ওটা একটা বিশেষ বই ছিল… বলতে গিয়ে থেমে গেলেন ডিকসন। কিশোরের চোখের দিকে তাকালেন। আমাকে এসব প্রশ্ন কেন? বরং ওই চোরটাকে ধরার চেষ্টা করা উচিত তোমাদের।
তা-ই তো করছি। তদন্ত চালাচ্ছি আমরা। জানেন বোধহয়, তদন্ত করতে গেলে অনেক প্রশ্ন করতে হয়।
ভুল লোককে করছ। আমার লোক তোমাদেরকে রেস্টুরেন্টে হুফারের সঙ্গে দেখেছে। শোনো, ওই লোকটাকে পাত্তা দিও না। ওর কথাও শুনো না। হুফার আর ডুফারের মত মানুষের সঙ্গে কারও মেশাই উচিত না। বাজে স্বভাব। ওদের মতই কমিক সংগ্রহ দিয়ে জীবন শুরু করেছিলাম আমিও। কিন্তু আস্তে আস্তে পেশা হিসেবে নিয়ে নিলাম কাজটাকে, ব্যবসা শুরু করলাম। ভালই করছি এখন। ওদের মত শয়তানি করে কাটাচ্ছি না।
ভ্রূকুটি করলেন ম্যাড। এমন সব কাণ্ড করে ওরা, এমন সব ফালতু কারণে রাগ পুষে রাখে, যেগুলোর কোন মানেই হয় না। একবারও ভেবে দেখে না কমিক ডিলার আর কমিকের দোকানদাররাই ওদের বাঁচিয়ে রেখেছে। যেমন হুফার, তেমনি ডুফার। আমাদের মত ব্যবসায়ীদের কষ্ট দিতে পারলেই যেন ওদের যত আনন্দ।
আনমনে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। ম্যাডকে কষ্ট দেয়ার জন্যে কি চুরি করতেও পিছপা হবে না ওরা?
৬
ডিকসনকে তাঁর দোকানের সামনে রেখে আবার রওনা হলো তিন গোয়েন্দা। সেঞ্চুরি যাও ধরে এগোল। ড্রাইভিং হুইল ধরে বসেছে মুসা, সামনের দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। ভাবসাবে মনে হলো, আমাদেরকে তিন গোয়েন্দা না ভেবে তিন ভাঁড় ভেবেছেন ম্যাড। থ্রী স্টুজেস।
এবং তাঁর সেই ভাবনাটারই অবসান ঘটাতে হবে আমাদের, গম্ভীর হয়ে বলল পেছনের সীটে বসা কিশোর। আর তা করতে হলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। জানতে হবে কমিক চুরির সময়টায় সন্দেহভাজনদের কে কোথায় কি করছিল।
ডিকসন কোথায় ছিলেন, জানি, রবিন বলল। আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কিশোর ভাবছে, মিরিনা জরডান কোথায় ছিল, তা-ও জানি। ক্রিমসন, ফ্যান্টম যখন এগিয়ে আসছিল, আমাদের কাছ থেকে তখন সরে যাচ্ছিল মেয়েটা। হয়তো ওকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল…ভাবনাটা ঠেলে সরিয়ে দিল সে। অন্যান্য সন্দেহভাজনদের কথা ভাবতে লাগল। আমি জানতে চাই, নীল বোরাম কোথায় ছিল তখন। আর এডগার ডুফার। বিশেষ করে, আইজাক হুফারের কথা তো জানতেই চাই। প্রশ্নগুলোর জবাব পেলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মাটির নিচের গ্যারেজে গাড়ি রেখে, এলিভেটরে করে উঠে এসে নিজেদের ঘরে ঢুকল তিন গোয়েন্দা। ব্যাগ নামিয়ে রাখল। তারপর রওনা হলো মেইন কনফারেন্স রুমের দিকে। কনভেনশন ডোরের বাইরে অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে ভিড়, কিন্তু ভেতরে যেন আরও বেড়েছে। ঠাসাঠাসি গাদাগাদি হয়ে আছে। রুক্ষ চেহারার সিকিউরিটি গার্ড, সামনের দুটো দাঁত ভাঙা যার, সে আবার ফিরে এসে বসেছে নিজের জায়গায়। তিন গোয়েন্দাকে আটকাল। ভাল করে ওদের হাতের সিল দেখে তারপর ঢুকতে দিল।
