না করেনি! চেঁচিয়ে উঠল ব্রাইস। ফাদার, আপনি জানেন ও ভুল করেনি!
আহ্, আবার শুরু করলে! বিরক্ত কণ্ঠ ফাদারের। তোমার কি ধারণা, আবার সেই বৃদ্ধ পাদ্রী!
চুপ করুন আপনারা! পেছনে শোনা গেল আরেকটা কণ্ঠ। ফ্র্যাঙ্ক অলিভার। সঙ্গে এসেছে মুসা।
ওই ছেলেটা আমার মেহমান, কিশোরকে দেখিয়ে বললেন অলিভার। আজ রাতে ও আর ওর দুই বন্ধু আমার ঘরেই থাকছে। এই যে, এ হল মুসা আমান। আমাকে বলেছে, খানিক আগে গির্জার ভেতরে আলো দেখেছিল। কিশোরকে ডেকে দেখিয়েছে আলোটা। ব্যাপার কি দেখতে এসেছে কিশোর পাশা।
বিরক্ত চোখে কিশোরের দিক থেকে চোখ ফেরাল দ্বিতীয় পুলিশ অফিসার। মুসাকে দেখল, তারপর তাকাল অলিভারের দিকে। বাচ্চাদের এভাবে চোর-পুলিশ খেলা উচিত না। তাদের পক্ষে একজন বয়স্ক লোকের সাফাই গাওয়া আরও অনুচিত।
স্থির হয়ে গেলেন অলিভার। নাক কোচকালেন।
কিন্তু গির্জার ভেতরে আলো দেখেছি আমি! জোর দিয়ে বলল মুসা।
এবং কেউ একজন ছিল, যযাগ করল কিশোর। কালো আলখেল্লা, সাদা কলার। ফাদার স্মিথ, আপনি যেমন পরেন, তেমনি। ধবধবে সাদা লম্বা লম্বা চুল। হাতে ছিল একটা মোমবাতি।
পোলাপানের গপ্পো! বিড়বিড় করল পুলিশ অফিসার। খোকা, বল না যেন, কিছু চুরি গেছে গির্জা থেকে।
গেছেই তো, বলে বসল কিশোর। গতরাতে ছিল ওটা, এখন নেই। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল ফাদারের দিকে। একটা স্ট্যাচু ছিল ওখানটায়, একটা জানালার পাশে দেয়ালের একটা জায়গা নির্দেশ করল সে। সবুজ ফতুয়া গায়ে, মাথায় চোখা লম্বা, চুড়াঅলা টুপি, হাতে লাঠি।
ফাদারকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দরজার গোড়ায় এসে দাঁড়াল দুই পুলিশ অফিসার।
সত্যিই তো! ঠিকই বলেছে ছেলেটা, বলে উঠল তরুণ অফিসার। গতরাতে একটা মূর্তি ছিল ওখানে, সেইন্ট প্যাট্রিকের মূর্তি সম্ভবত! সব সময় যিনি সবুজ ফতুয়া পরে থাকেন, মাথায় বিশপের টুপি-কি যেন নাম টুপিটার, ফাদার?
দেয়ালের দিক থেকে চোখ ফেরালেন ফাদার। মাইটার, বিড়বিড় করে বললেন। সব সময়ই মাইটার মাথায় রাখেন সেইন্ট প্যাট্রিক, হাতে বিশপের। লাঠি।
তো কোথায় গেল মূর্তিটা? জানতে চাইল পুলিশ অফিসার।
এ গির্জায় কখনও সেইন্ট প্যাট্রিকের মূর্তি ছিল না, অস্বস্তি বোধ করছেন। ফাদার, কণ্ঠস্বরেই বোঝা যাচ্ছে। থাকার কথাও না। এটা সেইন্ট জুডসের গির্জা। অসম্ভবকে সম্ভব করার ব্যাপারে খ্যাতি আছে তার।
হু, তরুণ অফিসারের কণ্ঠে অবিশ্বাস। আপনার হাউসকীপার প্রায়ই বৃদ্ধ ফাদারকে দেখতে পায়, যেটা অসম্ভব। এই ছেলেটা তাকে দেখেছে, এটা অসম্ভব। গতরাতে আমরা কয়েকজন দেখেছি একটা মূর্তি, যা নাকি কখনও ছিলই না এ গির্জায়, এটা আরেক অসম্ভব। এই গির্জার কোথাও এক-আধটা মাইটার আছে?
