‘অসিতগিরিসমং স্যাৎ কজ্জলং সিন্ধুপাত্রে
সুরতুরুবরশাখা লেখনী পত্রমুর্বী।
লির্খতি যদি গৃহীত্বা সারদা সর্বকালং—’৩৫
‘যদি সাগর মস্যাধার, হিমালয় পর্বত মসী, পারিজাতশাখা লেখনী, পৃথিবী পত্র হয়, এবং স্বয়ং সরস্বতী লেখিকা হইয়া অনন্তকাল লিখিতে থাকেন,’ তথাপি তোমাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা-প্রকাশে অসমর্থ হইবে।
গত বৎসর গ্রীষ্মকালে আমি এক বহু দূরদেশ হইতে আগত, নাম-যশ-ধন-বিদ্যাহীন, বন্ধুহীন, সহায়হীন, প্রায় কপর্দকশূন্য পরিব্রাজক প্রচারকরূপে এদেশে আসি। সেই সময় আমেরিকার নারীগণ আমাকে সাহায্য করেন, আহার ও আশ্রয় দেন, তাঁহাদের গৃহে লইয়া যান, এবং আমাকে তাহাদের পুত্ররূপে, সহোদররূপে যত্ন করেন। যখন তাঁহাদের নিজেদের যাজককুল এই ‘বিপজ্জনক বিধর্মী’কে৩৬ ত্যাগ করিবার জন্য তাঁহাদিগকে প্ররোচিত করিতেছিলেন, যখন তাঁহাদের সর্বাপেক্ষা অন্তরঙ্গ বন্ধুগণ এই ‘অজ্ঞাতকুলশীল বিদেশীর, হয়তো বা সাংঘাতিক চরিত্রের লোকটির’ সঙ্গ ত্যাগ করিতে উপদেশ দিতেছিলেন, তখনও তাঁহারা আমার বন্ধুরূপে বর্তমান ছিলেন। এই মহামনা নিঃস্বার্থ পবিত্র নারীগণই—চরিত্র ও অন্তঃকরণ সম্বন্ধে বিচার করিতে অধিকতর নিপুণা, কারণ নির্মল দর্পণেই প্রতিবিম্ব পড়িয়া থাকে ।
কত শত সুন্দর পারিবারিক জীবন আমি দেখিয়াছি; কত শত জননী দেখিয়াছি, যাঁহাদের নির্মল চরিত্রের, যাঁহাদের নিঃস্বার্থ অপত্যস্নেহের বর্ণনা করিবার ভাষা আমার নেই। কত শত কন্যা ও কুমারী দেখিয়াছি, যাহারা ‘ডায়না দেবীর ললাটস্থ তুষারকণিকার ন্যায় নির্মল’—আবার বিলক্ষণ শিক্ষিতা এবং সর্বাধিক মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতিসম্পন্না। তবে কি আমেরিকার নারীগণ সকলেই দেবীস্বরূপা? তাহা নহে, ভাল মন্দ সকল স্থানেই আছে। কিন্তু যাদের আমরা অসৎ নামে অভিহিত করি, জাতির সেই দুর্বল মানুষগুলির দ্বারা সে সম্বন্ধে ধারণা করিলে চলিবে না; কারণ উহারা তো আগাছার মত পড়িয়াই থাকে। যাহা সৎ উদার ও পবিত্র, তাহা দ্বারাই জাতীয় জীবনের নির্মল ও সতেজ প্রবাহ নিরূপিত হয়।
একটি আপেল গাছ ও তাহার ফলের গুণাগুণ বিচার করিতে হইলে কি যে-সকল অপক্ব অপরিণত কীটদষ্ট ফল মাটিতে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়িয়া থাকে, তাহাদের সাহায্য লও যদিও কখনও কখনও তাহারাই সংখ্যায় অধিক? যদি একটি সুপক্ব ও পরিপুষ্ট ফল পাওয়া যায়, তবে সেই একটির দ্বারাই ঐ আপেল গাছের শক্তি সম্ভাবনা ও উদ্দেশ্য অনুমিত হয়, যে শত শত ফল অপরিণত রহিয়া গিয়াছে, তাহাদের দ্বারা নহে।
