অদ্বৈতবেদান্তবাদীরা জীব বা আত্মা সম্বন্ধে এই মতবাদ অগ্রাহ্য করেন; এবং উপনিষদের প্রায় সমগ্র অংশ স্বপক্ষে পাইয়া তাহারই উপর নিজেদের মত সম্পূর্ণরূপে গড়িয়া তোলেন। সব উপনিষদেরই একমাত্র কাজ এই বিষয়টি প্রমাণ করা—’যেমন একখণ্ড মৃত্তিকা সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করিলে বিশ্বের সমস্ত মৃত্তিকাই জানা যায়, তেমনি এমন কি আছে, যাহা জানিলে বিশ্বের সব-কিছুই জানা যায়?’১ অদ্বৈতবাদীর ভাব হইল সমগ্র বিশ্বকে এমন একটি সাধারণ তত্ত্বে লইয়া যাওয়া ,যে তত্ত্বটি যথার্থই বিশ্বের সামগ্রিক সত্তা। তাঁহারা দাবি করেন—সমগ্র বিশ্বে একত্ব রহিয়াছে, এবং একটি সত্তাই নিজেকে এই-সব বিভিন্ন রূপে ব্যক্ত করিতেছেন। সাংখ্য যাহাকে প্রকৃতি বলেন, তাঁহারা তাহার অস্তিত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু বলেন যে, প্রকৃতিই ঈশ্বর। এই অস্তিত্বই—এই সৎ-ই বিশ্ব মানুষ জীব এবং যাহা-কিছুর অস্তিত্ব আছে, তাহাতে রূপায়িত হইয়াছেন। মন ও মহৎ সেই এক সৎ-এরই অভিব্যক্তি মাত্র। তবে ইহাতে অসুবিধা এই যে, ইহা সর্বেশ্বরবাদ হইয়া দাঁড়ায়। যে বস্তুকে তাঁহারা অপরিবর্তনীয় ‘সৎ’ বলিয়া স্বীকার করেন—কারণ যাহা চরম সত্য তাহার পরিবর্তন নাই—তাহা এই পরিবর্তনীয় ও বিনাশশীল পদার্থে রূপায়িত হয় কেমন করিয়া?
এ-বিষয়ে অদ্বৈতবাদীদের বিবর্তবাদ বা আপাত-পরিবর্তনবাদ বলিয়া একটি মত আছে। দ্বৈতবাদী ও সাংখ্যবাদীদের মতে এই বিশ্বের সব-কিছুই মূল প্রকৃতির অভিব্যক্তি। একদল অদ্বৈতবাদী ও একদল দ্বৈতবাদীর মতে সমগ্র বিশ্বই ঈশ্বর হইতে উদ্ভুত হইয়াছে। শঙ্করপন্থী খাঁটি অদ্বৈতবাদীদের মতে সমগ্র বিশ্ব ঈশ্বর হইতে উদ্ভূত বলিয়া প্রতীয়মান হয় মাত্র। ঈশ্বর বিশ্বের উপাদান-কারণ, কিন্তু সত্যই তাহা নন, উপাদান বলিয়া প্রতীত হন মাত্র। এ-বিষয়ে রজ্জুতে সর্পভ্রমের উদাহরণ প্রসিদ্ধ। রজ্জুকে সর্প বলিয়া মনে হইয়াছিল মাত্র, রজ্জু কখনও সর্পে পরিণত হয় নাই। ঠিক তেমনি এই প্রকাশমান সমগ্র বিশ্বই সেই সৎ-স্বরূপ; ইহাতে কোন পরিবর্তন ঘটে নাই, আমরা যে-সব পরিবর্তন ইহাতে দেখি, সেগুলি আপাত-প্রতীয়মান। দেশ, কাল ও নিমিত্ত এই পরিবর্তন ঘটায়; অথবা মনোবিজ্ঞানের উচ্চতর সামান্যী করণ অনুসারে বলা যায় যে, নাম ও রূপের দ্বারাই ইহা ঘটে। নাম ও রূপ দিয়াই আমরা একটি পদার্থকে অপরটি হইতে পৃথক্ বলিয়া বুঝি। নাম ও রূপ-ই পার্থক্যের সৃষ্টি করে। আসলে সবই এক ও অভেদ।
——————–
১ ছান্দোগ্য উপ., প্রপাঠক ৬, ১-৪; মুণ্ডক, ১/৩
