আমরা এখন নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছি। কুয়াশা এত ঘন যে, জাহাজ এগোতে পারছে না। তাই এই সুযোগে কয়েকটি চিঠি লিখছি।
এ এক অদ্ভুত কুয়াশা, প্রায় অভেদ্য, যদিও সূর্য উজ্জ্বলভাবে ও সহাস্য কিরণ দিচ্ছে। আমার হয়ে শিশুকে চুম্বন দেবেন এবং আপনার ও মিসেস স্টার্ডির জন্য ভালবাসা ও আশীর্বাদ।
বিবেকানন্দ
পুনঃ—দয়া করে মিসেস মূলারকে আমার ভালবাসা জানাবেন। আমি এভিনিউ রোডে রাত্রিকালীন কামিজটা (Night Shirt) ফেলে এসেছি। অতএব ট্রাঙ্কটি না আসা পর্যন্ত আমাকে বিনা কামিজেই চালাতে হবে।
২৩৬*
R. M. S. ‘Britannic’
বৃহস্পতিবার প্রভাত
৫ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় এলবার্টা,
কাল সন্ধ্যায় তোমার সুন্দর চিঠিখানা পেয়েছি। আমাকে যে মনে রেখেছ, এটা তোমার সহৃদয়তা। আমি শীঘ্রই ধর্মনিষ্ঠ দম্পতিকে দেখতে যাচ্ছি। মিঃ লেগেট একজন ঋষি, এ-কথা আমি তোমাকে আগেই বলেছি, এবং তোমার মা হলেন একজন আজন্ম সম্রাজ্ঞী, তাঁরও ভেতরে ঋষির হৃদয়।
তুমি আলপস্ পর্বত খুব উপভোগ করছ জেনে আমিও আনন্দিত। আলপস্ নিশ্চয়ই বিস্ময়কর। এরকম জায়গাতেই মানুষের আত্মা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করে। কোন জাতি আধ্যাত্মিক দিক্ থেকে দীন হলেও বাহ্য স্বাধীনতা কামনা করে। লণ্ডনে একজন সুইস যুবকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। সে আমার ক্লাসে আসত। লণ্ডনে আমি খুবই কৃতকার্য হয়েছিলাম, এবং যদিও কোলাহলপূর্ণ নগরটা আমার ভাল লাগত না, আমি মানুষদের পেয়ে খুব সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। এলবার্টা, তোমাদের দেশে বৈদান্তিক চিন্তাধারা প্রথমে অজ্ঞ ‘বাতিকগ্রস্ত’ ব্যক্তিদের দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল, সেই প্রবর্তনের ফলে সৃষ্ট নানা অসুবিধার মধ্য দিয়ে কাজের পথ তৈরী করে নিতে হয়। তুমি হয়তো লক্ষ্য করেছ, আমেরিকায় আমার ক্লাসগুলিতে উচ্চশ্রেণীর নরনারী—কখনও কখনও যোগ দিয়েছেন, তাও মুষ্টিমেয়। আবার আমেরিকায় উচ্চশ্রেণীর লোকেরা ধনী হবার ফলে তাঁদের সমস্ত ঐশ্বর্য সম্ভোগ করিতে ও ইওরোপীয়দের অনুকরণ (বোকার মত?) করতে করতে কাটে। অপর পক্ষে, ইংলণ্ডে বৈদান্তিক মতবাদ দেশের সেরা জ্ঞানী ব্যক্তিদের দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছে এবং ইংলণ্ডের উচ্চশ্রেণীর মধ্যে বহু লোক আছেন, যাঁরা বিশেষ চিন্তাশীল। তুমি শুনে অবাক হবে, এখানে আমি ক্ষেত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত পেয়েছিলাম, এবং বিশ্বাস করি যে, আমার কাজ আমেরিকার চেয়ে ইংলণ্ডে বেশী সফল হবে। এর সঙ্গে ইংরেজ চরিত্রের প্রচণ্ড একগুঁয়েমি যোগ দাও এবং নিজেই বিচার কর। এই থেকে তুমি দেখতে পাবে যে, ইংলণ্ড সম্বন্ধে আমার মত অনেকখানি পাল্টে গিয়েছে, এবং