ভারমন্ট বুলভারে ঢুকল গাড়ি, ছোট্ট একটা ফুলের দোকান চোখে পড়তেই বোরিসের বাহুতে হাত রাখল কিশোর। আফ্রিকান ভায়োলেটের একটা তোড়া কিনল সে, উপহারের কার্ডে গুটি গুটি করে কিছু লিখল। তারপর আবার এসে উঠল ট্রাকে।
অ্যাঞ্জেল অভ মারসি হাসপাতালের গেটে গাড়ি রাখল বোরিস। আমি থাকব?
থাকবেন? …আচ্ছা, থাকুন, আমরা আসছি, কেবিনের দরজা খুলল কিশোর।
এবার কীসের খোঁজে?
এক মহিলার সঙ্গে দেখা করব। সাপ!
সাপ! চমকে উঠল বোরিস! এমনভাবে বলেছে কিশোর, যেন গাড়ির ভেতরেই কোথাও রয়েছে সরীসৃপটা।
তা-ও আবার যে-সে সাপ নয়, গান-গাওয়া সাপ! বোরিসকে আরও তাজ্জব করে দিল মুসা।
নামল কিশোর। মুসাকে নামতে মানা করল। বলল, আমি একাই যাই। লোকের চোখে যত কম পড়া যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে।
ঠিক আছে, যেতে হলো না বলে খুশিই মুসা। আমি বসছি।
হাসপাতালে এসে ঢুকল কিশোর। রিসেপশন ডেস্কের ওপাশে বসা মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, মিস অ্যানি পলের সঙ্গে দেখা করা। যাবে?
একটা বাক্সে সাজানো কার্ডে আঙুল চালাল মহিলা নীরবে। নির্দিষ্ট কার্ডটা তুলে পড়ল: রুম নাম্বার দুশো তিন, ইস্ট উইং। মুখ তুলে কিশোরকে বলল, করিডর ধরে চলে যাও, লিফট পেয়ে যাবে। দোতলায় গিয়ে কোন নার্সকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে ঘর।
রিসেপশনিস্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে করিডর ধরে রওনা হলো। কিশোর। লিফটে করে উঠে এল দোতলায়। সামনেই একটা অফিস, লোকজন খুব ব্যস্ত। ফোনে উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন একজন ডাক্তার, ওষুধ আর যন্ত্রপাতির ট্রে নিয়ে কাছেই দাঁড়িয়ে আছে এক নার্স, আরও কিছু ওষুধ নিয়ে ছুটে এল আরেকজন নার্স। তাদের কাছে এসে দাঁড়াল কিশোর, কিন্তু দেখতেই পেল না যেন তাকে কেউ।
রিসিভার নামিয়ে রেখে এক নার্সকে নিয়ে ব্যস্তভাবে বেরিয়ে গেলেন। ডাক্তার। দ্বিতীয় নার্স রইল ফোনের কাছাকাছি, চোখ একটা চাটে।
কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। মিস অ্যানি পলের সঙ্গে দেখা করব, প্লিজ। দুশো তিন নাম্বার।
চার্ট থেকে চোখ ফেরাল নার্স। হবে না। ঘুমের বড়ি খাইয়ে এসেছি।
প্লিজ, সিসটার…
বললাম তো, এখন দেখা করতে পারবে না। নিজের কাজে মন দিল নার্স।
অ! চোখের পলকে চেহারা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল কিশোরের। আমার…আমার চাচী! …চাচী ছাড়া আর কেউ নেই দুনিয়ায়! ফোঁপাতে শুরু করল সে। বাবা-মা অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে! এখন চাচীও যদি যায়… আর বলতে পারল না সে, ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল।
বিস্ময় ফুটল প্রথমে নার্সের চোখে, সেটা করুণায় রূপ নিল। হাত তুলল, দাঁড়াও, খোঁজ নিয়ে দেখি, ঘুমিয়ে পড়ছে কিনা।
দুহাতে চোখ ডলতে শুরু করল কিশোর।
ইউনিফর্মে খসখস আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেল নার্স, ফিরে এল। আধ মিনিট পরেই। এখনও জেগেই আছে, যাও। কিন্তু দেরি করবে না, ঠিক? হাত তুলে একটা দিক দেখিয়ে দিল।
থ্যা-থ্যাঙ্কিউ, সিসটার! হাসি ফুটল কিশোরের মুখে, বড় বড় অপূর্ব সুন্দর দুটো চোখ কান্নাভেজা।
দরজার গায়ে নম্বর দেখে পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল কিশোর। বিছানায় শুয়ে আছেন এক গোলগাল চেহারার মহিলা, ধবধবে সাদা চুল, ঢুলুঢুলু চোখ। কোমর পর্যন্ত কম্বল টানা।
কাছে এসে দাঁড়াল কিশোর। মিস পল? তোড়াটা বাড়িয়ে দিল।
মহিলার ঘুমজড়ানো ধূসর চোখের তারা উজ্জ্বল হলো। বাহ্, কী সুন্দর!
