স্বভাবতই আমরা সর্ববিষয়ে চূড়ান্ত সীমার দিকে ধাবিত হই। যখন আমরা সুস্থ থাকি ও আমাদের বয়স অল্প, তখন আমরা মনে করি—জগতের সমস্ত ধন আমদের করায়ত্ত হইবে; কিন্তু পরে বয়স বাড়িলে সমাজ যখন আমাদিগকে ফুটবলের মতো চারিদিকে আঘাতে জর্জরিত করে, তখন এক কোণে বসিয়া বিরক্তির অস্ফুট শব্দ উচ্চরণপূর্বক আমরা অপরকে নিরুৎসাহ করিয়া দিই। অল্প লোকেই জানে যে, সুখের সঙ্গে দুঃখ আসে, এবং দুঃখের সঙ্গে আসে সুখ। দুঃখ যেমন বিরক্তিকর, সুখও তাই; সুখ দুঃখের যমজ ভ্রাতা। মানুষ দুঃখের পশ্চাতে ছুটিবে— ইহা তাহার মর্যাদার পক্ষে হানিকর; আবর সে সুখের পশ্চাতে ধাবিত হইবে—ইহাও সমভাবে অসম্মানজনক। যাহাদের বিচারবুদ্ধি সাম্যে স্থিত, তাহারা উভয়কেই পরিত্যাগ করিবে। মানুষ যাহাতে অপরের দ্বারা যন্ত্রবৎ চালিত না হয়, সেই চেষ্টা করিবে না কেন? এই মাত্র আমাদের চাবুক মারা হইল: যখনই কাঁদিতে আরম্ভ করিলাম, প্রকৃতি আমাদের একটি ডলার দিয়া দিল। আবার চাবুক খাইলাম, আবার কাঁদিতে লাগিলাম—প্রকৃতি তখন আমাদিগকে একখণ্ড পিষ্টক দিল; সঙ্গে সঙ্গেই আবার আমরা হাসিতে লাগিলাম।
জ্ঞানের সাধক চান মুক্তি। তিনি দেখেন, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলি সব অসার, এবং সুখ-দুঃখের অন্ত নাই, জগতে কত ধনীই না নূতন নূতন সুখ লাভ করিতে চায়! সব সুখই পুরাতন হইয়া গিয়াছে; এখন তাহারা মুহূর্তের স্নায়বিক উত্তেজনার জন্য নূতন সুখ চায়। দেখিতে পাইতেছ না—প্রতিদিন তাহারা কতই হাস্যাস্পদ বস্তু আবিষ্কার করিতেছে? তারপর লক্ষ্য করিয়াছ, ইহার কিরূপ প্রতিক্রিয়া আসে? অধিকাংশ লোক মেষপালের মতো। দলের প্রথমটি নর্দমায় পড়িলে বাকী সবগুলি তাহাকে অনুসরণ করিয়া বিপন্ন হয়। ঠিক এই ভাবেই সমাজের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি যাহা করে, অন্য সকলে নিজেদের কাজের পরিণাম না ভাবিয়াই তাহা করিতে থাকে। যখন কোন ব্যক্তি পার্থিব বস্তুর অসারতা উপলব্ধি করিতে আরম্ভ করে, সে অনুভব করে এইভাবে তাহার পক্ষে প্রকৃতির ক্রীড়নক হওয়া অথবা প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়; ইহা দাসত্ব। কোন ব্যক্তিকে কয়েকটি মধুর কথা বলিলে সে তৃপ্তির হাসি হাসিতে থাকে; কিন্তু কয়েকটি কর্কশ কথা শুনিলে সে কাঁদিতে থাকে। সে এক মুঠা অন্ন, একটু শ্বাস-প্রশ্বাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, দেশপ্রেম, দেশ, নাম ও যশের দাস। এই ভাবে সে দাসত্বের মধ্যে বাস করে এবং দাসত্ব-হেতু তাহার প্রকৃত স্বরূপ চাপা পড়িয়া যায়। তুমি যাহাকে মানুষ বলো, সে একটি ক্রীতদাস। এই সব দাসত্ব মর্মে মর্মে অনুভব করিলেই মুক্ত হইবার ইচ্ছা জাগে, মুক্তির একটি উদ্রগ্র বাসনা আসে। একখণ্ড জ্বলন্ত কয়লা একজনের মাথায় স্থপিত হইলে ইহা দূরে ফেলিয়া দিবার জন্য সে কিরূপ চেষ্টা করে! যে-ব্যক্তি সত্য সত্যই বুঝিতে পার যে, সে প্রকৃতির ক্রীতদাস—তাহার মুক্তির সংগ্রামও এইরূপ হইবে।
