এমন এক সময় আসিবে, যখন তাহাকে ঊর্ধ্বগামী হইতেই হইবে। কাহারও বিনাশ নাই। আমরা সকলেই একটি সাধারণ কেন্দ্র হইতে অভিক্ষিপ্ত; এই কেন্দ্রই ঈশ্বর। ঈশ্বর যে-সকল জীব সৃষ্টি করিয়াছেন—তাহারা উচ্চতমই হউক বা নীচতমই হউক—সকলেই সর্ব জীবনের জনক ঈশ্বরের নিকট ফিরিয়া আসিবে। ‘যাঁহা হইতে সকল প্রাণী জাত, যাঁহাতে সকলে অবস্থিত এবং যাঁহার নিকট সকলেই প্রত্যাবৃত্ত হয়, তিনিই ঈশ্বর।’১
———-
১ তৈত্তি. উপ. ৩/১
১১. জ্ঞানযোগ-প্রবেশিকা
ইহাই (জ্ঞানযোগই) যোগশাস্ত্রের দার্শনিক ও যুক্তিসম্মত দিক। যোগ-শাস্ত্রের এই অংশটি খুবই কঠিন; আমি ধীরে ধীরে তোমাদিগকে ইহার সহিত পরিচয় করাইয়া দিব।
যোগের অর্থ মানুষ ও ঈশ্বরকে যুক্ত করা পদ্ধতি। এই বিষয়টি বুঝিলে মানুষ ও ঈশ্বর সম্বন্ধে তোমরা তোমাদের নিজ নিজ সংজ্ঞা অনুযায়ী চিন্তা করিত পারিবে এবং তোমরা দেখিতে পাইবে যে, তোমাদের প্রতিটি সংজ্ঞার সঙ্গে যোগ কথাটি খাপ খায়। সর্বদা মনে রাখিও বিভিন্ন প্ মানসিক গঠন অনুযায়ী যোগও বিভিন্ন প্রকারের, ইহাদের একটি না হইলে অন্যটি হয়তো তোমার উপযোগী হইতে পারে। সব ধর্মের দুইট ভাগ—তত্ত্ব ও সাধন। পাশ্চাত্যেরা তত্ত্বের দিকটিই অনুসরণ করে, এবং সাধন অর্থে শুধু সৎ কার্য করাই বুঝিয়া থাকে। ধর্মের ব্যাবহারিক দিক বা সাধন-অঙ্গই যোগ। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, কেবল সৎকাজ করা বাদ দিলেও ধর্ম একটি কার্যকরী শক্তি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে মানুষ যুক্তির মধ্য দিয়া ঈশ্বর লাভ করিতে চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার ফলে ‘ঈশ্বরবাদ’ (Deism)-এর উৎপত্তি। এই মতবাদ অনুসার ঈশ্বর যুক্তিসিদ্ধ, কিন্তু অনুভবসিদ্ধ নয় বলিয়া মনে করা হয়। এই মতবাদ প্রবর্তনের ফলে ধর্মের যে-টুকু অবশিষ্ট ছিল, তাহাও ডারুইন ও মিলের মতবাদ দ্বারা ধ্বংস হইল। ঐতিহাসিক এবং তুলনামূলক ধর্ম তখন মানুষের প্রধান উপজীব্য হইয়া উঠিল। তাহার মনে করিল, প্রাকৃতিক শক্তির পূজা হইতেই ধর্মের উদ্ভব। সূর্য-উপাখ্যান প্রভৃতি সম্পর্কে ম্যাক্সমূলারের মন্তব্য দ্রষ্টব্য। অন্যদলের সিদ্ধান্ত হইল, পিতৃপুরুষের পূজা হইতেই ধর্মের উৎপত্তি হইয়াছে; এ বিষয়ে হার্বার্ট স্পেন্সার দ্রষ্টব্য। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে এই-সকল মতবাদ ভ্রান্ত বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছে, কোন বহিরঙ্গ পন্থা অবলম্বন করিয়া মানুষ সত্য লাভ করিতে পারে না।
‘একটুকরা মাটি সম্বন্ধে জ্ঞান হইলে সমস্ত মাটি সম্বন্ধেই জ্ঞান হয়।’ সমগ্র বিশ্ব-জগৎও ঠিক একই পরিকল্পনা অনুসারে রচিত। মানুষ মৃত্তিকা-খণ্ডের মতো। আমরা যদি অণুস্বরূপ একটি মানবাত্মাকে জানিতে পারি, যদি তাহার সূচনা ও সাধারণ ইতিহাস জানিতে পারি, তাহা হইলে সমগ্র প্রকৃতিকেই জানা হইল। জন্ম, বৃদ্ধি, বিকাশ, ক্ষয় ও মৃত্যু—সমগ্র প্রকৃতিতে এই একই অনুক্রম; উদ্ভিদ্-জগৎ এবং মানুষের বেলায়ও সেই একই কথা। প্রভেদ শুধু কালে। একটি ক্ষেত্রে সমস্ত কল্পটি একদিনে সম্পূর্ণ হইতে পারি , আবার অন্য ক্ষেত্রে সত্তর বৎসর লাগিতে পারে; পদ্ধতিগুলি এক। বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে একটি