তারপর আবশ্যক—উপরতি। ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলি সম্বন্ধে চিন্তা না করা কে ‘উপরতি’ বলা হয়। ইন্দিয়ের বিষয় চিন্তা করিতে করিতেই আমাদের অধিকাংশ সময় ব্যয়িত হয়—যাহা দেখিয়াছি, শুনিয়াছি, যাহা দেখিব বা শুনিব, যাহা খাইয়াছি, খাইতেছি বা খাইব, যে যে স্থানে বাস করিয়াছি ইত্যাদি বিষয়েই আমাদের চিন্তা। আমারা প্রায় সব সময়ই ইহাদের সম্বন্ধে চিন্তা করি অথবা কথা বলি। যিনি বেদান্তী হইতে ইচ্ছুক তাঁহাকে এই অভ্যাস অতি অবশ্যই পরিত্যাগ করিতে হইবে।
পরবর্তী সাধন হইল তিতিক্ষা দার্শনিক জীবন দুঃসাধ্য সাধন!—এই সাধনটি সর্বাধিক দুষ্কর। অন্যায়ের প্রতিরোধ না করা সহিষ্ণুতার চরম আদর্শ; তিতিক্ষা ইহা হইতে কোন অংশে ন্যূন নহে। বিষয়টি একটু পরিষ্কারভাবে বোঝানো দরকার। বাহ্যত অন্যায়ের প্রতিরোধ না করিতে পারি কিন্তু তজ্জন্য অন্তরে দুঃখবোধ হইতে পারে। আমরা অত্যন্ত বিষণ্ণ বোধ করিতে পারি। কোন ব্যক্তি আমার প্রতিঅত্যন্ত রূঢ় বাক্য প্রয়োগ করিতে পারে, তজ্জন্য বাহ্যতঃ তাহাকে ঘৃণা না করিতে পারি, তাহার কথার প্রত্যুত্তর না দিতে পারে এবং নিজেকে সংযত করিয়া আপাততঃ ক্রোধ প্রকাশ করিতে না পারি, তথাপি আমার অন্তরে ক্রোধ ও ঘৃণা থাকিতে পারে এবং আমি ঐ লোকটির প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করিতে পারি। ইহা আদর্শ অপ্রতিরোধ নয়। এই আদর্শানুসারে আমার মনেও কোন ঘৃণা অথবা ক্রোধের ভাব থাকা উচিত নয়, এমন কি প্রতিরোধের চিন্তাও নয়; আমার মন এত স্থির ও শান্ত থাকিবে যেন কিছুই ঘটে নাই। যখনই আমি সেই অবস্থায় উপনীত হই, তখনই অপ্রতিরোধ-অবস্থা প্রাপ্ত হই; ইহার পূর্বে নয়। দুঃখ প্রতিরোধ করিবার অথবা দূর করিবার চিন্তামাত্র না করিয়া, মনের মধ্যে কোন প্রকার দুঃখময় অনুভূতি অথবা অনুশোচনা না রাখিয়া সর্ববিধ দুঃখের যে সহন—তাহাই তিতিক্ষা। মনে কর, অশুভের প্রতিরোধ করিলাম, ফলে গুরুতর অনিষ্টপাত হইল। আমার যদি তিতিক্ষা থাকে, তাহা হইলে অশুভ প্রতিরোধ না করার জন্য আমার অনুশোচনা বোধ করা উচিত নয়। সেই অবস্থায় উন্নীত হইলে বলা যায়, মন তিতিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হইল। ভারতবাসীরা এই তিতিক্ষা অভ্যাস করিবার জন্য অসাধারণ কর্ম করিয়া থাকেন। তাঁহারা কিছু গ্রাহ্য না করিয়া অত্যুগ্র শীত ও উষ্ণ সহ্য করেন; তাঁহারা তুষারও গ্রাহ্য করেন না, কেন না দেহ সম্বন্ধে তাঁহাদের কোনই চিন্তা থাকে না। দেহের ভাবনা দেহই করে, ইহা যেন একটি বাহিরের জিনিস।