স্পেশাল ভায়োলেট, হাসল কিশোর। একটা লোক আপনাকে দিতে দিল।
বালিশের পাশ থেকে আস্তে করে চশমাটা নিয়ে পরলেন মিস পল। কার্ডটা দেখি?
বিছানার পাশের টেবিলে ফুলদানিতে তোড়াটা গুঁজে রাখল কিশোর, কার্ডটা খুলে নিয়ে দিল মহিলার বাড়ানো হাতে।
কার্ড চোখের সামনে এনে বিড়বিড় করে পড়লেন মিস পল: শুভেচ্ছা-তাড়াতাড়ি সেরে উঠুন। উল্টেপাল্টে দেখলেন। অবাক। আরে! নাম-টাম কিচ্ছু নেই!
চুপ করে রইল কিশোর।
কালও একই কাণ্ড ঘটেছিল, আবার বললেন মহিলা। একটা প্যাকেট, সঙ্গে কার্ড.. নামঠিকানা কিছু নেই! এত ভুলো মন লোকটার!
আমারও তাই মনে হলো, কিশোর বলল। লম্বা ছিপছিপে মানুষ, কালো চুল, ফেকাসে চেহারা।
হুমম! চোখ মুদলেন মিস পল।
ঘুমিয়ে পড়ছেন না তো! অধীর হয়ে উঠেছে কিশোর, এই সময় ঘুমিয়ে পড়লে…হঠাৎ চোখ মেললেন মহিলা। মনে পড়েছে! গতকাল ওই লোকটাই সাপ দিয়েছিল। আজ দিল ফুল।…আশ্চর্য!
সাপ!
হ্যা! …ছোট্ট… চোখ মুদলেন আবার মিস পল, ঘুমিয়ে পড়ছেন।
সাপ? তাড়াতাড়ি বলল কিশোর। সাপ সংগ্রহ করেন নাকি আপনি?
আবার মেললেন ধূসর চোখ জোড়া। না না! ওটা আসল সাপ না! ব্রেসলেট। পছন্দ হলো না… চোখের পাতা কাছাকাছি হতে শুরু করল। মহিলার।
তার মানে সাপের মত? মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করল কিশোর।
হ্যাঁ। …ঠিকানা জানি না তো, নইলে ফেরত পাঠাতাম। দেখাচ্ছি, ড্রয়ারের দিকে হাত বাড়ালেন মিস পল। আমার হ্যান্ডব্যাগে।
তাড়াতাড়ি ড্রয়ার খুলে হাতব্যাগটা বের করে দিল কিশোর।
ব্যাগ খুলে ভেতরে হাতড়ালেন মহিলা। এই…এই যে…বিচ্ছিরি না?
হুঁ! ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের। বেসলেটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। খুদে একটা ধাতব সাপ, কারিগরের বাহাদুরি আছে, স্বীকার করতেই হবে। ফণা তুলে আছে অ্যালুমিনিয়ামে তৈরি একটা সোনালি রং করা গোখরো, গাঢ় লাল পাথরে তৈরি দুটো চোখ, জীবন্ত মনে হয়।