সঠিক বিশ্লেষণে উপনীত হইবার একমাত্র উপায়—আমাদের নিজ মনের বিশ্লেষণ। ধর্ম বুঝিবার জন্য মানব-মনের যথার্থ বিশ্লেষণ প্রয়োজন, শুধু যুক্তির সাহায্যে সত্যে উপনীত হওয়া অসম্ভব, কারন অসম্পূর্ণ যুক্তি নিজস্ব মূল ভিত্তিই অনুধাবন করিতে পারে না। অতএব মনকে জানিবার একমাত্র উপায় হইল প্রকৃত তথ্যে পৌঁছানো, তবেই বুদ্ধি সেগুলিকে সুসংবদ্ধ করিয়া মূলনীতিসমূহের সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে পারিবে। বুদ্ধির কাজ নির্মাণ করা, কিন্তু ইট ছাড়া তো গৃহনির্মান সম্ভব নয়, আর বুদ্ধি নিজে ‘ইট’ তৈরী করিতে পারে না। প্রকৃত সত্যে উপনীত হইবার নিশ্চিত উপায় জ্ঞানযোগ।
প্রথমতঃ আমাদের মনের একটি গঠন-বিজ্ঞান আছে। আমাদের ইন্দ্রিয়-সমূহ আছে; ইহারা কর্মেন্দ্রিয় ও জ্ঞানেন্দ্রিয়—এই দুই ভাগে বিভক্ত; ইন্দ্রিয় অর্থে বাহ্য ইন্দ্রিয়-যন্ত্রকে বুঝাইতেছি না। মস্তিষ্কের দৃষ্টিশক্তির কেন্দ্রটিই দর্শনেন্দ্রিয়, চক্ষুটি নয়। এইরূপ প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়ের কাজ আভ্যন্তরীণ।
একমাত্র মনের প্রতিক্রিয়া ঘটিলেই বস্তু-সম্বন্ধে আমাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান হয়। এই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের জন্য সংঙ্গাবহ এবং ক্রিয়াবাহী উভয়প্রকার স্নায়ুই প্রয়োজন।
তারপর আছে মন স্বয়ং। ইহা একটি নিস্তরঙ্গ হ্রদের মতো; কোন কিছু, যেমন একটি প্রস্তরখণ্ডে পড়িলেই উহাতে কম্পন শুরু হয়। সেই কম্পনগুলি একত্র হইয়া ঐ প্রস্রখণ্ড প্রতিহত হয় এবং সমস্ত হ্রদব্যাপী বিস্তৃত হইয়া অনুভূত হইতে থাকে। মন এই হ্রদের মতো ইহাতে সর্বক্ষণ কম্পন চলিতে থাকে, এবং সেই কম্পন মনের উপর নানা রেখাপাত করে। আমাদের অহং-বোধ বা ব্যক্তিসত্তা বা আমি এইসব রেখাপাতেরই ফল। অতএব এই ‘আমি’ শক্তির একটি দ্রুত সঞ্চারণ মাত্র, ইহার নিজস্ব কোন বাস্তুব সত্তা নাই।
মনের মূল উপাদান অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি জড়যন্ত্র মাত্র, প্রাণকে ধারণ করিবার জন্য ইহা ব্যবহৃত হয়। যখন কোন ব্যক্তির মৃত্যু হয়, তখন তাহার দেহেরই মৃত্যু ঘটে, কিন্তু সব কিছুই যখন চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যায়, তখন মনের একটি ক্ষুদ্র অংশ বীজাকারে অবশিষ্ট থাকে। ইহাই নূতন দেহের বীজ-স্বরূপ, সেন্ট পল ইহাকেই ‘আত্মিক শরীর’ (spiritual body) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। মনের জড়ত্ব-সংক্রান্ত মতবাদটি আধুনিক সর্বপ্রকার মতবাদের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বোধের কোন বুদ্ধি নাই , কারণ তাহার মানস উপাদান নষ্ঠ হইয়া গিয়াছে। জড় বস্তুর মধ্যে বুদ্ধি থাকিতে পারে না অথবা জড়বস্তুর কোন সমবায়ের দ্বারা বুদ্ধি সৃষ্টি করা যাইতে পারে না। তাহা হইলে বুদ্ধি থাকে কোথায়? ইহা থাকে জড়ের অন্তরালে—ইহাই তো জীব, প্রকৃত সত্তা; জড়ের মাধ্যমে সেই তো কাজ করে। জড় ব্যতিরেকে শক্তির সঞ্চরণ সম্ভব নয়, যখন মৃত্যুর পর সমগ্র মনের কিয়দংশ ছাড়া সব কিছুই ধ্বংস হইয়া যায়, জীব একাকী ভ্রমন করিতে পারে না বলিয়া মনের ঐ কিয়দংশ তাহার সচ্ঞরণের মাধ্যমরূপে অবশিষ্ট থাকে।
