টালিগঞ্জ থানা হয়ে আসছি। অপেক্ষা করুন। কেসটা ওরা ডিল করছে।
কর্নেল ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালেন। গার্ডেনিং জোব্বা এবং দস্তানা খুলতে গেলেন। আবার মনে হলো, একটা ছবি হারিয়ে মাথার ঠিক রাখলেন না বিমলকুমার?
কিন্তু–
একটু চমকে উঠলেন। ঠিক একইভাবে তপেশ বসাক নামধারী বাসুদেব রায় আত্মহত্যা করেছে। মুখের ভেতর আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঢুকিয়ে ট্রিগারে চাপ। চাপা শব্দ। তবে বাসুদেব কষ্ট পেয়েছিল। পিস্তলের গুলি মগজ ভেদ করে গিয়েছিল। সোজা তার গতি। রিভলবারের গুলি ক্রুর মতো পেঁচিয়ে মগজটাকে ছিন্নভিন্ন করেছে। মৃত্যুযন্ত্রণা হয়তো টেরই পাননি বিমলকুমার।…
১১. টেলিফোনে হুমকি
ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ী এলেন একঘণ্টা পরে। কর্নেল তখন সমস্ত কাগজের বিবরণ খুঁটিয়ে পড়ে ফেলেছেন। ঘটনার বর্ণনায় কাগজে কাগজে হেরফের ঘটেছে। তবে জীবনীটা মোটামুটি একই। বিমলকুমার একসময় ক্যালকাটা গ্রুপ অফ পেইন্টার্সের সদস্য ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন ছাত্রজীবনে। পরে রাজনীতি ছেড়ে দেন। ঠিক স্বেচ্ছায় ছাড়া বলা যায় না। পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন ছয়ের দশকের শেষাশেষি।
অরিজিৎ বসে বললেন, আর্টিস্ট ভদ্রলোককে নিয়ে মাথাব্যথা কেন, বসুন। তারপর আমি ঝুলি খুলছি।
কর্নেল বিষণ্ণভাবে বললেন, ওঁর কাছে একটা পোর্টেট আঁকতে গিয়েছিলুম গতকাল বিকেলে। গিয়ে দেখি স্টুডিওর ভেতর ছবি তছনছ করছেন পাগলের মতো! কী একটা ছবি চুরি গেছে না কি। অবস্থা দেখে ফিরে এলুম। তারপর সকালে কাগজে দেখি, আত্মহত্যা করেছেন।
আসলে খুব হতাশায় ভুগছিলেন ভদ্রলোক। অরিজিৎ পাইপ বের করে তামাক ভরতে ভরতে বললেন, যাই হোক, আপনার কাছে একটা সূত্র পাওয়া গেল। ছবি চুরি গেছে! ভেরি ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট।
ষষ্ঠীকে কফি বলা ছিল। কফি এবং স্ন্যাক্স রেখে গেল। কর্নেল পেয়ালায় কফি ঢালতে ঢালতে বললেন, বডি কোথায় কী অবস্থায় পাওয়া যায় এবং কে প্রথম দেখতে পায়?
রাত সাড়ে নটা নাগাদ পাশের ফ্ল্যাটের মিঃ ও মিসেস প্রধান ইভনিং শো দেখে ফেরেন। বিমলবাবু ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ছিল। পর্দা ঘেঁড়া ছিল। করিডর থেকে ওঁরা দেখতে পান, ঘর–মানে স্টুডিওর ভেতর সব ভাঙচুর অবস্থা। মেঝেয় চিৎ হয়ে পড়ে আছে বিমলবাবু। মুখে রিভলবারের নল ঢোকানো।
এবং ট্রিগারে আঙুল?
হ্যাঁ। অরিজিৎ পাইপ রেখে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন। একটা কাজু বাদাম চিবুতে চিবুতে বললেন, যে পুলিশ অফিসার যান প্রথমে, তার সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল যে, ওভাবে গুলি ছোঁড়ার পর ট্রিগারে হাত এবং মুখে নল ঢোকানো থাকতে পারে কি না। যত সামান্যই হোক, বডি নড়ে যাবেই। রিভলবার ছিটকে পড়বেই।
ঠিক ধরেছ।
তাছাড়া চিরকুটের লেখার তলায় নাম সই নেই!