চমকে উঠলেন যেন ফাদার। গতকাল আনা হয়েছিল। একটা মাইটার আর একটা বিশপের লাঠি।
কেন?
একটা বিশেষ অনুষ্ঠান ছিল, বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন ফাদার। বড়দিন উপলক্ষে। গুরুজনদের সামনে অভিনয় করেছিল বাচ্চা-কাচ্চারা। মধ্যযুগে যেমন হত। ন্যাটিভিটি আর তিন জ্ঞানী লোকের ঘটনা অভিনীত হয়েছিল। অভিনয়ের শেষদিকে এসে ঢোকেন সমস্ত বিখ্যাত ব্যক্তি আর সাধুরা, তাঁদের মাঝে সেইন্ট প্যাট্রিকও থাকেন। সেইন্ট প্যাট্রিক সাজানর জন্যেই ফতুয়া, টুপি আর লাঠি ভাড়া করে আনা হয়েছে। আজ আবার ফিরিয়ে দিয়ে এসেছি ওগুলো যেখান থেকে এনেছিলাম।
হ্যাঁ, হা! চেপে রাখা শ্বাসটা শব্দ করে ফেলল কিশোর। এতক্ষণে বুঝতে পারছি, কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়েছিল চোরটা!
মানে? ভুরু কোঁচকাল তরুণ পুলিশ অফিসার।
একেবারে খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে, ভারিক্কি ভাবটা চেহারায় ফুটিয়ে তুলল কিশোর! গত সন্ধ্যায় এসেছিল এ-পাড়ায়। পাশের গলির এক বাড়িতে ঢুকেছিল। পুলিশের তাড়া খেয়ে এসে ঢুকল গির্জায়। বুঝতে পারল, এখানে ঢুকেও সহজে রেহাই পাবে না। পুলিশ আসবেই। চোখ পড়ল ফতুয়া, মাইটার আর লাঠির ওপর। উপস্থিত বুদ্ধি আছে চোরটার, কোন সন্দেহ নেই। তাড়াতাড়ি সেইন্ট প্যাট্রিক সেজে দেয়ালের গা ঘেঁষে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেল। চোখ এড়িয়ে গেল আপনাদের।
কিশোরের দিকে চেয়ে আছে দুই অফিসার। বিস্ময় ফুটেছে চোখে।
আপনারা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে চলে গেলেন, বলে গেল কিশোর। গির্জার দরজায় তালা দিতে এল দারোয়ান, পল মিন। তখনও বেরোয়নি চোর, কিন্তু বেরোতে হবে। দরজা ছাড়া আর কোন পথ নেই। সেদিক দিয়ে বেরোতে গেলেই চোখে পড়ে যাবে দারোয়ানের। অগত্যা তাকে কোন কিছু দিয়ে মেরে বেহুশ করে পালিয়ে গেল। ফাদার, পলের হুশ ফিরেছে? কথা মনে করতে পারছে সে?
মাথা নাড়লেন ফাদার। তেমন কিছুই না। ও বলেছে, পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল কেউ। তারপর আর কিছু মনে নেই। ওর সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা বলতে দেয়নি ডাক্তার। অবস্থা খারাপই!
হ্যাঁ, শানের ওপর পড়েছিল হয়ত, বলল কিশোর। জোরে বাড়ি খেয়েছে মাথায়। ভাল হয়ে উঠুক। চুরির ব্যাপারে কিছু একটা আলোকপাত করতে পারবে হয়ত—
বেচারা! বিড়বিড় করলেন ফাদার। মস্ত বোকামি করেছি কাল! ওর সঙ্গে আমারও আসা উচিত ছিল!
পুরো ব্যাপারটাই কেমন উদ্ভট! আপনমনেই বলল তরুণ অফিসার। রিপোর্ট কি লিখব! এক চোর, সেইন্টের পোশাক পরে লুকিয়ে থেকেছে! একটা বাচ্চা ছেলে বলছে, সে ভূত দেখেছে…
