শশীকে পূর্বে লিখিয়াছি সবিশেষ। খবরের কাগজ, পুস্তকাদি পাঠাইও না। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে—দেশেও ঘুরে মরা, এদেশেও তাই, বাড়ার ভাগ বোঝা বওয়া। এদেশে আমি কেমন করে লোকের পুস্তকের খদ্দের জোটাই বল? আমি একটা সাধারণ মানুষ বৈ নয়। এদেশের খবরের কাগজ প্রভৃতিতে যাহা কিছু আমার বিষয় লেখে, আমি তাহা অগ্নিদেবকে সমর্পণ করি। তোমরাও তাহাই কর। তাহাই ব্যবস্থা।
ঠাকুরের কাজের জন্য একটু হাঙ্গামের দরকার ছিল, তা হয়ে গেছে, বেশ কথা; এক্ষণে ইতরগুলো কি বকে না বকে, তাতে কোন রকমে তোমরা কর্ণপাত করিবে না। আমি টাকা রোজগার করি বা যা করি, হেঁজিপেঁজি লোকের কথায় কি তাঁর কাজ আটকাবে? ভায়া, তুমি এখন ছেলেমানুষ। আমার চুলে পাক ধরেছে। হেঁজিপেঁজি লোকদের কথায় আর মতামতের উপর আমার শ্রদ্ধা আঁচে বুঝে লও। তোমরা যতদিন কোমর বেঁধে এককাট্টা হয়ে আমার পিছে দাঁড়াবে, ততদিন পৃথিবী একত্র হলেও কোন ভয় নাই। ফলে এই পর্যন্ত বুঝিলাম যে, আমাকে অতি উচ্চ আসন গ্রহণ করিতে হইবে। তোমাদের ছাড়া আর কাহাকেও পত্র লিখিব না। ইতি।
বলি, গুণনিধি কোথায় আছে, খোঁজ করে তাকে মঠে যত্ন করে আনবার চেষ্টা করিবে। সে লোকটা অতি sincere (অকপট) ও বড়ই পণ্ডিত। তোমরা দুটো জায়গার ঠিকানা করবেই করবে, যে যা বলে, বলে যাক। খবরের কাগজে আমার স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে কে কি লেখে, লিখুক; গ্রাহ্যমধ্যেই আনবে না। আর দাদা, বার বার ব্যাগত্তা করি,৩৯ আর ঝুড়ি ঝুড়ি খবরের কাগজাদি পাঠাইও না। বিশ্রাম এখন কোথায়? আমরা যখন শরীর ছেড়ে দিব, তখন কিছুদিন বিশ্রাম করিব। ভায়া, ঐ তেজে একবার মহোৎসব কর দিকি। রৈ রৈ হয়ে যাক। ওয়া বাহাদুর! সাবাস! নিধে পেলার দল প্রেমের তরঙ্গে ভেসে চলে যাবে।তোমরা হলে হাতী, পিঁপড়ের কামড়ে কি তোমাদের ভয়?
তোমার প্রেরিত Address (অভিনন্দন) অনেক দিন হল এসেছে এবং তার জবাবও চলে গেছে প্যারীবাবুর নিকট।
এই কথা মনে রেখো—দুটো চোখ, দুটো কান, কিন্তু একটা মুখ। উপেক্ষা, উপেক্ষা, উপেক্ষা। ‘ন হি কল্যাণকৃৎ কশ্চিৎ দুর্গতিং তাত গচ্ছতি।’৪০ ভয় কার? কাদের ভয় রে ভাই? এখানে মিশনরী-ফিশনরী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ক্ষান্ত হয়ে গেছে—অমনি সকল জগৎ হবে।
‘নিন্দন্তু নীতিনিপুণাঃ যদি বা স্তুবন্তু
লক্ষ্মীঃ সমাবিশতু গচ্ছতু বা যথেষ্টম্।
অদ্যৈব বা মরণমস্তু শতান্তরে বা
ন্যায্যাৎ পথঃ প্রবিচলন্তি পদং ন ধীরাঃ॥’৪১
কিমধিকমিতি। হেঁজিপেঁজিদের সঙ্গে মেশবারও আবশ্যক নাই। ওদের কাছে ভিক্ষেও করতে হবে না। ঠাকুর সব জোটাচ্ছেন এবং জোটাবেন। ভয় কি রে ভাই? সকল বড় কাজ মহা বিঘ্নের মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে। হে বীর ‘স্মর পৌরুষমাত্মনঃ উপেক্ষিতব্যাঃ জনাঃ সুকৃপণাঃ কামকাঞ্চনবশগাঃ।’৪২ এক্ষণে আমি এদেশে দৃঢ়প্রতিষ্ঠ। অতএব আমার সহায়তার আবশ্যক নাই। কিন্তু আমার সহায়তা করিতে যাইয়া ভ্রাতৃস্নেহাৎ তোমাদের মধ্যে যে পৌরুষের আবির্ভাব হইয়াছে, তাহা প্রভুর কার্যে নিযুক্ত কর, এই তোমাদের নিকট আমার প্রার্থনা। মনের ভাব বিশেষ উপকার বোধ না হইলে প্রকাশ করিবে না। প্রিয় হিতবচন মহাশত্রুরও প্রতি প্রয়োগ করিবে।