সঙ্গীদের নিয়ে ভিড়ের ভেতর দিয়ে ঘরের একধারে চলে এল কিশোর। সারি সারি টেবিল পাতা হয়েছে। টেবিলের সামনে বসে ভক্তদের বাড়িয়ে দেয়া খাতায় অটোগ্রাফ দিচ্ছে কমিক আর্টিস্টরা। কেউ কেউ পেন্সিল দিয়ে কমিকের হিরোর স্কেচ এঁকে দিচ্ছে। কিছু টেবিলে কমিক বই, ম্যাগাজিন, আর ইলাসট্রেশন বোর্ডের সাথে সাথে উঁচু হয়ে আছে পোস্টারের স্তূপ। সেগুলোও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে।
চুটিয়ে ব্যবসা করে চলেছে আর্টিস্টেরা। শত শত লোক সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে টেবিলের সামনে। ছেলে-বুড়ো-মাঝবয়েসী সব বয়েসের সব ধরনের লোক। মানিব্যাগ ভরে টাকা নিয়ে এসেছে। অকাতরে সেগুলো খরচ করছে কমিকের পেছনে। অনেক ভক্তেরই চোখ চকচক করছে তাদের প্রিয় শিল্পীকে দেখতে পেয়ে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে যেন ধন্য হচ্ছে। কিছু কিছু তো আছে, ওদের কাণ্ড দেখে মাথার স্থিরতা সম্পর্কেই সন্দেহ জাগে। খাতায় তো অটোগ্রাফ নিচ্ছেই, বই, পোস্টার যত পারছে কিনে সেগুলোতে নিচ্ছে, গায়ের শার্টে নিচ্ছে, কেউ কেউ কাগজের কফি কাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে আর্টিস্টের দিকে, সই করে দেয়ার জন্যে।
অটোগ্রাফের অনুরোধের সঙ্গে সঙ্গে চলছে নানা রকম প্রশ্ন, ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে আর্টিস্টদের। ধৈর্যের সাথে সই করে দিচ্ছে ওরা, প্রশ্নের জবাব দিয়ে চলেছে, ব্যবসার স্বার্থে। এত মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর কোলাহলে পরিণত হয়েছে।
আপনি না থাকলে স্নাইম ম্যান আর স্নাইম ম্যান থাকত না, জ্যাক, বলল এক ভক্ত। ওকে কেউ আপনার মত করে আঁকতে পারত না।
আরেকজন তরুণ ভক্ত আরেক আর্টিস্টের সামনে এসে চেঁচিয়ে উঠল, রোবট অ্যাভেঞ্জারের বারোটা বাজিয়েছেন আপনি। একমাত্র স্টেবিনস জানত কি করে ওই রোবট আঁকতে হয়। আপনি তো ওটার মাথাকে ভলভো গাড়ির নাক বানিয়ে দিয়েছেন। কিছু হয়েছে ওটা? আপনাকে বের করে দেয় না কেন কোম্পানি? একটা বই বাড়িয়ে ধরে বলল সে, দিন, এখানে একটা সই করে দিন।
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে আর্টিস্ট। আমার আঁকা ভাল না লাগলে অটোগ্রাফ নিতে এসেছ কেন? বইটাই বা কিনেছ কেন?
কিনেছি বিক্রি করার জন্যে। আপনার সই থাকলে ডবল দামে বেচতে পারব।
বিহ্বল ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বইটাতে সই করে দিল আটিস্ট।
