একটু পরে অবশ্য উত্তেজনাটা চলে গেল। কর্নেল নিজস্ব লাইন ধরে এগোচ্ছেন। কাজেই আমার চুপচাপ থাকাই উচিত।
কর্নেল ফিরলেন প্রায় আধঘণ্টা পরে। তাঁকে দেখামাত্র আবার উত্তেজনাটা ফিরে এসেছিল। ফুটপাতে নেমে জিজ্ঞেস করলাম, সেই দুনম্বর ভোলাকে দেখলেন তরুণবাবুর অফিসে?
নাহ্। হারাধন কাল বিকেলে নাকি বউয়ের সাংঘাতিক অসুখের খবর পেয়ে বর্ধমানের গ্রামে গেছে। বর্ধমান থেকে ট্রাঙ্ককল এসেছিল। অবনীবাবু বললেন।
লোকটার নাম তাহলে হারাধন?
হ্যাঁ। হারাধন বাগ। কর্নেল হাসলেন। বাঘ বলা চলে। চেহারা দেখে আমার ওইরকম ধারণা হয়েছিল।
আমারও।
তবে হাবভাব বেশ অমায়িক ছিল। ঠিক পুরাতন ভৃত্যমার্কা।
কর্নেল! আমার ধারণা, কাল বিকেলে ওই অফিসে আপনাকে ঢুকতে দেখেই ব্যাটাচ্ছেলে কিছু আঁচ করেছিল। তাই গা-ঢাকা দিয়েছে। আপনার মার্কামারা চেহারা তার মনে থাকারই কথা।
কর্নেল হাসলেন। অবনীবাবুর সঙ্গে কৌশলে কথা বলে জেনেছি, আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে ভোলার কাছে টেলিফোন এসেছিল। তবে সত্যি ট্রাঙ্ককল। কি না বলা কঠিন। মোট কথা, টেলিফোন এসেছিল।
তরুণবাবুর সঙ্গে দেখা হল?
নাহ্। উনি আসেন বারোটায়।
হাঁটতে হাঁটতে বললাম, হঠাৎ লোকটা ঠিক এই সময়ই দেশের বাড়িতে গেল? মুখোমুখি তাকে পেলে আপনার সুবিধে হত!
কর্নেল বললেন, কিছু হত না। অস্বীকার করত। বলে, ট্যাক্সি! ট্যাক্সি! চিৎকার করে উনি প্রায় ঝাঁপিয়ে রাস্তায় গেলেন। একটুর জন্য একটা প্রাইভেট কারের ধাক্কা থেকে বেঁচে গেলেন।
কিন্তু কথাটা বললেই তো বর্মার জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিংয়ের পুরনো কথা তুলবেন। এরকম কত চুলচেরা হিসেবি ঝাঁপ দিয়ে নাকি জাপানি গুলি থেকে বেঁচেছিলেন।…..
০৬. হরিবাবুর অন্তর্ধান
ভবানীপুরের অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী শচীন্দ্রলাল মুখার্জি আজ একেবারে উল্টো মানুষ হয়ে গেছেন দেখে অবাক লাগছিল। প্রথমে কর্নেলের হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আদর করে পাশে বসালেন। তারপর চোখ মুছে বললেন, আমি পাপী! মহাপাপী! তাই আমার এই অথর্ব অবস্থা হয়েছে। হাজারটা অসুখে। ভুগছি। ওদিকে গিন্নিও পক্ষাগাতে শয্যাশায়িনী হয়ে আছেন। আমার মনের অবস্থা বলার মতো নয় কর্নেল সায়েব!