তারপর, আমি আমেরিকার আধুনিক রমণীগণের উদার মনের প্রশংসা করি। আমি এদেশে অনেক উদারমনা পুরুষও দেখিয়াছি, তাঁহাদের মধ্যে কেহ আবার অত্যন্ত সঙ্কীর্ণভাবাপন্য সম্প্রদায়ের। তবে একটি প্রভেদ আছে—পুরুষগণের পক্ষে একটি বিপদাশঙ্কা এই যে, তাঁহারা উদার হইতে গিয়া নিজেদের ধর্ম খোয়াইয়া বসিতে পারেন, কিন্তু নারীগণ যেখানে যাহা কিছু ভাল আছে, তাহার প্রতি সহানুভূতিহেতু উদারতা লাভ করিয়া থাকেন, অথচ নিজেদের ধর্ম হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না। তাঁহারা প্রাণে প্রাণে স্বতই অনুভব করেন যে, ধর্ম একটি ইতিবাচক (positive) ব্যাপার, নেতিবাচক (negative) নহে; যোগের ব্যাপার, বিয়োগের নহে। তাঁহারা প্রতিদিন এই সত্যটি হুদয়ঙ্গম করিতেছেন যে, প্রত্যেক জিনিষের হাঁ-এর দিকটাই, ইতিবাচক দিকটাই সঞ্চিত থাকে এবং প্রকৃতির এই অস্তিবাচক—এবং এই হেতু গঠনমূলক শক্তিসমূহের একীকরণ দ্বারাই পৃথিবীর নাস্তিবাচক ভাবগুলি বিনষ্ট হইয়া থাকে।
চিকাগোর এই বিশ্ব-মহামেলা কী অদ্ভুত ব্যাপার! আর সেই ধর্মমহামেলা, যাহাতে পৃথিবীর সকল দেশ হইতে লোক আসিয়া নিজ নিজ ধর্মমত ব্যক্ত করিয়াছিল, তাহাও কী অদ্ভুত! ডাক্তার ব্যারোজ ও মিঃ বনির অনুগ্রহে আমিও আমার ভাবগুলি সর্বসমক্ষে উপস্থাপিত করিবার সুযোগ পাইয়াছিলাম। মিঃ বনি কী অদ্ভুত লোক! একবার ভাবিয়া দেখ দেখি, তিনি কিরূপ দৃঢ়চেতা ব্যক্তি, যিনি মানসনেত্রে এই বিরাট অনুষ্ঠানটির কল্পনা করিয়াছিলেন এবং উহাকে কার্যে পরিণত করিতেও প্রভূত সফলতা লাভ করিয়াছিলেন। তিনি আবার যাজক ছিলেন না; তিনি নিজে একজন উকিল হইয়াও যাবতীয় ধর্মসম্প্রদায়ের পরিচালকগণের নেতা ছিলেন। তিনি মধুরস্বভাব, বিদ্বান ও সহিষ্ণু ছিলেন—তাঁহার হৃদয়ের গভীর মর্মস্পর্শী ভাবসমূহ তাঁহার উজ্জ্বল নয়নদ্বয়ে ব্যক্ত হইত। … ইতি
বিবেকানন্দ
১৪৮
[স্বামী অভেদানন্দকে লিখিত]
আমেরিকা
(নভেম্বর), ১৮৯৪
প্রিয় কালী,
তোমার পত্রে সকল সমাচার জ্ঞাত হইলাম। ‘ট্রিবিউন’ পত্রে উক্ত টেলিগ্রাফ বাহির হওয়ার কোন সংবাদ পাই নাই। চিকাগো নগর ছয়মাস যাবৎ ত্যাগ করিয়াছি, এখনও যাইবার সাবকাশ নাই; এজন্য বিশেষ খবর লইতে পারি নাই। তোমার পরিশ্রম অত্যন্ত হইয়াছে, তার জন্য তোমায় কি ধন্যবাদই বা দিই? অদ্ভুত কার্যক্ষমতা তোমরা দেখাইয়াছ। ঠাকুরের কথা কি মিথ্যা হয়? তোমাদের সকলের মধ্যে অদ্ভুত তেজ আছে। শশী সাণ্ডেলের বিষয় পূর্বেই লিখিয়াছি। ঠাকুরের কৃপায় কিছু চাপা থাকে না। তবে তিনি সম্প্রদায়স্থাপনাদি করুন, হানি কি? ‘শিবা বঃ সন্তু পন্থানঃ’৩৭। দ্বিতীয়তঃ তোমার পত্রের মর্ম বুঝিলাম না।আমি অর্থসংগ্রহ করিয়া আপনাদের মঠ স্থাপন করিব, ইহাতে যদি লোকে নিন্দা করে তো আমার কোন ক্ষতিবৃদ্ধি দেখি না। কূটস্থ বুদ্ধি তোমাদের আছে, কোন হানি হইবে না। তোমাদের পরস্পরের উপর নিরতিশয় প্রেম থাকুক, ইতর-সাধারণের উপর উপেক্ষাবুদ্ধি ধারণ করিলেই যথেষ্ট। কালীকৃষ্ণবাবু অনুরাগী ও মহৎ ব্যক্তি। তাঁহাকে আমার বিশেষ প্রণয় কহিও। যতদিন তোমরা পরস্পরের উপর ভেদবুদ্ধি না করিবে, ততদিন প্রভুর কৃপায় ‘রণে বনে পর্বতমস্তকে বা’ তোমাদের কোন ভয় নাই। ‘শ্রেয়াংসি বহুবিঘ্নানি’,৩৮ ইহা তো হইবেই। অতি গম্ভীর বুদ্ধি ধারণ কর। বালবুদ্ধি জীবে কে বা কি বলিতেছে, তাহার খবরমাত্রও লইবে না। উপেক্ষা, উপেক্ষা, উপেক্ষা ইতি।