আবার বেদান্তবাদীরা বলেন, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ বলিয়া কিছু নাই এবং সৃষ্টির মূলে একটি সত্তা আছে, শুধু বুদ্ধির দ্বারা অধিগম্য জগৎ বলিয়াও কিছু নাই। রজ্জু সর্পে পরিণত হইয়াছে বলিয়া মনে হয় মাত্র, ইহা সত্য পরিবর্তন নয়; যখন ভুল ভাঙিয়া যায়, তখন সর্প শূন্যে লীন হয়; মানুষ যখন অজ্ঞানের মধ্যে থাকে, তখন সে সৃষ্ট জগৎ-ই দেখে, ঈশ্বরকে দেখে না। যখন সে ঈশ্বরকে দেখিতে পায়, তখন তাহার কাছে জগৎ একেবারে লোপ পায়। এই ভ্রমকে ‘অবিদ্যা’ বা ‘মায়া’ বলা যায়; ইহাই এই সৃষ্টির কারণ, ইহারই প্রভাবে চরম সত্যকে, অপরিবর্তনীয়কে এই পরিদৃশ্যমান জগৎ বলিয়া আমরা মনে করি। এই মায়া মহাশূন্য বা অস্তিত্বহীন কিছু নয়। সৎ-ও নয়, অসৎ-ও নয়—ইহাই হইল মায়ার সংজ্ঞা; অর্থাৎ মায়া আছে—এ-কথাও বলা চলে না, আবার নাই—এ-কথাও বলা যায় না। একমাত্র চরম সত্যকে ‘সৎ’ বলা যাইতে পারে; সেদিক দিয়া দেখিলে মায়া অসৎ, মায়ার অস্তিত্ব নাই। মায়া অসৎ—এ-কথাও বলা যায় না; কারণ তাহা যদি হইত, তবে ইহা কখনও জগৎ সৃষ্টি করিতে পারিত না। কাজেই ইহা এমন একটা কিছু, যাহা সৎ বা অসৎ কোনটিই নয়; এজন্য বেদান্তদর্শনে ইহাকে ‘অনির্বচনীয়’ অর্থাৎ বাক্যদ্বারা প্রকাশ করা যায় না, বলা হইয়াছে।
মায়া-ই এই বিশ্বের আসল কারণ। ব্রহ্ম বা ঈশ্বর যাহাতে উপাদান দেন, মায়া তাহাতে দেয় নাম ও রূপ; এবং উপাদানই এই সব-কিছুতে রূপান্তরিত হইয়াছে বলিয়া প্রতীত হয়। কাজেই অদ্বৈতবাদীদের কাছে জীবাত্মার কোন স্থান নাই। তাহাদের মতে জীবত্মা মায়ার সৃষ্টি; আসলে জীবাত্মার কোন (পৃথক্) অস্তিত্ব থাকিতে পারে না। যদি সর্বব্যাপী একটি মাত্র সত্তা থাকে , তবে আমি একটি সত্ত্বা , তুমি একটি সত্তা , সে আর একটি সত্তা—ইত্যাদি কিরূপে সম্ভব? আমরা সকলেই এক; দ্বৈতজ্ঞানই অনর্থের মূল। বিশ্ব হইতে আমি পৃথক্—এই বোধ যখনই জাগিতে শুরু করে, তখনই প্রথমে আসে ভয়, এবং তারপর আসে দুঃখ। ‘যেখানে একে অপরের কথা শোনে, একে অপরকে দেখে, তাহা অল্প। যেখানে একে অপরকে দেখে না, একে অপরের কথা শোনে না—তাহাই ভূমা, তাহাই ব্রহ্ম। সেই ভূমাতেই পরম সুখ, অল্পে সুখ নাই।’১
কাজেই অদ্বৈত-দর্শনের মতে বস্তুর এই পৃথক্করণ, এই সৃষ্টি যেন সাময়িকভাবে মানুষের যথার্থ স্বরূপকে ঢাকিয়া রাখিয়াছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বরূপের পরিবর্তন মোটেই ঘটে নাই। নিম্নতম কীট এবং উচ্চতম মানুষের মধ্যে সেই একই ঈশ্বরীয় সত্তা বিদ্যমান। কীটের দেহই নিম্নতম রূপ, যেখানে দেবত্ব মায়া দ্বারা অনেক বেশী পরিমাণে আবৃত রহিয়াছে; যেখানে দেবত্বের উপর আবরণ ক্ষীণতম, তাহাই উচ্চতম রূপ বা দেহ। সব-কিছুর পিছনে সেই এক দেবত্বই বিরাজমান; এই সত্য অবলম্বন করিয়াই নীতির ভিত্তি গড়িয়া উঠিয়াছে। অপরের অনিষ্ট করিও না। প্রত্যেককে আপনার মতো ভালবাসো, কারণ সমগ্র বিশ্বই এক। অপরের অনিষ্ট করিলে নিজেরই অনিষ্ট করা হয়; অপরকে ভালবাসিলে নিজকেই ভালবাসা হয়। এই সত্য হইতেই অদ্বৈত-নীতির মূলতত্ত্বের উদ্ভব; ইহাকেই সংক্ষেপে বলা হইয়াছে—আত্মত্যাগ।
