। ডক্টর। কিশোরের আপাদমস্তক দেখতে দেখতে চেহারায় ভাবের পরিবর্তন ঘটল।
দেখো, লোকে মনে করে আমরা এখানে বসে বজ্র তৈরি করি। যন্ত্রপাতিগুলোর সাহায্যে আকাশে মেঘ জমাই, সেটা থেকে বজ্র.. শান্তকণ্ঠে বললেন তিনি। কিন্তু আমরা সেটা করি না। আকাশে আপনাআপনি মেঘ জমে, বজ্র তৈরি হয়, আমরা সেটা নিয়ে গবেষণা করি মাত্র। বজ্রপাতে শুধু হিলটাউনেই নয়, সারা পৃথিবীতেই মানুষ মারা যায়। তাদের মৃত্যুর জন্যে যেমন আমরা দায়ী নই, হিলটাউনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর জন্যেও আমরা দায়ী নই। আমাদের অবজারভেটরি বসানোর বহু বহুকাল আগে থেকেই বজ্রপাত হত এখানে।
কিন্তু এখনকার মত এত নিশ্চয় হত না?
থমকে দাঁড়ালেন ডক্টর বেল। ভুরু কোচকালেন। কি বলতে চাও?
কিছু মনে করবেন না, স্যার। আমি বলতে চাইছি, আপনাদের। অবজারভেটরি কোনভাবে এখানকার আকাশে মেঘ জমানোয় সাহায্য করছে না তো? হয়তো তাতেই বজ্রপাত হচ্ছে বেশি বেশি…
মোটেও না! রেগে উঠলেন ডক্টর। বোঝা গেল, এই প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে আরও বহুবার হতে হয়েছে। হিলটাউনের আকাশে সব সময়ই মেঘ। বেশি জমত, বজ্রপাত হত বেশি, সেজন্যেই অবজারভেটরি তৈরির জন্যে বেছে নেয়া হয়েছে এই জায়গা।
সরি, স্যার। আমি কিছু ভেবে ওকথা বলিনি…
আবার পায়চারি শুরু করলেন ডক্টর। নরম হলো না ভঙ্গি।