আমরা এইমাত্র দেখিলাম—মুমুক্ষুত্ব অর্থাৎ মুক্তির ইচ্ছা কি। সাধনার পরবর্তী সোপানটিও খুব শক্ত। ইহা হইল—নিত্যানিত্য-বিবেক অর্থাৎ সত্য ও অসত্য, নিত্য ও অনিত্যের বিচার। কেবল ঈশ্বরই নিত্য, আর সব কিছুই অনিত্য। সব কিছুই মরে—দেবদূত, মানুষ, জীবজন্তু সব মরে, পৃথিবী সূর্য চন্দ্র তারকা সব ধ্বংস হইয়া যায়। প্রতিটি বস্তু প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তিত হইতেছে। অদ্যকার পর্বতগুলি অতীতে মহাসাগর ছিল; আগামী কাল তাহারা মহাসাগরে পরিণত হইবে। প্রত্যেক বস্তুই প্রবাহাকারে চলিতেছে। সমগ্র বিশ্বই পরিবর্তনের একটি পিণ্ড। কিন্তু এক অপরিণামী বস্তু আছেন, তিনিই ঈশ্বর। আমরা যতই ঈশ্বরের নিকটবর্তী হই, পরিবর্তন আমাদের তত কম হইবে, প্রকৃতি তত কম আমাদের উপর ক্রিয়া করিবে। আমরা যখন তাঁহার সান্নিধ্য লাভ করিব, তাঁহার সঙ্গে একত্ব অনুভব করিব, তখনই আমরা প্রকৃতিকে জয় করিব, জগৎপ্রপঞ্চের উপর প্রভুত্ব করিব; আর আমাদের উপর তাহাদের কোন প্রভাব থাকিবে না।
দেখিতে পাইতেছ, যদি সত্য সত্যই আমরা উপরি-উক্ত শমদমাদি সাধনে প্রতিষ্ঠিত হই, তাহা হইলে আমাদের অন্য কিছুর প্রয়োজনই হয় না। সমস্ত জ্ঞান আমাদের ভিতরেই রহিয়াছে। আত্মার মধ্যে সমস্ত পূর্ণতা পূর্ব হইতেই রহিয়াছে; কিন্তু এই পূর্ণতা প্রকৃতি দ্বারা আবৃত। প্রকৃতি আপন এক একটি স্তরে আত্মার এই শুদ্ধ রূপকে আবৃত করিতেছে। এই অবস্থায় আমাদের কি করিতে হইবে? প্রকৃতপক্ষে আমরা মোটেই আত্মার উৎকর্ষ সাধন করি না। কোন অপূর্ণ বস্তু কি পূর্ণ বস্তুর উৎকর্ষ সাধন করিতে পারে? আমরা শুধু আবরণটিকে সরাইয়া লই। তখন আত্মা নিত্য-শুদ্ধ বুদ্ধ-মুক্ত স্বরূপে প্রকাশিত হন।
এখন প্রশ্ন : এইসব সাধনের এত প্রয়োজন কি? কারণ আধ্যাত্মিকতা কর্ন বা চক্ষু বা মস্তিষ্ক দ্বারা লাভ করা যায় না। শাস্ত্রপাঠেও আধ্যাত্মিকতা লাভ করা যায় না। জগতে যত গ্রন্থ আছে, সবই আমরা পড়িয়া ফেলিতে পারি, তবু ধর্ম বা ঈশ্বর-বিষয়ে কিছুই জানিতে না পারি। সমগ্র জীবন আমরা ধর্মের কথা বলিতে পারি; তাহাতেও আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি নাও হইতে পারে। আমরা পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মণীষা