অবসরমত দয়া করে আমার সম্বন্ধে সব কথা লিখবে। তোমার কাগজে আমি সময়ে সময়ে ক্ষণিকের জন্য তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে থাকি। ‘ইণ্ডিয়ান মিররের’ মহানুভব সম্পাদক মহাশয় আমার প্রতি সমানভাবে অনুগ্রহ করে আসছেন—সেজন্য তাঁকে অনুগ্রহপূর্বক আমার পরম ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানাবে।
কবে আমি এদেশ ছাড়ব জানি না। তোমাদের থিওসফিক্যাল সোসাইটির মিঃ জজ (Mr. Judge) ও অন্যান্য অনেক সভ্যের সহিত আমার পরিচয় হয়েছে। তাঁরা সকলেই খুব ভদ্র ও সরল, আর অধিকাংশই বেশ শিক্ষিত।
মিঃ জজ খুব কঠোর পরিশ্রমী—তিনি থিওসফি প্রচারের জন্য সম্পূর্ণরূপে জীবন সমর্পণ করেছেন। এদেশে তাঁদের ভাব লোকের ভিতর খুব প্রবেশ করেছে, কিন্তু গোঁড়া ক্রিশ্চানরা তাঁদের পছন্দ করে না। সে তো তাদেরই ভুল। ছয় কোটি ত্রিশ লক্ষ লোকের মধ্যে এক কোটি নব্বই লক্ষ লোক কেবল খ্রীষ্টধর্মের কোন না কোন শাখার অন্তর্ভুক্ত। ক্রিশ্চানগণ বাকী লোকদের কোনরকম ধর্মই দিতে পারেন না। যাদের আদতে কোন ধর্ম নেই, থিওসফিষ্টরা যদি তাদের কোন না কোন আকারে ধর্ম দিতে কৃতকার্য হন, তাতে গোঁড়াদেরই বা আপত্তির কারণ কি, তা তো বুঝতে পারি না। কিন্তু খাঁটি গোঁড়া খ্রীষ্টধর্ম এদেশ হতে দ্রুতগতিতে উঠে যাচ্ছে। এখানে খ্রীষ্টধর্মের যে রূপ দেখতে পাওয়া যায়, তা ভারতের খ্রীষ্টধর্ম হতে এত তফাত যে, বলবার নয়। ধর্মপাল, তুমি শুনে আশ্চর্য হবে যে, এদেশে এপিস্কোপ্যাল ৩৩ এমন কি, প্রেসবিটেরিয়ান৩৪চার্চের ধর্মাচার্যদের মধ্যে আমার অনেক বন্ধু আছেন। তাঁরা তোমারই মত উদার, আবার তাঁদের নিজের ধর্ম অকপটভাবে বিশ্বাস করেন। প্রকৃত ধার্মিক লোক সর্বত্রই উদার হয়ে থাকেন। অন্তরের প্রেমই তাঁকে উদার হতে বাধ্য করে। কেবল যাদের কাছে ধর্ম একটা ব্যবসামাত্র, তারাই ধর্মের ভিতর সংসারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিবাদ ও স্বার্থপরতা এনে ব্যবসার খাতিরে এরূপ সঙ্কীর্ণ ও অনিষ্টকারী হতে বাধ্য হয়।
তোমার চিরভ্রাতৃপ্রেমাবদ্ধ
বিবেকানন্দ
১৪৬*
যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকা
১৮৯৪
প্রিয় আলাসিঙ্গা,
একটা পুরানো গল্প শোন। একটা লোক রাস্তা চলতে চলতে একটা বুড়োকে তার দরজার গোড়ায় বসে থাকতে দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে—‘ভাই, অমুক গ্রামটা এখান থেকে কতদূর?’ বুড়োটা কোন জবাব দিলে না। তখন পথিক বার বার জিজ্ঞাসা করতে লাগল, কিন্তু বুড়ো তবু চুপ করে রইল। পথিক তখন বিরক্ত হয়ে আবার রাস্তায় গিয়ে চলবার উদ্যোগ করলে। তখন বুড়ো দাঁড়িয়ে উঠে পথিককে সম্বোধন করে বললে, ‘আপনি অমুক গ্রামটার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন—সেটা এই মাইল-খানেক হবে।’ তখন পথিক তাকে বললে, ‘তোমাকে এই একটু আগে কতবার ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তো তুমি একটা কথাও কইলে না—এখন যে বলছ, ব্যাপারখানা কি?’ তখন বুড়ো বললে, ‘ঠিক কথা। কিন্তু প্রথম যখন জিজ্ঞাসা করছিলেন, তখন চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন, আপনার যে যাবার ইচ্ছে আছে, ভাব দেখে তা বোধ হচ্ছিল না—এখন হাঁটতে আরম্ভ করেছেন, তাই আপনাকে বললাম।’