সে কী!
তবে লেখাটা মিলিয়ে দেখা হয়েছে। বিমলবাবুরই হস্তাক্ষর। ইন্সট্রাকশান দিয়েছি ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে এক্সপার্টদের কাছে পাঠাতে। রিভলবারের বাঁটে এবং ট্রিগারে আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু হঠাৎ আপনার পোর্টেট আঁকানোর সাধ কেন হলো, জানতে পারি?
অরিজিৎ মিটিমিটি হাসছিলেন। কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, বুড়ো হয়েছি। কখন কেঁসে যাই, ঠিক নেই। ষষ্ঠী দেখবে আর নমো করবে। সে ছাড়া আর কে আছে আমার, বলো?
অরিজিৎ গম্ভীর হয়ে বললেন, উঁহু ঝুলি খুলুন, আমি খুলেছি। এবার আপনার পালা।
কর্নেল তাকালেন তার দিকে। বিষণ্ণ দৃষ্টি। কিন্তু কিছু বললেন না।
অরিজিৎ আস্তে বললেন, তপেশ বসাকের সুইসাইডের পদ্ধতির সঙ্গে হুবহু মিল। এখানেই খটকা লাগছে। আচ্ছা কর্নেল, আপনি কি সত্যিই দরজার ফুটো দিয়ে তপেশবাবুকে আত্মহত্যা করতে দেখেছিলেন?
হ্যাঁ।
পিস্তল মুখে ঢোকানো ছিল এবং ট্রিগারে আঙুল?
না। ছিটকে পড়েছিল মেঝেয়। বাসুদেব—
উঁহু, তপেশ।
ওর প্রকৃত নাম বাসুদেব রায়। তপেশ বসাক হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার একটু আগে বাসুদেব তার পকেট থেকে আইডেন্টিটি কার্ড তুলে নেয়। সে কথা পরে বলবখন।
অরিজিৎ কিছুক্ষণ চুপচাপ কফি খাওয়ার পর বললেন, মোতিগঞ্জের ঘটনার সঙ্গে বিমলবাবুর আত্মহত্যা বা হত্যার সম্পর্ক আছে। ইজ ইট?
কর্নেল আস্তে বললেন, হয়তো আছে–হয়তো নেই।
প্লিজ হেঁয়ালি করবেন না! ঝেড়ে কাসুন।
এখনও আমি গভীর অন্ধকারে, ডার্লিং! কর্নেল চুরুট ধলেন। ধোঁয়ার ভেতর ফের বললেন, হাথিয়াগড় থেকে মিঃ শর্মা কোনো মেসেজ পাঠাননি?
নাঃ!
মোতিগঞ্জে বাসুদেব কার কাছে গিয়েছিল, এটা জানতে পারলে অর্ধেক রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায়।
তাই বুঝি?
বাই দা বাই, তপেশ বসাকের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কথা বলেছিলুম। এটা প্রত্যাহার করছি। বাসুদেব রায় অথবা কেয়া রায়ের নামে কোন-কোন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে, জানা দরকার জরুরি অরিজিৎ!
কেয়া রায়? হু ইজ শি?
বাসুদেবের স্ত্রী।
ও হ্যাঁ–মনে পড়েছে। কাল যে মহিলা তার মায়ের সঙ্গে সুশোভনবাবর জামা প্যান্ট সোয়েটার সনাক্ত করতে গিয়েছিলেন?
কেয়া আমাকে বলেছে, তার বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ড আর ইনসিওরেন্সের টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে। তাহলে তার অ্যাকাউন্টে বেশি টাকা থাকার কথা না। তার চেয়ে বড় কথা, তার অ্যাকাউন্টে টাকা ডিপোজিটের ফ্রিকোয়েন্সিই বলে দেবে কী ঘটেছে। চেক অথবা ক্যাশ ডিপজিট, সেটাই জানা ভাইটাল।
