এই জগৎ যে ট্যান্টালাসের নরকস্বরূপ, ইহা সত্য ঘটনার বর্ণনা মাত্র,–আমরা এই জগৎ সম্বন্ধে কিছু জানিতে পারি না ; আবার জানি না, এ-কথাও বলিতে পারি না। যখন মনে করি আমি জানি না, তখন বলিতে পারি না এই বন্ধন আছে। সবটাই আমার মাথার ভুল হইতে পারে। আমি হয়তো সারাক্ষণ স্বপ্ন দেখিতেছি। আমি স্বপ্ন দেখিতেছি, তোমাদের সঙ্গে কথা কহিতেছি, তোমরা আমার কথা শুনিতেছ। কেহই প্রমান করিতে পারে না, যে ইহা স্বপ্ন নয়। ‘আমার মস্তিষ্ক’ ইহাও একটি স্বপ্ন হইতে পারে, আর বাস্তবিক তো নিজের মস্তিষ্ক কেহ কখন দেখে নাই। আমরা সকলেই উহা মানিয়া লই। সকল ব্যাপারে এইরূপ।আমার নিজের শরীরও আমি মানিয়া লইতেছি মাত্র। আবার আমি জানি না, তাহাও বলিতে পারি না।জ্ঞান ও অজ্ঞানের মধ্যে এই অবস্থান, এই রহস্যময় কুহেলিকা, এই সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ—কোথায় মিশিয়াছে, কেহ জানে না।আমরা স্বপ্নের মধ্যে বিচরণ করিতেছি-অর্ধনিদ্রিত, অর্ধজাগরিত, সারা জীবন এক অস্পষ্টতায় কাটিয়া যায়—ইহাই আমাদের প্রত্যেকের নিয়তি! সব ইন্দ্রিয়জ্ঞানের ঐ নিয়তি। সকল দর্শনের, সকল বিজ্ঞানের, সকল প্রকার মানবীয় জ্ঞানের-যাহাদিগকে লইয়া আমাদের এত অহংঙ্কার, তাহাদেরও এই নিয়তি এই পরিণাম। ইহাই ব্রহ্মাণ্ড, বিশ্বজগৎ।
————————————
১ গ্রীকপুরানে বর্ণিত ট্যান্টালাসের কাহিনী—তথ্যপঞ্জী দ্রষ্টব্য
————————————
ভূতই বলো, আত্মাই বলো, মনই বলো, আর যাহাই বলো না কেন, যে কোন নামই উহাকে দাও না কেন, ব্যাপার সেই একই-আমরা বলিতে পারি না, উহাদের অস্তিত্ব আছে; উহাদের অস্তিত্ব নাই এ-কথাও বলিতে পারি না। আমরা উহাদিগকে একও বলিতে পারিনা, আবার বহুও বলিতে পারি না। এই আলো-অন্ধকারে খেলা, এই এলোমেলো অবিচ্ছেদ্য ভাব সর্বদা রহিয়াছে। সমুদয় ব্যাপার একবার সত্য বলিয়া বোধ হইতেছে, আবার বোধ হইতেছে মিথ্যা। একবার বোধ হইতেছে আমরা জাগরিত, একই কালে মনে হইতেছে আমরা নিদ্রিত। ইহা ঘটনার বর্ণনা-ইহাকেই মায়া বলে। আমরা এই মায়াতে জন্মিয়াছি, আমরা ইহাতেই জীবিত রহিয়াছি, আমরা ইহাতেই চিন্তা করিতেছি, ইহাতেই স্বপ্ন দেখিতেছি। আমরা এই মায়াতেই দার্শনিক, মায়াতেই সাধু; শুধু তাহাই নহে, আমরা এই মায়াতেই কখন দানব, কখনও বা দেবতা হইতেছি। ভাব ও ধারণাকে যতদূর পারো বিস্তৃত কর, উচ্চ হইতে উচ্চতর কর, উহাকে ‘অনন্ত’ অথবা যে-কোন নাম দিতে ইচ্ছা হয় দাও, ঐ ধারণাও ঐ মায়ারই ভিতরে। অন্যরূপ হইতেই পারে না ; আর মানুষের সমস্ত জ্ঞান-কেবল বিশেষ ধারণা হইতে সামান্যে আসা, উহার প্রতীয়মান স্বরূপ জানিতে চেষ্টা করা এই মায়া নামরূপের কার্য। যে-কোন বস্তুরই আকৃতি আছে, যাহা কিছু তোমার মনের মধ্যে কোনপ্রকার ভাব জাগ্রত করিয়া দেয়, তাহাই মায়ার অন্তর্গত। জার্মান দার্শনিকগণ বলেন—সবই দেশ-কাল-নিমিত্তের অধীন, আর উহাই মায়া!
