একত্বে উপনীত হইলেই সব বিচার সমাপ্ত হয়, সুতরা়ং আমরা প্রথমতঃ বিশ্লেষণ, তারপর সমন্বয় অবলম্বন করিয়া থাকি। বিজ্ঞানের রাজ্যে দেখা যায় একটি অন্তর্নিহিত প্রাকৃতিক শক্তির অনুসন্ধানে বিক্ষিপ্ত শক্তিগুলি ক্রমশঃ সীমাবদ্ধ হয়। চরম একত্বকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করিতে পারিলেই জড়বিজ্ঞান লক্ষে উপনীত হয়। একত্বে পৌঁছিলেই আমাদের বিশ্রাম। জ্ঞানই চরম অবস্থা।
সকল বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ ধর্ম্মবিজ্ঞান বহুপূর্বেই সেই একত্ব আবিষ্কার করিয়াছে, সেই অদ্বৈত-তত্ত্বে উপনীত হওয়াই জ্ঞানযোগের লক্ষ্য। বিশ্বময় একই পরমাত্মা বিরাজ করিতেছেন, ক্ষুদ্র জীবত্মাগুলি তাঁহারই অভিব্যক্তি মাত্র। অতএব পরমাত্মা তাঁহার অভিব্যক্তিগুলি অপেক্ষা অনন্তগুণে বৃহৎ। সবই পরমাত্মা বা ব্রহ্ম। সাধু, পাপী, মেষ, ব্যঘ্র—এমন কি হত্যাকারী পর্যন্ত পরমার্থের দিক দিয়া ব্রহ্ম ভিন্ন আর কিছুই নয়, যেহেতু ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব নাই। ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’—এক সৎ বস্তুই বিদ্যমান, ঋষিগণ তাঁহাকে বিভিন্নভাবে অভিহিত করিয়াছেন। এই জ্ঞান ব্যতীত উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই, এবং যোগদ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তিতেই এই জ্ঞানের আলোক উদ্ভাসিত হয়। যিনি যত বেশী এই যোগ ও ধ্যানের দ্বারা বিশুদ্ধ ও যোগ্য হইয়াছেন, আত্মানুভূতির আলোক তাঁহার নিকট তত বেশী পরিস্ফুট। এই উৎকৃষ্ট জ্ঞান চারি সহস্র বর্ষ পূর্বে আবিষ্কৃত হইয়াছে, কিন্তু অতি অল্প কয়েকজনেরই অধিকারে আসিয়াছে; এখনও ইহা জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিণত হইতে পারে নাই।
৪
তথাকথিত মনুষ্যনামধারী সকল ব্যক্তিই প্রকৃত ‘মানুষ’ আখ্যার যোগ্য নয়। প্রত্যেকেই নিজের মন দ্বারা এই জগৎকে বিচার করিয়া থাকে। জগৎ সম্বন্ধে উচ্চতর ধারণা অত্যন্ত কঠিন। অধিকাংশ ব্যক্তির নিকটই তত্ত্ব অপেক্ষা জাগতিক বস্তু বেশী গ্রাহ্য। দৃষ্টান্তরূপে বোম্বাই-এর দুইব্যাক্তি সম্বন্ধে একটি গল্প প্রচলিত আছে। তাঁহাদের মধ্যে একজন হিন্দু, অপরজন জৈন। ঐ নগরের এক ধনীর গৃহে বসিয়া উভয়েই শতরঞ্চ খেলিতেছিলেন। বাড়িটি সমুদ্রের ধারে। খেলাও বহুক্ষণ ধরিয়া চলিতেছে। যেখানে বসিয়া তাঁহারা খেলিতেছিলেন, তাহার নিচে সমুদ্রের জোয়ার ভাঁটা তাঁহাদের দৃষ্টি আকর্ষন করিলে তাঁহাদের মধ্যে একজন জোয়ার-ভাঁটাকে পৌরাণিকভাবে ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন, ‘দেবতারা এই জল একটা গর্তের মধ্যে ফেলিয়া সেখান হইতে আবার ঢালিয়া ফেলিতেছেন। বারবার এইরূপ ঢালাঢালি করিয়া তাঁহারা খেলা করিতেছেন।’ অন্য ব্যক্তি বলিলেন, ‘না, তাহা নয়, এই জল ব্যবহারের উপযোগী করিবার জন্য একটা পর্বতের উপর শোষণ করিয়া তুলিয়া লইয়া আবার ঢালিয়া ফেলিতেছেন।’ সেখানে একটি যুবক ছাত্র ছিল, সে বিদ্রুপ করিয়া বলিল, ‘আপনারা কি জানেন না চন্দ্রের আকর্ষণে এই জোয়ার-ভাঁটা হয়? ইহা শুনিয়া ভদ্রলোক দুইজন ক্রুদ্ধ হইয়া তাহার দিকে ফিরিয়া জানিতে চাহিলেন-সে কি মনে করে যে , তাঁহারা দুইজনেই নির্বোধ, সে কি মনে করে যে, তাঁহারা দুইজনেই নির্বোধ, সে কি মনে করে যে, তাঁহারা বিশ্বাস করিবেন চন্দ্র রজ্জু দ্বারা জোয়ার আকর্ষণ করিয়া থাকেন, আর উহা এত দূরবর্তী চন্দ্রের নিকটে যায়। এরূপ বাজে ব্যাখ্যা মানিয়া লইতে তাঁহারা মোটেই রাজি হইলেন না। এমন সময় গৃহস্বামী উপস্থিত হইলে উভয় পক্ষই মীমাংসার জন্য তাঁহাকে মধ্যস্থ মানিলেন। তিনি শিক্ষিত বলিয়া এ রহস্য অবগত ছিলেন, কিন্তু শতরঞ্চ খেলায় রত দুইজনের এ-বিষয়ে বোধ জন্মানো নিতান্ত কঠিন বুঝিয়া যুবকটিকে নিরস্ত হইতে ইঙ্গিত করিলেন এবং জোয়ার-ভাঁটার কারণ সম্বন্ধে এমন ব্যাখ্যা দিলেন যে, মূর্খ শ্রোতা-দুইজনের তাহা ভাল লাগিল : আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন যে, বহুদূরে মহাসাগরের ঠিক মধ্যস্থলে একটি স্পঞ্জের (sponge) পাহাড় আছে। আপনারা দুইজনেই অবশ্য স্পঞ্জ দেখিয়াছেন এবং আমি যে-বিষয় বুঝাইতে যাইতেছি, তাহা নিশ্চয় বুঝিবেন। এই স্পঞ্জ-পাহাড় সাগরের অধিকাংশ জল শোষণ করিয়া লইলেই ভাঁটার উৎপত্তি হয়; ক্রমে দেবগণ নামিয়া আসিয়া ঐ পর্বতের উপর নৃত্য আরম্ভ করিলে তাঁহাদের দেহের ভারে নিষ্পেষিত হইয়া জল বাহির হইয়া যাইলেই জোয়ারের উৎপত্তি হয়। মহাশয়গণ, এই তো জোয়ার-ভাঁটার কারণ; এই কারণ কেমন সরল ও যুক্তিসঙ্গত, তাহা সহজেই বুঝিতে পারিবেন। চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার-ভাটা হয় শুনিয়া যাঁহারা ঠাট্টা করিয়াছিলেন, স্পঞ্জ-পাহাড় ও তাহার উপরে দেবতাদের নৃত্যের বিষয় শ্রবণ করিয়া তাঁহাদের আর কোন অবিশ্বাস রহিল না। দেবতা তো তাঁহাদের নিত্য-বিশ্বাস সত্য বস্তু, আর স্পঞ্জ তাঁহারা স্বচক্ষেই দেখিয়াছেন। উভয়ের মিলিত ক্রিয়াফলেই যে জোয়ার-ভাঁটা হইয়া থাকে, ইহা খুবই সম্ভব।
