শেরিফকে এগিয়ে দিতে বেরোলেন উইলসন।
শিক খোলার পর খনির ভেতরটা ঘুরে দেখেনি ম্যাকআরথার, অবাকই লাগে, বলল কিশোর। আমার খনি হলে আমি আগে ঘুরে দেখতাম।
বলছিই তো ব্যাটা আস্ত ইবলিস! জিনার সেই এক কথা।
পাঁচ বছর আগে, জানুয়ারি মাসে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর, বাড হিলারি নামের এক ডাকাত, ছাড়া পেল জেল থেকে। এরপর নিয়মিত দুই বার দেখা করল সে স্যান ফ্রানসিসকো পুলিশ অফিসে, তারপর গায়েব। তখন ছিল বসন্তকাল, খনির মুখ বন্ধ করার সময়। পালিয়ে টুইন লেকসে চলে এসেছিল লোকটা, খনিতে পড়ে মরল। কিন্তু স্যান ফ্রানসিসকো থেকে পালানো আর খনিতে পড়ার আগে মাঝখানের সময়টা সে কোথায় ছিল? কি করেছিল? ভিকিখালা, বলতে পারো, টুইন লেকসেই কি ছিল সে।
মাথা নাড়ল ভিকি। টুইন লেকস খুব ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে চেনে। নতুন কেউ এলে চোখে পড়েই।
মাথা ঝাঁকাল কিশোর। ঠিক পুলিশের নজর থেকে পালিয়ে এলে অন্য কারও. চোখে পড়তে চাইবে না। অথচ ইচ্ছে করেই যেন এখানে চোখে পড়তে এল সে।
পাঁচ বছর আগে টুইন লেকসে আসলে কি ঘটেছিল? কিশোরের কথার পিঠে বলল জিনা। একটা চোর ভেতরে থাকতেই বন্ধ করে দেয়া হলো খনির মুখ। এ ব্যাপারে কারও বিশেষ আগ্রহ ছিল না তো? হ্যারি ম্যাকআরথারের মত?
আমার মনে হয় না, টেবিলে শুপ করে রাখা সংবাদপত্রগুলো ঘটছে রবিন। তবু খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি আমরা। তাতে যদি তোমার দুশ্চিন্তা দূর হয়, ভাল।
কি ভাবে?
স্থানীয় খবরের কাগজ, একটা কাগজ তুলে দেখাল রবিন। দি ডেইলী টুইন লেকস। শহরের কোথায় কি ঘটছে না ঘটছে সব ছাপা হয়। এমন কি কার বাড়িতে কবে কজন মেহমান এল সে খবর পর্যন্ত। পুরানো কাগজ ঘাটলে বাড হিলারির ব্যাপারে কিছু বেরিয়েও যেতে পারে।
দারুণ আইডিয়া! আনন্দে হাত তালি দিয়ে জিনা বলল, চলো এখুনি যাই। সম্পাদক সাহেবকে আমি চিনি। আমি আসার খবর পেয়েই এসে দেখা করেছিলেন, কেন এসেছি, কদিন থাকব, নানা রকম প্রশ্ন। ছেপে দিয়েছেন পত্রিকায়। তোমরা যে এসেছ, সে খবরও নিশ্চয় পেয়েছেন। এখনও আসছেন না কেন তাই ভাবছি।
বাড়ি থেকে বেরোতে দেবেন তোমার চাচা? মুসার প্রশ্ন।
দেবে না মানে, একশো বার দেবে। খনি ছাড়া অন্য যে কোন জায়গায় যেতে দেবে।
৭
কিন্তু যেতে দিলেন না উইলসন, স্রেফ মানা করে দিলেন। উপরন্তু তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে গিয়ে লাগিয়ে দিলেন গাছ ছাঁটার কাজে, কড়া নির্দেশ দিয়ে রাখলেন, ডিনারের আগে কতখানি জায়গার গাছ ছাঁটতে হবে। বাড়িতে একা একা বসে আঙুল চোষা ছাড়া আর কিছু করার থাকল না জিনার।
পর দিন সকালে মেজাজ ভাল হয়ে গেল উইলসনের। জিনা যখন বলল তিন গোয়েন্দাকে শহর দেখাতে নিয়ে যেতে চায়, শুধু বললেন, সারাদিন কাটিয়ে এসো না।
না, কাটাব না, বলল জিনা। আর টুইন লেকসে আছেই বা কি, এত সময় দেখবে?