ঈশ্বর সম্বন্ধে সেই প্রাচীন ধারণায় একটু ফিরিয়া যাই। পূর্বে সংসারের যে অবস্থা চিত্রিত হইয়াছে, তাহাতে অনায়াসেই দেখিতে পাওয়া যাইতেছে, একজন ঈশ্বর আমাদিগকে অনন্তকাল ধরিয়া ভালোবাসিতেছেন—একজন অনন্ত সর্বশক্তিমান্ ও নিঃস্বার্থ পুরুষ এই জগৎ শাসন করিতেছেন। পূর্বোক্ত এই ঈশ্বর-ধারণা মানুষকে সন্তুষ্ট করিতে পারিল না। কোথায় তোমার ন্যায়পরায়ণ দয়াময় ঈশ্বর? দার্শনিক জিজ্ঞাসা করিতেছেন-তিনি কি মনুষ্য বা পশুরূপী তাঁহার লক্ষ লক্ষ সন্তানের বিনাশ দেখিতেছেন না? কারণ এমন কে আছে, যে এক মুহূর্তও অপরকে না মারিয়া জীবনধারণ করিতে পারে? তুমি কি সহস্র সহস্র জীবন সংহার না করিয়া একটি নিঃশ্বাসও গ্রহণ করিতে পারো? লক্ষ লক্ষ জীব মরিতেছে বলিয়া তুমি জীবিত রহিয়াছ। তোমার জীবনের প্রতি মুহূর্ত, প্রত্যেক নিঃশ্বাস—যাহা তুমি গ্রহণ করিতেছ, তাহা সহস্র সহস্র জীবের মৃত্যুস্বরূপ এবং তোমার প্রত্যেক গতি লক্ষ লক্ষ জীবের মৃত্যুস্বরূপ। কেন তাহারা মরিবে? এ সম্বন্ধে পুরাতন মিথ্যাযুক্তি—‘উহারা তো অতি নীচ জীব।’ মনে কর যেন তাহাই হইল—যদিও উহা অমীমাংসিত বিষয়, কারণ কে বলিতে পারে—কীট মনুষ্য অপেক্ষা বড়, না মনুষ্য কীট অপেক্ষা উচ্চতর? কে প্রমাণ করিতে পারে-এটি ঠিক, কি ওটি ঠিক? যাক সে কথা, তাহারা অতি নিম্নস্তরের জীব ধরিয়া লইলেও তাহারা মরিবে কেন? যদি তাহারা হীন জীব হয়, তাহাদেরই তো বাঁচিয়া থাকা বেশী দরকার। কেন তাহারা বাঁচিবে না?তাহাদের জীবন ইন্দ্রিয়েই বেশী আবদ্ধ, সুতরাং তোমার আমার অপেক্ষা সহস্রগুণ সুখ-দুঃখ বোধ করে। কুকুর বাঘ যেরূপ তৃপ্তি সহকারে ভোজন করে, আমরা কি সেরূপ করি? করি না, কারণ আমাদের কর্মশক্তি শুধু ইন্দ্রিয়ে নহে, বুদ্ধিতে—আত্মায়। কিন্তু পশুদের প্রাণ ইন্দ্রিয়েই পড়িয়া রহিয়াছে, তাহারা ইন্দ্রিয়সুখের জন্য উন্মত্ত হয়; তাহারা এত আনন্দের সহিত ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করিবে যে, মানুষ সেরূপ কল্পনাও করিতে পারে না; আর এই সুখও যতখানি, দুঃখও তাহার সমপরিমাণ।
যতখানি সুখ, ততখানি দুঃখ। যদি মনুষ্যেতর প্রাণীরা এত তীব্রভাবে সুখ অনুভব করিয়া থাকে, তবে ইহাও সত্য যে তাহাদের দুঃখবোধও তেমনি তীব্র-মনুষ্যের অপেক্ষা সহস্রগুণে তীব্রতর, তথাপি তাহাদিগকে মরিতে হইবে! তাহা হইলে দাঁড়াইল এই, মানুষ্ মরিতে যত কষ্ট অনুভব করিবে, অপর প্রাণী তাহার শতগুণ কষ্ট ভোগ করিবে; তথাপি তাহাদের কষ্টের বিষয় না ভাবিয়া আমরা তাহাদিগকে হত্যা করি। ইহাই মায়া। আর যদি আমরা মনে করি—একজন সগুন ঈশ্বর আছেন, যিনি ঠিক মানুষেরই মতো, যিনি সব সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহা হইলে ঐ যে-সকল ব্যাখ্যা মত প্রভৃতি, যাহাতে বলে মন্দের মধ্যে হইতে ভালো হইতেছে, তাহা যথেষ্ট হয় না। হউক না শত সহস্র উপকার—মন্দের মধ্য দিয়া উহা কেন আসিবে? এই সিদ্ধান্ত অনুসারে তবে আমিও নিজ পঞ্চেন্দ্রিয়ের সুখের জন্য অপরের গলা কাটিব। সুতরাং ইহা কোন যুক্তি হইল না। কেন মন্দের মধ্য দিয়া ভালো হইবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হইবে, কিন্তু এই প্রশ্নের তো উত্তর দেওয়া যায় না; ভারতীয় দর্শণ ইহা স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল।