‘আরাম’—সত্যলাভের পরীক্ষা নয়; বস্তুতঃ সত্যলাভ ইহার ঠিক বিপরীত অবস্থা। যদি কেহ প্রকৃতপক্ষে সত্যকে জানিতে চান, তিনি যেন আরামে আসক্ত না হন। সমস্ত সুখভোগের কামনা পরিত্যাগ করা কঠিন, কিন্তু জ্ঞানীকে ইহা বর্জন করিতে হইবে। জ্ঞানী বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া সব বাসনা ত্যাগ করিবেন, তাঁহার দেহাত্মবুদ্ধি থাকিবে না—কেবল তখনই উচ্চতর সত্য তাঁহার হৃদয়ে উদ্ভাসিত হইবে। ত্যাগের প্রয়োজন। যজ্ঞ যে ধর্মের অঙ্গ বলিয়া গণ্য হইয়াছে, তাহা এই ক্ষুদ্র স্বার্থগুলির বিসর্জনের অন্তর্নিহিত শক্তি হইতেই হইয়াছে। মিথ্যা অহংভাবের বিসর্জন দ্বারা আমরা উচ্চতর ‘অহং’-জ্ঞান অর্থাৎ আত্মানুভূতি লাভ করিতে পারি। দেবতাদের ক্রোধের উপশমের বা প্রসন্নতার জন্য যে যথার্থ ফলপ্রদ বলি প্রদত্ত হইত, তাহা আত্মজ্ঞান-লাভের উপায় কাঁচা ‘আমি’র বিসর্জনেরই রূপক মাত্র। জ্ঞানী দেহরক্ষার জন্য যত্ন করিবেন না, মনেও ঐ ইচ্ছা পোষণ করিবেন না। বিশ্বের ধ্বংস হইলেও জ্ঞানী সাহসের সহিত সত্য অনুসরণ করিবেন। যাহারা অলীক উত্তেজনার পশ্চাতে ধাবিত হয়, তাহারা সত্য অনুসরণ করিতে পারে না। শুধু এই জীবনে নয়, শত শত জীবন ধরিয়া এই সাধনা করিতে হইবে। অতি অল্পসংখ্যক মানুষই অন্তরে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করিতে সাহস করে—স্বর্গসুখ, সাকার ঈশ্বর-উপাসনা ও ফলাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন করিতে সাহসী হয়। এই জ্ঞানের সাধনের জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প আবশ্যক; সন্দেহে দোদুল্যমান হওয়াও অত্যন্ত দুর্বলতার লক্ষণ। মানুষ নিত্য-পূর্ণই আছে, তাহা না হইলে কিরূপে পূর্ণত্ব লাভ করিতে সমর্থ হইত? কিন্তু তাহাকে এই পূর্ণত্ব প্রত্যক্ষ করিতে হইয়াছিল। মানুষ যদি শুধু বাহ্য কারণগুলির অধীন থাকিত, তাহা হইলে সে কেবল মরণশীলই থাকিয়া যাইত। যাহারা কোন অবস্থার উপর নির্ভর-শীল নয়, তাহাদের সম্বন্ধেই অমৃতত্ব প্রযোজ্য। আত্মাকে কোন কিছু প্রভাবিত করিতে পারে না—এই ভাব সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমূলক; কিন্তু মানুষকে আত্মার সহিত এক হইতে হইবে , দেহ বা মনের সহিত নয়। মানুষ এই জগতের দ্রষ্টামাত্র—এই সত্য সে জানিতে পারিলেই নিয়ত গতিশীল এই জগচ্চিত্র উপভোগ করিতে পারিবে। জ্ঞানী নিজেকে বলিতে থাকুন, ‘আমি বিশ্ব, আমি ব্রহ্ম।’ মানুষ যখন সত্য-সত্যই এক অদ্বিতীয় পরমাত্মার সহিত এক হইয়া যায়। তখন সকল ব্যাপারই তাহার পক্ষে সম্ভব হয় , এবং সকল জড়বস্তু তাহার দাস হইয়া যায়। শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলিয়াছেন, ‘মাখন তুলিয়া দুধে রাখো বা জলে রাখো, কিছুরই সহিতই তাহা মিশিবে না। সেইরূপ মানুষ একবার আত্মজ্ঞান লাভ করিলে বিষয়াসক্তি তাহাকে আর স্পর্শ করিতে পারে না।’ ‘বেলুন হইতে যেমন পৃথিবীর ছোটখাট বৈষম্যগুলি চোখে পড়ে না, মানুষেরও উচ্চ অবস্থা লাভ হইলে ভালমন্দ পার্থক্য আর তাহার চোখে পড়িবে না।’ ‘পোড়া ঘটকে আর কোন আকার দেওয়া যায় না; তেমনি যে মন একবার ঈশ্বরকে স্পর্শ করিয়াছে এবং অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়াছে, তাহা অবিকারী হইয়া থাকিবে।’ সংস্কৃতে ‘ফিলজফি’ শব্দের অর্থ ‘শুদ্ধ দর্শন’, এবং ধর্ম হইতেছে ফলিত দর্শনশাস্ত্র। শুধু তত্ত্বমূলক ‘কল্পনাত্মক’ দর্শন ভারতে বিশেষ সমাদৃত হয় না; সেখানে ভজনালয়, ধর্মমত বা গোঁড়ামি নাই; দ্বৈতবাদী ও অদ্বৈতবাদী—এই দুইটি প্রধান বিভাগ আছে। দ্বৈতবাদী বলেন, ‘মুক্তির উপায় কেবল ভগবৎ-কৃপা। কার্য-কারণ-বিধি একবার গতিপ্রাপ্ত হইলে আর তাহার বিশ্রাম নাই। এই বিধানের অতীত একমাত্র ঈশ্বর কৃপা করিয়া আমাদিগকে এ বিধান ভঙ্গ করিতে সহায়তা করেন।’ অদ্বৈতবাদী বলেন, ‘এই জড়প্রকৃতির অন্তরালে এমন একজন আছেন, যিনি মুক্ত; সকল বিধানের অতীত সেই পুরুষকে লাভ করিয়া আমরা মুক্ত হই। এই বন্ধন-হীনতাই মুক্তি।’ দ্বৈতবাদ মুক্তির একটি দিক মাত্র, অদ্বৈতবাদ জ্ঞনের চরমে পৌঁছাইয়া দিয়। পবিত্র হওয়াই মুক্তিলাভের অতি সহজপথ। আমরা যাহা অর্জন করি, তাহাই আমাদের নিজস্ব। কোন শাস্ত্র-প্রমাণ বা ধর্মবিশ্বাস আমাদিগকে রক্ষা করিতে পারে না। যদি একজন ঈশ্বর থাকেন, সকলেই তাঁহাকে লাভ করিতে পারে। অগ্নির উত্তাপ সমন্ধে কাহাকেও বলিয়া দিতে হয় না , সকলেই অনুভব করিতে পারে। ঈশ্বর সম্বন্ধেও সেইরূপ। ঈশ্বর সকল মানুষেরই প্রত্যক্ষগম্য। প্রতীচ্যবাসীদের ‘পাপ’ সম্বন্ধে যেরূপ ধারণা, হিন্দুগণ সেইভাবে পাপের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। কুকার্য ‘পাপ’ নয়; কুকার্য দ্বারা আমরা কোন শাসক ঈশ্বরের বিরাগভাজন না হইয়া শুধু নিজদেরই অনিষ্ট করিয়া থাকি, এবং সেজন্য আমাদিগকে নিশ্চয়ই শাস্তি ভোগ করিতে হইবে। আগুনে হাত দেওয়া পাপ নয়, কিন্তু যে ঐ রূপ করে, সে নিশ্চয়ই পাপীর মতো যন্ত্রনা ভোগ করিবে। সকল কর্মেরই কিছু ফল আছে, এবং ‘প্রত্যেক কর্মের ফলই কর্তার নিকট ফিরিয়া আসে’। ‘ত্রিত্ববাদ’১ ‘একত্ববাদ’২ অপেক্ষা উন্নত, একত্ববাদ দ্বৈতবাদ—এই মতে ঈশ্বর ও জীব নিত্য পৃথক। ‘আমরা সকলেই ঈশ্বরের সন্তান’—এই জ্ঞান হইলে বুঝিতে হইবে, ধর্মের উন্নতি আরম্ভ হইয়াছে; একত্বে উপনীত হইলে অর্থাৎ যখন আমরা ব্রহ্মের সহিত অভিন্নতা উপলব্ধি করি, তখনই চরমোন্নতি বুঝিতে হইবে।