ধুলো-ঢাকা কাঁচা সড়ক ধরে হেঁটে চলল ওরা। পর পর কয়েকটা গাড়ি পাশ কাটাল ওদের, ম্যাকআরথারের বাড়ি যাচ্ছে। একটা গাড়ি থেমে গেল কাছে এসে। জানালা দিয়ে মুখ বের করল একজন, জিজ্ঞেস করল, ডেথ ট্র্যাপ মাইনে কি এদিক দিয়েই যেতে হয়?
হ্যাঁ, বলল জিনা।
থ্যাংকিউ, গাড়ি ছাড়তে গিয়ে কি মনে করে আবার থেমে গেল লোকটা। এই শোনো, তোমরাই কি লাশটা আবিষ্কার করেছ?
হয়েছে! আঁতকে উঠল রবিন। তাড়াতাড়ি জিনার হাত ধরে টান দিল, জিনা, এসো, জলদি। খবরের কাগজ।
এই শোনো, শোনো, গাড়ি থেকে ক্যামেরা হাতে নামছে লোকটা। এই, এক সেকেণ্ড, তোমাদের একটা ছবি
লাগবে না, হাত নেড়ে জবাব দিয়েই হাঁটার গতি বাড়াল মুনা।
প্রায় ছুটতে শুরু করল ওরা। আরেকটা গাড়ি পাশ কাটাল। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দেখছে আরোহীরা।
জানতাম এরকমই হবে, গতি কমাল না কিশোর। গতরাতে টেলিভিশনে খবরে দেখিয়েছে, লোকের কৌতূহল হবেই। সব পাগল। যেন আর কোন কাজ নেই দুনিয়ায়।
খবরদার, ছবি তুলতে দিয়ো না, জিনাকে হুঁশিয়ার করল মুসা। তোমার চাচা রেগে যাবেন।
শহরের প্রধান সড়কে বেশ ভিড়। পথের ধারে গাড়ির মেলা। কোর্ট হাউসের সামনে ঠেলাঠেলি করছে নারী-পুরুষ, ওদেরকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন শেরিফ, ঘেমে নেয়ে উঠেছেন, মুখ-চোখ লাল। এক সঙ্গে কজনের প্রশ্নের জবাব দেবেন?
রিপোর্টারের দল, বলল রবিন। স্টোরি চায়।
ডেইলী টুইন লেকসের অফিসটা এককালে মুদী দোকান ছিল। ওটাকেই সামান্য পরিবর্তন করে প্রেস বসানো হয়েছে। পথের দিকে মুখ করা রয়েছে বিশাল কাচের জানালা, দোকান যে ছিল বোঝাই যায়। ভেতরে গোটা দুই পুরানো নড়বড়ে ডেস্ক। একটাতে বিভিন্ন অফিশিয়াল কাগজ আর পত্রিকা-ম্যাগাজিনের তুপ। আরেকটার সামনে বসে আছেন রোগাটে এক তালপাতার সিপাই, শরীরের যেখানে সেখানে দড়ির মত ফুলে আছে মোটা মোটা রগ। লালচে চুল, তীক্ষ্ণ চেহারা। মহাউত্তেজিত, টাইপ রাইটারের চাবিগুলোতে ঝড় তুলেছেন, একনাগাড়ে টিপে যাচ্ছেন।
আরে, জিনা! দেখেই বলে উঠলেন সম্পাদক। এসো, এসো। তোমার কথাই ভাবছি। লেখাটা শেষ করেই যেতাম। শেরিফের কাছে শুনলাম, তুমিই লাশটা খুঁজে পেয়েছ।
হাসল জিনা। আপনিই স্যার একমাত্র লোক, যিনি খুশি হলেন। ম্যাকআরথার তো পারলে ঘাড় মটকে দিত। শেরিফ বলল, জেলে ভরবে। আর আমার নিজের চাচা, পুরো চোদ্দ ঘন্টা আটকে রাখল বাড়িতে।
