ঠাণ্ডার পো ধীরে ধীরে পালাচ্ছেন—শীতকাল কাটিয়ে দেওয়া গেল। শীতকালে এদেশে সর্বাঙ্গে electricity (তড়িৎ) ভরে যায়। Shake-hand (করমর্দন) করতে গেলে shock (ধাক্কা) লাগে আর আওয়াজ হয়—আঙুল দিয়ে গ্যাস জ্বালান যায়। আর শীতের কথা তো লিখেছি। সারা দেশটা দাবড়ে বেড়াচ্ছি, কিন্ত চিকাগো আমার ‘মঠ’—ঘুরে ফিরে আবার চিকাগোয় আসি। এখন পূর্বদিকে যাচ্ছি, কোথায় যে বেড়া পায়ে লাগবে, তিনি জানেন। মা-ঠাকরুন দেশে গেছেন; তাঁর শরীর বোধ হয় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যলাভ করেছে।
তোমাদের কি করে চলছে, কে চালাচ্ছে? রামকৃষ্ণ,৩২ তার মা, তুলসীরাম প্রভৃতি বোধ হয় উড়িষ্যায়?
দমদম মাষ্টার কেমন আছে? দাশুর তোমাদের উপর সেই প্রীতি আছে কিনা? সে ঘন ঘন আসে কিনা? ভবনাথ কেমন আছে, কি করছে? তোমরা তার কাছে যাও কিনা—তোমরা তাকে শ্রদ্ধা ভক্তি কর কিনা? হাঁ হে বাপু, সন্ন্যাসী-ফন্ন্যাসী মিছে কথা—মূকং করোতি, ইত্যাদি। বাবা, কার ভেতর কি আছে, বুঝা যায় না। তিনি ওকে বড় করেছেন—ও আমাদের পূজ্য। এত দেখে শুনেও যদি তোমাদের বিশ্বাস না হয়, ধিক তোমাদের! ভবনাথ তোমাদের ভালবাসে কিনা? তাকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা প্রীতি ও ভালবাসা দিও। কালীকৃষ্ণবাবুকে আমার ভালবাসা দিও—তিনি অতি উন্নতচিত্ত ব্যক্তি। রামলাল কেমন আছে? তার একটু বিশ্বাস ভক্তি হয়েছে কিনা? তাকে আমার প্রীতিসম্ভাষণ দিও। সাণ্ডেল ঘানিতে ঠিক ঘুরছে বোধ হয়; ধৈর্য ধরিতে কহিবে—ঘানি ঠিক যাবে। সকলকে আমার হৃদয়ের প্রীতি।
অনুরাগৈকহৃদয়ঃ
নরেন্দ্র
পুঃ—মা-ঠাকুরাণীকে তাঁহার জন্মজন্মান্তরের দাসের পুনঃপুনঃ ধূল্যবলুণ্ঠিত সাষ্টাঙ্গ দিবে—তাঁহার আশীর্বাদ আমার সর্বতোমঙ্গল। ইতি
১৪৪
[স্বামী অখণ্ডানন্দকে লিখিত]
ওঁ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়
(মার্চ বা এপ্রিল), ১৮৯৪
কল্যাণবরেষু,
তোমার পত্র পাইয়া সাতিশয় আহ্লাদিত হইলাম। তুমি খেতড়িতে থাকিয়া অনেক পরিমাণে স্বাস্থ্যলাভ করিয়াছ, ইহা বড়ই আনন্দের বিষয়।
তারক দাদা মান্দ্রাজে অনেক কার্য করিয়াছেন—বড়ই আনন্দের কথা! তাঁহার সুখ্যাতি অনেক শুনিলাম মান্দ্রাজবাসীদের নিকট। রাখাল ও হরি লক্ষ্ণৌ হইতে এক পত্র লিখিয়াছে, তাহাদের শারীরিক কুশল। মঠের সকল সংবাদ অবগত হইলাম শশীর পত্রে।
রাজপুতানার স্থানে স্থানে ঠাকুরদের ভিতর ধর্মভাব ও পরহিতৈষণা বৃদ্ধি করিবার চেষ্টা করিবে। কার্য করিতে হইবে। বসিয়া বসিয়া কার্য হয় না! মালসিসর আলসিসর আর যত ‘সর’ ওখানে আছে, মধ্যে মধ্যে পরিভ্রমণ করিতে থাক; আর সংস্কৃত, ইংরেজী সযত্নে অভ্যাস করিবে। গুণনিধি পাঞ্জাবে আছে বোধ হয়, তাহাকে আমার বিশেষ ভালবাসা জানাইয়া খেতড়িতে আনিবে ও তাহার সাহায্যে সংস্কৃত শিখিবে ও তাহাকে ইংরেজী শিখাইবে। যে প্রকারে পার, তাহার ঠিকানা আমায় দিবে। গুণনিধি অচ্যুতানন্দ সরস্বতী।