হইতে পারি, তথাপি একেবারেই ঈশ্বরের নিকট পৌঁছিতে না পারি। পক্ষান্তরে অত্যধিক বুদ্ধি-বৃত্তির অনুশীলনের ফলে কিরূপ অধ্যাত্মবিমুখ অধার্মিক সমাজ গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহা কি তোমারা দেখিতে পাও না? ইহা তোমাদের পাশ্চাত্য সভ্যতার একটি দোষ যে, তোমরা কেবল বুদ্ধির উন্মেষকারী শিক্ষার পশ্চাতে ধাবিত; হৃদয়বৃত্তির দিকে তোমরা দৃষ্টি দাও না। বুদ্ধিবৃত্তি শুধু মানুষকে দশগুণ অধিক স্বার্থপর করিয়া তোলে; ইহাই তোমাদের ধ্বংসের কারণ হইবে। হৃদয় ও মস্তিষ্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হইলে হৃদয়কেই মানিবে, কেন না মস্তিষ্কের একটি মাত্র বৃত্তি—বিতর্ক; ইহার মধ্যেই মস্তিষ্ক কাজ করে, ইহার বাহিরে যাইতে পারে না। হৃদয় মানুষকে উচ্চতম স্তরে লইয়া যায়; মস্তিষ্ক কখনও সেই স্তরে পৌঁছিতে পারে না। ইহা বুদ্ধিবৃত্তিকে অতিক্রম করিয়া বোধির স্তরে উপনীত হয়। বুদ্ধি কখনও প্রেরণাবোধ সৃষ্টি করিতে পারে না। কেবল হৃদয় যখন প্রজ্ঞালোকে আলোকিত হয়, তখনই উহা প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। হৃদয়হীন বুদ্ধিসর্বস্ব মানুষ কখনও প্রেরণা লাভ করিতে পারে না। প্রেমিক পুরুষের মধ্যেই হৃদয়ের বাণী শোনা যায়। বুদ্ধি অপেক্ষা হৃদয় উন্নত যন্ত্র আবিষ্কার করে—সেই যন্ত্র হইল অনুপ্রেরণার যন্ত্র। বুদ্ধি যেমন জ্ঞানের যন্ত্র, হৃদয় তেমনি প্রেরণার যন্ত্র। অপেক্ষাকৃত অনুন্নত স্তরে ইহা বুদ্ধি অপেক্ষা অনেকটা দুর্বল। জ্ঞানহীন ব্যক্তি কিছুই জানে না, কিন্তু তাহার প্রকৃতি কিছুটা আবেগপ্রবণ। তাহাকে একজন বিশিষ্ট অধ্যাপকের সহিত তুলনা কর—অধ্যাপকটির কি অদ্ভুত ক্ষমতা! কিন্তু তিনি তাঁহার বুদ্ধি দ্বারা সীমাবদ্ধ; এবং একই সময়ে তিনি একটি শয়তান ও প্রখরবুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন লোক হইতে পারেন, কিন্তু হৃদয়বান্ ব্যক্তি কখনও শয়তান হইতে পারে না। আবেগে পূর্ণ কোন ব্যক্তি কখনও শয়তান হয় না। ঠিক ঠিক অনুশীলন করিলে হৃদয়বৃত্তির পরিবর্তন হয় এবং ইহা বুদ্ধিবৃত্তিকে অতিক্রম করিয়া অনুপ্রেরণায় রূপান্তরিত হইবে। সর্বশেষে মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তি অতিক্রম করিতে হইব। মানুষের জ্ঞান, যুক্তি, অনুভব, বুদ্ধি ও হৃদয়বৃত্তির শক্তি—এ সবই জগদ্রূপ দুগ্ধমন্থনে ব্যস্ত। দীর্ঘকালব্যাপী মন্থনের পর আসে মাখন; এবং ঈশ্বরই সেই মাখন। যাঁহারা হৃদয়বান্ তাঁহারা ঐ মাখনই লাভ করেন এবং বুদ্ধিজীবীর জন্য পড়িয়া থাকে শুধু ঘোলা বা মাখন-তোলা দুধ।