হে ভাই, নামযশের ধনের ভোগের ইচ্ছা জীবের স্বতই আছে। তাহাতে যদি দুদিক চলে তো সকলেই আগ্রহ করিতে থাকে। ‘পরগুণ-পরমাণুং পর্বতীকৃত্য’ অপিচ, ত্রিভুবনের উপকারমাত্র ইচ্ছা মহাপুরুষেরই হয়। অতএব বিমূঢ়মতি অনাত্মদর্শী তমসাচ্ছন্নবুদ্ধি জীবকে বালচেষ্টা করিতে দাও। গরম ঠেকলেই আপনি পালিয়ে যাবে! চাঁদে থুথু ফেলবার চেষ্টা করুক; ‘শুভং ভবতু তেষাম্’ (তাদের মঙ্গল হউক)। যদি তাদের মধ্যে মাল থাকে, সিদ্ধি কে বারণ করতে পারে? যদি ঈর্ষাপরবশ হয়ে আস্ফালন মাত্র করে তো সব বৃথা হবে।
হরমোহন মালা পাঠিয়েছেন। বেশ কথা। বলি, এদেশে আমাদের দেশের মত ধর্ম চলে না। তবে এদের দেশের মত করে দিতে হয়। এদের হিন্দু হতে বললে এরা সকলে পালিয়ে যাবে ও ঘৃণা করবে, যেমন আমরা খ্রীষ্ট-মিশনরীদের ঘৃণা করি। তবে হিঁদুশাস্ত্রের কতক ভাব এরা ভালবাসে, এই পর্যন্ত। অধিক কিছুই নয় জানিবে। পুরুষেরা অধিকাংশই ধর্ম-টর্ম নিয়ে মাথা বকায় না, মেয়েদের মধ্যে কিছু কিছু, এইমাত্র—বাড়াবাড়ি কিছুই নাই। ২/৪ হাজার লোক অদ্বৈতমতের উপর শ্রদ্ধাবান। তবে পুঁথি, জাতি, মেয়েমানুষ নষ্টের গোড়া—ইত্যাদি বললে দূরে পালিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে সব হয়। Patience, purity, perseverance (ধৈর্য, পবিত্রতা, অধ্যবসায়)। ইতি—
নরেন্দ্র
১৪৯
[স্বামী শিবানন্দকে লিখিত]৪৩
আমেরিকা
১৮৯৪
প্রিয় শিবানন্দ,
এইমাত্র তোমার পত্র পেলাম। সম্ভবতঃ ইতোমধ্যে তুমি আমার অন্য চিঠিগুলি পেয়েছ এবং জেনেছ যে, আর আমেরিকায় কিছু পাঠাবার দরকার নাই। কোন কিছুরই বাড়াবাড়ি ভাল নয়। এই যে খবরের কাগজগুলো আমায় বাড়িয়ে তুলছে, তাতে আমার খ্যাতি হয়েছে সন্দেহ নাই, কিন্তু এর ফল এখানকার চেয়ে ভারতে বেশী। এখানে বরং রাতদিন খবরের কাগজে নাম বাজতে থাকলে উচ্চশ্রেণীর লোকদের মনে বিরক্তি জন্মায়; অতএব যথেষ্ট হয়েছে। এখন এই সকল সভার অনুসরণে ভারতে সঙ্ঘবদ্ধ হতে চেষ্টা কর। আর এদেশে কিছু পাঠাবার দরকার নাই। প্রথমে মাতাঠাকুরাণীর জন্য একটি জায়গা করবার দৃঢ়সঙ্কল্প করেছি, কারণ মেয়েদের জায়গাই প্রথম দারকার। … যদি মায়ের বাড়ীটি প্রথমে ঠিক হয়ে যায়, তাহলে আর আমি কোন কিছুর জন্য ভাবি না। … আমি ইতিপূর্বেই ভারতবর্ষে চলে যেতাম, কিন্তু ভারতবর্ষে টাকা নাই। হাজার হাজার লোক রামকৃষ্ণ পরমহংসকে মানে, কিন্তু কেউ একটি পয়সা দেবে না—এই হচ্ছে ভারতবর্ষ। এখানে লোকের টাকা আছে, আর তারা দেয়। আসছে শীতে আমি ভারতবর্ষে যাচ্ছি। ততদিন তোমরা মিলেমিশে থাক।