কর্নেল বললেন, বুঝতে পেরেছি। পেরেছি বলেই আবার আপনার কাছে। আসতে দ্বিধা করিনি।
শচীনবাবু এবার চাপা গলায় বললেন, আপনি যে বিচক্ষণ মানুষ, তা আমি প্রথমদিনই টের পেয়েছিলাম। আপনি কাল ঠিকই বলেছিলেন। কার্যত আমি নিজেই বিগ্রহ চুরি করেছিলাম। কিন্তু সেটা যে অমন একটা সাংঘাতিক রিস্কের ব্যাপার, তা আমার মাথায় আসেনি। কারণ ক্রোধ মানুষকে অন্ধ করে। আমি ভাবতেই পারিনি হারামজাদা হরি বোকামি করে বসবে। আমার প্ল্যানটা ছিল সোজা। আফটার অল, তরুণের দেহে আমার বাবার রক্ত আছে। তার বাড়িতে একটা রাত্তির গৃহদেবতাকে রাখা যেত। তারপর পুলিশ সকালে ওটা উদ্ধার করে দিত। তরুণও ফেঁসে যেত। কিন্তু হতচ্ছাড়া হরিটা–
শচীনবাবু কপালে করাঘাত করলেন। কর্নেল বললেন, আসলে রিস্কটা আপনি যত তুচ্ছ ভেবেছিলেন, ততটা ছিল না।
হ্যাঁ। কিন্তু তা তো পরে বুঝেছিলাম। তখন ক্রোধান্ধ হয়ে একটা প্ল্যান ছকেছি। তখন মনে হয়েছিল, গৃহদেবতা একই পরিবারের এক গৃহ থেকে আর। এক গৃহে যাচ্ছেন। সক্কালে আবার ফেরত পাব।
হরিবাবুর ওপর আপনার বিশ্বাস গভীর ছিল বোঝা যাচ্ছে?
হ্যাঁ। তা তো ছিলই। যদি বলেন এখনও কি নেই? আছে। কারণ আমি মানুষ চিনি। সারাজীবন আদালতে আসামি জেরা করে কাটিয়েছি। ক্রিমিন্যাল দেখলেই ধরতে পারি। তাছাড়া হরি একটু সাদাসিধে ধরনের গোবেচারা টাইলস লোক। খুব পরিশ্রমীও বটে। সকাল আটটায় কাজে আসত। রাত দশটা কোনও-কোনও রাতে এগারোটা পর্যন্ত থেকে যেত। কোনওরকম তঞ্চকতাম কাজ করেনি আমার সঙ্গে। আমি মানুষ চিনি কর্নেলসায়েব।
মনে মনে বললাম, ঘোড়ার ডিম চেনেন! তরুণবাবুর চর ছিলেন হরিবার। বিরক্ত হয়ে কর্নেলের দিকে তাকালাম। ভাবলাম, হরিবাবুর চরিত্র ফাস করে দেবেন শচীনবাবুকে। কিন্তু কর্নেল ক্রমাগত দাড়ি নেড়ে সায় দিচ্ছিলেন। এবার বললেন, হরিবাবু আপনার মতোই সব্রাহ্মণ। ওঁর ঘরে আপনার গৃহদেবতার ফোটো বাঁধানো আছে দেখেছি!
আইনজীবী আবেগে বললেন, আমার সব কর্মচারীকে এককপি করে গৃহদেবতার ফোটো আমিই বাঁধিয়ে দিয়েছিলাম।
হরিবাবুর ঘর থেকে ওঁর মামাতো ভাই শ্যামসুন্দরবাবু বিগ্রহ চুরি করে। পালিয়েছিলেন।
হ্যাঁ। হরি বলেছিল। ওর মুখ দেখে মনে হয়েছিল, সত্যি কথা বলেছে। তাহলে ওঁকে বরখাস্ত করেছিলেন কেন?
ওই যে তরুণের বাড়ি গিয়েছিল, সেইজন্য। ওর আত্মীয়ের চাকরির চেষ্টায় গিয়েছিল। সেটা বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু আমার রাগ হয়েছিল, তরুণকে সাধতে গেল কেন?
কর্নেল হাসলেন। আপনি কাল বলেছিলেন, বিগ্রহ চুরির জন্য যাকে-যাকে। সন্দেহ হয়েছিল, তাদের মধ্যে হরিও একজন।
শচীনবাবু কর্নেলের হাত চেপে ধরলেন। ভিজে গলায় বললেন, কালকের কথা ভুলে যান। আজ আমি কনফেস করার জন্য আপনাকে ডেকেছিলাম। তাছাড়া একটা কৌতূহলও হয়েছে।
বলুন মিঃ মুখার্জি।
আইনজীবী আবার চাপা গলায় বললেন, প্লিজ কর্নেলসাহেব! গোপন করবেন না। তরুণই কি আপনাকে বিগ্রহ উদ্ধারের জন্য ধরেছে? তার মানে, আপনার ক্লায়েন্ট কি তরুণ?