আমি সানন্দে তা স্বীকার করি। আমি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিন্ত যে, আমরা জার্মানীতে আরও ভাল করব। পরবর্তী গ্রীষ্মে ইংলণ্ডে ফিরে আসছি। ইতোমধ্যে আমার কাজ খুবই উপযুক্ত লোকের হাতে আছে। জো জো আমেরিকায় যেমন ছিলেন, তেমনি আমার সদয় মহৎ পবিত্র বন্ধু আছেন এবং তোমাদের পরিবারের কাছে আমার ঋণ অশেষ। হলিস্টার ও তোমাকে আমার ভালবাসা ও আশীর্বাদ।
ষ্টমারটি কুয়াশার জন্য নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজের খাজাঞ্চী খুব সদয় হয়ে আমার একার জন্য একটা গোটা কেবিন দিয়েছে। এরা মনে করে, প্রত্যেক হিন্দুই একজন রাজা এবং খুব নম্র—অবশ্য এই মোহ ভেঙে যাবে যখন তারা জানবে যে, ‘রাজা’ কপর্দকশূন্য!! ভালবাসা ও আশীর্বাদ জেনো।
তোমাদের
বিবেকানন্দ
২৩৭*
228, West 39th St. N.Y.
৮ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় মিসেস বুল,
আপনার পত্রে আমায় যে আহ্বান জানিয়েছেন, তার জন্য অজস্র ধন্যবাদ। দশ দিন অতি বিরক্তিকর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর আমি গত শুক্রবার এখানে পৌঁছেছি। সমুদ্র ভয়ানক বিক্ষুদ্ধ ছিল এবং জীবনে এই সর্বপ্রথম আমি ‘সমুদ্রপীড়ায়’ (sea-sickness) অতিশয় কষ্ট পেয়েছি। আপনি একটি পৌত্র লাভ করেছেন জেনে আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি; শিশুটির মঙ্গল হোক। দয়া করে মিসেস এ্যাডামসন ও মিস থার্সবিকে আমার ঐকান্তিক ভালবাসা জানাবেন।
ইংলণ্ডে আমি জনকয়েক বিশিষ্ট বন্ধু রেখে এসেছি। আগামী গ্রীষ্মে ফিরে যাব, এই আশায় তাঁরা আমার অনুপস্থিতিকালে কাজ করবেন। এখানে আমি কি প্রণালীতে কাজ করব, তা এখনও স্থির করিনি। ইতোমধ্যে একবার ডেট্রয়েট ও চিকাগো ঘুরে আসবার ইচ্ছা আছে—তারপর নিউ ইয়র্কে ফিরব। সাধারণের কাছে প্রকাশ্যভাবে বক্তৃতা দেওয়াটা আমি একেবারে ছেড়ে দেব স্থির করেছি; কারণ আমি দেখছি, আমার পক্ষে সর্বোৎকৃষ্ট কাজ হচ্ছে—প্রকাশ্য বক্তৃতায় কিম্বা ঘরোয়া ক্লাসে একদম টাকাকড়ির সংস্রব না রাখা। পরিণামে ওতে কাজের ক্ষতি হবে এবং খারাপ দৃষ্টান্ত দেখান হবে।
বিভিন্ন স্থানে স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী গোষ্ঠীর আমি পক্ষপাতী। তারা নিজেদের কাজ নিজেদের মত করুক, তারা যা খুশী করুক। নিজের সম্বন্ধে আমার এইটুকু বক্তব্য যে, আমি নিজেকে কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়াতে চাই না। আশা করি, আপনার শরীর মন ভাল আছে। ইতি
সদা প্রভুপদাশ্রিত
বিবেকানন্দ
২৩৮*
228, West 39th St., New York
৮ ডিসেম্বর, ১৮৯৫
প্রিয় জো জো,
এ-যাবৎ যত সমুদ্রযাত্রা করেছি, তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক দশদিনব্যাপী সমুদ্রযাত্রার পরে নিউ ইয়র্কে পৌঁছেছি। একাদিক্রমে দিনকয়েক বড়ই পীড়িত ছিলাম।