খেতড়ি শহরের গরীব নীচ জাতিদের ঘরে ঘরে গিয়া ধর্ম উপদেশ করিবে আর তাদের অন্যান্য বিষয়, ভূগোল ইত্যাদি মৌখিক উপদেশ করিবে। বসে বসে রাজভোগ খাওয়ায়, আর ‘হে প্রভু রামকৃষ্ণ’ বলায় কোন ফল নাই, যদি কিছু গরীবদের উপকার করিতে না পার। মধ্যে মধ্যে অন্য অন্য গ্রামে যাও, উপদেশ কর, বিদ্যা শিক্ষা দাও। কর্ম, উপাসনা, জ্ঞান—এই কর্ম কর, তবে চিত্তশুদ্ধি হইবে, নতুবা সব ভস্মে ঘৃত ঢালার ন্যায় নিষ্ফল হইবে। গুণনিধি আসিলে দুইজনে মিলিয়া রাজপুতানার গ্রামে গ্রামে গরীব দরিদ্রদের ঘরে ঘরে ফের। যদি মাংস খাইলে লোকে বিরক্ত হয়, তদ্দণ্ডেই ত্যাগ করিবে, পরোপকারার্থে ঘাস খাইয়া জীবন ধারণ করা ভাল। গেরুয়া কাপড় ভোগের জন্য নহে, মহাকার্যের নিশান—কায়মনোবাক্য ‘জগদ্ধিতায়’ দিতে হইবে। পড়েছ, ‘মাতৃদেবো ভব, পিতৃদেবো ভব’; আমি বলি, ‘দরিদ্রদেবো ভব, মূর্খদেবো ভব’। দরিদ্র, মূর্খ, অজ্ঞানী, কাতর—ইহারাই তোমার দেবতা হউক, ইহাদের সেবাই পরমধর্ম জানিবে। কিমধিকমিতি—
আশীর্বাদক
বিবেকানন্দ
০৪. পত্রাবলী ১৪৫-১৫৪
১৪৫
[অনাগারিক ধর্মপালকে লিখিত]
আমেরিকা
১৮৯৪
প্রিয় ধর্মপাল,
আমি তোমার কলিকাতার ঠিকানা ভুলে গিয়েছি, তাই মঠের ঠিকানায় এই পত্র পাঠালাম। আমি তোমার কলিকাতার বক্তৃতার কথা এবং উহা দ্বারা কিরূপ আশ্চর্য ফল হয়েছিল—সে সব শুনেছি।
… এখানকার জনৈক অবসরপ্রাপ্ত মিশনরী আমাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে একখানি পত্র লেখেন, তারপর তাড়াতাড়ি আমার সংক্ষিপ্ত উত্তরটি ছাপিয়ে একটা হুজুগ করবার চেষ্টা করেন। তবে তুমি অবশ্য জান, এখানকার লোকে এরূপ ভদ্রলোকদের কিরূপ ভেবে থাকে। আবার সেই মিশনরীটিই গোপনে আমার কতকগুলি বন্ধুর কাছে গিয়ে তাঁরা যাতে আমার কোন সহায়তা না করেন, সেই চেষ্টা করেন। অবশ্য তিনি তাঁদের কাছ থেকে নিছক ঘৃণাই পেয়েছেন। আমি এই লোকটার ব্যবহারে একেবারে অবাক হয়ে গেছি। একজন ধর্মপ্রচারকের এরূপ কপট ব্যবহার! দুঃখের বিষয়—প্রত্যেক দেশে, প্রত্যেক ধর্মেই এরূপ ভাব!
গত শীতকালে আমি এদেশে খুব বেড়িয়েছি—যদিও শীত অতিরিক্ত ছিল, আমার তত শীত বোধ হয়নি। মনে করেছিলাম—ভয়ানক শীত ভোগ করতে হবে, কিন্তু ভালয় ভালয় কেটে গেছে। ‘ফ্রি রিলিজিয়স সোসাইটি’র (Free Religious Society) সভাপতি কর্ণেল নেগিনসনকে তোমার অবশ্য স্মরণ আছে—তিনি খুব যত্নের সহিত তোমার খবরাখবর সব নিয়ে থাকেন। সেদিন অক্সফোর্ডের ডাঃ কার্পেণ্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। তিনি প্লীমাথে (plymouth) বৌদ্ধধর্মের নীতিতত্ত্ব সম্বন্ধে বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতাটি বৌদ্ধধর্মের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ। তিনি তোমার এবং তোমার কাগজের সম্বন্ধে খোঁজ করলেন। আশা করি, তোমার মহৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। যিনি ‘বহুজনহিতায় বহুজনসুখায়’ এসেছিলেন, তুমি তাঁর উপযুক্ত দাস।