অতঃপর যে সাধনের প্রয়োজন, তাহা শ্রদ্ধা। ধর্ম ও ঈশ্বরে প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকা দরকার। যতক্ষণ এই বিশ্বাস না হয়, ততক্ষণ কেহ জ্ঞানী হইবার উচ্চআশা পোষণ করিতে পারে না। একসময় একজন মহাপুরুষ আমাকে বলিয়াছিলেন যে, এই জগতে দুই কোটি লোকের মধ্যে একজনও ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘মনে কর, এই ঘরে একটি চোর রহিয়াছে এবং সে জানিতে পারিল, পাশের ঘরে রাশীকৃত সোনা আছে; ঘর দুইটের মাঝে একটি খুব পাতলা পরদা রহিয়াছে। আচ্ছা, সেই চোরটির কি অবস্থা হইবে?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘চোরটি একেবারে ঘুমাইতে পারিবে না; তাহার মস্তিষ্ক সক্রিয়ভাবে সেই সোনা হস্তগত করিবার উপায় উদ্ভাবন করিতে থাকিবে এবং তাহার অন্য কোন চিন্তা থাকিবে না।’ তদুত্তরে তিনি বলেন,’তুমি কি বিশ্বাস কর, কোন মানুষ ঈশ্বরবিশ্বাসী হইয়া ঈশ্বরকে লাভ করিবার জন্য পাগল হইয়া যাইবে না? যদি কোন লোক আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে, এক অসীম অনন্ত আনন্দের আকর রহিয়াছে এবং তাহা লাভ করা যায়, তাহা হইলে উহা লাভ করিবার চেষ্টায় সে কি পাগল হইবে না?’ ঈশ্বরে দৃঢ় বিশ্বাস এবং তাঁহাকে লাভ করিবার জন্য অনুরূপ আগ্রহকেই বলে ‘শ্রদ্ধা’।
তারপর সমাধান, অর্থাৎ মন ঈশ্বরে একাগ্র করিবার নিয়ত অভ্যাস। কো কিছুই এক দিনে সম্পন্ন হয় না। ধর্ম একটি বটিকার আকারে গিলিয়া ফেলা যায় না। ইহার জন্য প্রতিনিয়ত কঠোর অনুশীলনের দরকার। কেবল ধীর ও নিয়ত অভ্যাস দ্বারা মনকে জয় করা যায়।
তারপর মুকুক্ষুত্ব—মুক্তিলাভের তীব্র ইচ্ছা। তোমাদের মধ্যে যাহারা এড্উইন আর্নল্ডের ‘Light of Asia’ (এশিয়ার আলো) নামক গ্রন্থ পড়িয়াছ, বুদ্ধের প্রথম উপদেশের অনুবাদ নিশ্চয়ই তাহাদের মনে আছে। সেখানে বুদ্ধ বলিয়াছেন :
‘তোমরা নিজেদের জন্যই দুঃখভোগ করিয়া থাকো; অন্য কেহই তোমাদিগকে দুঃখ ভোগ করিতে বাধ্য করে না। তুমি জীবনধারণ কর, মৃত্যুমুখে পতিত হও, জীবন-মৃত্যুর চক্রে বিঘূর্ণিত হইয়া দুঃখের শলাকা, অশ্রুর বেষ্টনী এবং অসারতার মধ্যবিন্দুকে আলিঙ্গন কর—ইহাতে অন্য কেহই তোমাকে ধরিয়া রাখে না।’
আমাদের যাবতীয় দুঃখ আমরা নিজেরাই বাছিয়া লইয়াছি। ইহাই আমাদের প্রকৃতি। একজন বৃদ্ধ চৈনিক ষাট বৎসর কারারুদ্ধ ছিল; কোন নূতন সম্রাটের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষ্যে তাহাকে মুক্তি দেওয়া হয়। কারগার হইতে বাহির হইয়া সে চীৎকার করিয়া বলিল, ‘আমি আর বাঁচিতে পারিব না।’ তাহাকে আবার সেই বিভীষিকাপূর্ণ রুদ্ধ কারগৃহে যাইতে হইবে। সে আলোক সহ্য করিতে পারে নাই। সে রাজকর্মচারিগণকে বলিল, ‘তোমরা আমাকে মারিয়া ফেলো অথবা কারাগারে পাঠাইয়া দাও।’ তাহাকে কারাগারেই পাঠানো হইল। মানুষ মাত্রেরই ঠিক এইরূপ অবস্থা। আমরা উদ্দামগতিতে সর্বপ্রকার দুঃখের পিছনে ছুটি, দুঃখ হইতে মুক্তি লাভ করিতে আমরা অনিচ্ছুক। প্রতিদিন আমরা সুখের পশ্চাতে ধাবিত হই, নাগাল পাইবার পূর্বেই দেখি, উহা বিলীন হইয়া গিয়াছে, আঙুলের ফাঁক দিয়া গলিয়া পড়িয়া গিয়াছে। তবুও আমারা উন্মত্তভাবে সুখান্বেষণ হইতে বিরত হই না, বরং আগাইয়া চলি। এমন মোহান্ধ নির্বোধ আমরা!
