হুঁ-হাঁ করে করে বেলের কথার জবাব দিচ্ছেন শেরিফ। এই সময় একটা খয়েরি রঙের সীডান গাড়ি এসে থামতে দেখলেন।
ফ্যাক্স করে আমার অফিসে পাঠিয়ে দিতে পারবে? গোয়েন্দাদের দিকে চোখ রেখে ফোনে বললেন শেরিফ। পারলে এখনই পাঠাও। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে, হোমার। রাখি?
সুইচ টিপে লাইন কেটে যন্ত্রটা পকেটে রেখে দিলেন শেরিফ। কাত হয়ে আরেকটা মরা গরুর পাশ কাটিয়ে গাড়িটার দিকে এগোলেন।
গাড়ি থেকে নেমে আসছে তিন গোয়েন্দা।
আরও একটা গরুর পাশ কাটালেন শেরিফ। মাছি ভনভন করছে এটার ওপর।
ছেলেগুলোর মুখোমুখি হতে অস্বস্তি বোধ করছেন তিনি। এরকম ঝামেলায় আর জীবনে জড়াননি। হিলটাউনে অপরাধ খুব কম হয়। মাঝেসাঝে দুচারটে মাতলামি, ঠগবাজি আর ছিঁচকে চুরির ঘটনা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটে না। বড় বড় চুরি-ডাকাতি ঘটার মত সম্পদ নেই শহরটাতে।
ঢাল বেয়ে উঠে আসতে আসতে ওপর দিকে তাকাল কিশোর। কোমরে হাত দিয়ে ওদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন শেরিফ। এমন ভঙ্গি করে আছেন কেন? অস্বস্তি বোধ করছেন নাকি?
এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল কিশোর।
শেরিফ বললেন, খবর তাহলে পেয়ে গেছ?
হেসে মাথা ঝাঁকাল কিশোর। কি দেখলেন? বজ্রপাতেই মারা গেছে?
কেন, অন্য কিছু আশা করেছিলে নাকি?
পত্রিকাওলারা তো বজ্রপাতে মারা যাওয়ার কথাই লিখেছে, ঘুরিয়ে জবাব দিল কিশোর।
মাথা ঝাঁকালেন শেরিফ। আঙুল তুলে দেখালেন। পাহাড়ের ওপরের ঘাসে ঢাকা চত্বরে তিনটে গরু মরে পড়ে আছে।
এগিয়ে গিয়ে ভাল করে দেখল কিশোর। প্রতিটা গরুর শরীর ঝলসে গেছে। রস মত বেরোচ্ছে। ফিরে এসে বলল, তারমানে আসল বজ্রপাতেই মারা গেছে এগুলো, বিড়বিড় করল সে। শেরিফের দিকে তাকাল, রিমোট কন্ট্রোলড নয়।
মাথা দুলিয়ে বললেন শেরিফ, তাই তো মনে হয়। অবজারভেটরির। হোমার বেলের সঙ্গে কথা বললাম এইমাত্র। ওই বনের ওপাশে মাইলখানেক দূরে ওটা।
ফিরে তাকাল কিশোর। যেন গাছপালার মধ্যে কোথায় লুকিয়ে আছে। অবজারভেটরিটা দেখতে চায়।
বজ্রপাতের কথা কিছু বলেছে?
বলেছে। কাল রাতে বেশ কিছু বাজ পড়েছে এই পাহাড়ের ওপর। পৃথিবীর যে কোন জায়গার যে কোন বজ্রপাতের ঘটনা ধরা পড়ে ওদের যন্ত্রে। রেকর্ড থেকে যায়। বিদ্যুৎ চমকালে একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে বেতার তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়,
শুম্যান রেজোন্যান্স বলে একে, শেরিফের মুখ থেকে কথাটা প্রায় কেড়ে নিয়ে বলল কিশোর। বিজ্ঞতা জাহির করে আনন্দ পেতে দিল না তাঁকে। প্রতি সেকেন্ডে আট সাইকেল। সাধারণ ট্রানজিসটর রেডিও দিয়েও ধরা। যায়।
চুপ হয়ে কিশোরের দিকে তাকিয়ে আছেন শেরিফ। এই ছেলেটার সঙ্গে সতর্ক হয়ে কথা বলতে হবে। এ ডক্টর এলিজা নয়। কখন লজ্জা দিয়ে দেবে। কে জানে!