হে বৎস, এই গল্পটা মনে রেখো। কাজ আরম্ভ করে দাও, বাকী সব আপনা-আপনি হয়ে যাবে। গীতায় ভগবান্ বলেছেন—
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্॥ (গীতা, ৯।২২)
অর্থাৎ যারা আর কারও ওপর নির্ভর না করে কেবল আমার ওপর নির্ভর করে থাকে, তাদের যা কিছু দরকার, সব আমি যুগিয়ে দিই।
ভগবানের এ কথাটা তো আর স্বপ্ন বা কবিকল্পনা নয়।
প্রথম কথা হচ্ছে, আমি সময়ে সময়ে তোমায় অল্প স্বল্প করে টাকা পাঠাব। কারণ, প্রথম কলিকাতাতেও আমাকে ঐরকম কিছু কিছু টাকা—বরং মান্দ্রাজের চেয়ে কিছু বেশীই—পাঠাতে হবে। সেখানে আন্দোলন আমার ওপর নির্ভর করে শুধু যে শুরু হয়েছে তা নয়, উদ্দাম বেগে চলেছে। তাদের আগে দেখতে হবে। দ্বিতীয়তঃ কলিকাতা অপেক্ষা মান্দ্রাজে সাহায্য পাবার আশা বেশী আছে। আমার ইচ্ছা—এই দুটো কেন্দ্রই একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করুক। এখন কিছু পূজা পাঠ প্রচার—এই ভাবেই কাজ আরম্ভ করে দিতে হবে। সকলের মেলবার একটা জায়গা কর, সেখানে প্রতিসপ্তাহে কোনরকম একটু পূজা-আর্চা করে সভাষ্য উপনিষদ্ পাঠ হোক—এইরূপে আস্তে আস্তে কাজ আরম্ভ করে দাও। একবার চাকায় হাত লাগাও দেখি—চাকাটি ঠিক ঘুরে যাবে।
‘মিররে’ অভিনন্দনটা ছাপা হয়েছে, দেখলাম—ওরা যে এটা ভালভাবে নিয়েছে, তা ভালই। যার শেষ ভাল, তার সব ভাল।
এখন কাজে লাগ দেখি। জি. জি-র প্রকৃতিটা ভাবপ্রবণ, তোমার মাথা ঠাণ্ডা—দুজনে এক সঙ্গে মিলে কাজ কর। ঝাঁপ দাও—এই তো সবে আরম্ভ। আমেরিকার টাকায় হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের আশা অসম্ভব—প্রত্যেক জাতকে নিজেকে নিজে উদ্ধার করতে হবে। মহীশূরের মহারাজা, রামনাদের রাজা ও আর আর কয়েকজনকে এই কাজের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন করবার চেষ্টা কর। ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ আরম্ভ করে দাও। মান্দ্রাজে একটা জায়গা নেবার চেষ্টা কর—একটা কেন্দ্র যদি করতে পারা যায়, সেইটে একটা মস্ত জিনিষ হল, তারপর সেখান থেকে ছড়াতে থাক। ধীরে ধীরে কাজ আরম্ভ কর—প্রথমটা কয়েকজন গৃহস্থ প্রচারক নিয়ে কাজ আরম্ভ কর, ক্রমশঃ এমন লোক পাবে, যারা এই কাজের জন্য সারা জীবন দেবে। কারও ওপর হুকুম চালাবার চেষ্টা করো না—যে অপরের সেবা করতে পারে, সেই যথার্থ সর্দার হতে পারে। যত দিন না শরীর যাচ্ছে, অকপটভাবে কাজে লেগে থাক। আমার কাজ চাই—নামযশ টাকাকড়ি কিছু চাই না। কাজের আরম্ভটা যখন এমন সুন্দর হয়েছে, তখন তোমরা যদি কিছু না করতে পার, তবে তোমাদের ওপর আমার আর কিছু মাত্র বিশ্বাস থাকবে না। আমাদের আরম্ভটা বেশ সুন্দর হয়েছে। ভরসায় বুক বাঁধ। জি.জি-কে তো তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কিছু করতে হয় না—সে কেন মান্দ্রাজে একটা জায়গার জন্য যাতে কিছু টাকার যোগাড় হয়, সেই উদ্দেশ্যে লোককে একটু তাতায় না? মান্দ্রাজে একটা কেন্দ্র হয়ে গেলে তারপর চারিদিকে কার্যক্ষেত্র বিস্তার করতে থাক। এখন সপ্তাহে একত্র হওয়া; একটু স্তব হল, কিছু শাস্ত্রপাঠ হল—তাহলেই যথেষ্ট। সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ হও—তাহলেই সিদ্ধি নিশ্চিত।