হেসে খোঁচাটা দিয়েই দিল কিশোর, দেখলেন তো, আমি হোমওয়ার্ক ঠিকমতই করি।
হেসে ফেললেন শেরিফ। কাল রাতে যে সাধারণ বজ্রপাতেই মারা গেছে গরুগুলো, এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকার কারণ নেই।
তারমানে সন্দেহ আছে আপনার?
দ্বিধা করলেন শেরিফ, একটা ব্যাপারেই খটকা লাগছে–একসঙ্গে একই জায়গায় এতগুলো বাজ পড়ল কিভাবে? অবস্থা দেখে মনে হয় যেন কেউ ওগুলোকে ঠিক এখানেই পড়তে বাধ্য করেছিল!
কয়েক গজ সরে গিয়ে একটা সমতল জায়গায় দাঁড়ালেন তিনি। ঘাস ওখানে পাতলা। হাত নেড়ে ডাকলেন, এসো, দেখে যাও।
এগিয়ে গেল তিন গোয়েন্দা।
আঙুল তুললেন শেরিফ। জুতোর খোঁচায় সরিয়ে দিলেন খানিকটা জায়গার বালি।
একসঙ্গে ঝুঁকে তাকাল মুসা, কিশোর আর রবিন।
দেখেছ? কালো একটা জিনিস পা দিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন শেরিফ, বলো তো এটা কি? ভাবলেন, এটার জবাব অন্তত দিতে পারবে না। কিশোর। চোখে চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাথা তুলে হাসিমুখে তাকালেন ওর দিকে।
আরেকটু নিচু হয়ে ভাল করে দেখল কিশোর। মুখ তুলে বলল, ফুলগারাইট। তাই না?
হাসি চলে গেল শেরিফের মুখ থেকে। এটাও জানো!
নিরীহ কণ্ঠে জবাব দিল কিশোর, বজ্রপাতে এরকম হয় বজ্র যেখানে পড়ে, প্রচণ্ড তাপে সেখানকার বালি গলে কাচ হয়ে যায়।
মাথা ঝাঁকালেন শেরিফ। উ?
হাত দিয়ে ডলে কালো জিনিসটার ওপরের বালি সরাল কিশোর।
কি করছ?
তদন্ত।
একটা মুহূর্ত চুপ করে রইলেন শেরিফ। তারপর বললেন, কিরতে থাকো। তবে এখানে নতুন আর কিছু পাবে বলে মনে হয় না। আমি যাই। আমার কাজ আছে।
বলে আর দাঁড়ালেন না তিনি। লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন নিজের গাড়ির দিকে।
বসে পড়ল কিশোর। কালো জিনিসটার একপাশে আঙুল ঢুকিয়ে টেনে তোলার চেষ্টা করতে লাগল।
কি করছ? শেরিফের প্রশ্নটাই করল আবার রবিন।
সূত্র খুঁজছি?
কিসের?
এখনও শিওর নই। দেখি আগে।
আর কিছু বলল না রবিন। মুসাও চুপচাপ দেখছে।
কালো, শক্ত কাচটা টেনে তুলতে গিয়ে খানিকটা ভেঙে ফেলল কিশোর। হাতে নিয়ে লেগে থাকা বালির কণা সরিয়ে চোখের সামনে এনে দেখতে লাগল। তারপর বাড়িয়ে দিল দুই সহকারীর দিকে, দেখো এখন। বজ্রপাতে বালি গলে কাচ হয়, এটা বৈজ্ঞানিক সত্য। কিন্তু কাচের মধ্যে মানুষের পায়ের ছাপ পড়ে, এটা কোন সত্য?
খাইছে! বলো কি? ভুতুড়ে কাণ্ড নাকি? ভয়ে ভয়ে কাচটার দিকে তাকাল মুসা। হাতে নেয়ার সাহস করল না।
কিন্তু রবিনের ওসব ভয় তেমন নেই। কাচটা নিয়ে দেখতে লাগল। কালো, পুরু কাচের মধ্যে সত্যিই একটা জুতোর ছাপ। জুতোর তলার সামনের অংশ। পুরোটাই পড়েছিল। পেছনটা রয়ে গেছে মাটিতে গেঁথে থাকা কাচের ভাঙা অংশে।
