মুদ্রাস্ফীতির কুফল কবলিত আজকের দিনে লেখকদের শিল্প-সাধনায় অনন্য-নিষ্ঠ রাখতে হলে তাদেরকে প্রতুল না হোক–প্রচুর সম্পদের অধিকার দিতে হবে।
.
০২.
জীবনে যখন জাগরণ আসে, তখন মানুষ উন্মুক্ত হয়ে উঠে আত্মপ্রসারে। তখন তাজা প্রাণ ঘিরে থাকে সৃষ্টিসুখের উল্লাস। তখন সে হয় সৃজনশীল, চারদিকে কেবল নিজেকে রচনা করাই তার কাজ। সুন্দর করে বয়ন, শোভন করে রচন, আর কল্যাণমুখী সৃজন তার লক্ষ্য।
তাই প্রগতি কিংবা অগ্রগতি আসলে মনেরই চিন্তা-ভাবনার ফসল। আকাঙ্ক্ষা-প্রবল সুস্থ ও স্বস্থ মনের স্বভাবধর্মই হচ্ছে এগিয়ে যাওয়া। অগ্রগতির জন্যে চাই মনের ঘাহিকা শক্তি ও উচ্চাভিলাষ। সেক্ষেত্রে জ্ঞান তার সহায় আর আত্মবিশ্বাস তার অবলম্বন। এতেই মেলে সৃজনশীলতা। নতুনের অনুভবে, সুন্দরের অনুধ্যানে এবং মনোজীবনে আর ব্যবহারিক জীবনের ক্ষেত্রে বিচিত্র উদ্ভাবনায় মেলে তার পরিচয়। স্বাধীনতা লাভের পর আমরা দেখতে পাচ্ছি অন্তজীবনের বিকাশ এবং ব্যবহারিক জীবনের উন্নয়ন। শিল্পে-বাণিজ্যে, শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে-স্থাপত্যে সর্বত্রই অনুভব করছি নতুন জীবনের বিকাশোনুখ প্রাণের সাড়া। দেহ-মন আত্মার মুক্তি না ঘটলে এমনি এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ আসে না।
সাহিত্যই হচ্ছে জাতীয় জীবনের অগ্রগতির শ্রেষ্ঠ পরিমাপক। কেননা, সাহিত্যেই ঘটে মন মানসের অন্তরঙ্গ ও সুন্দরতম প্রকাশ। ব্যক্তি ও জাতিকে চেনা যায় তার সাহিত্য পড়েই। এ অর্থেই সাহিত্য জাতীয় জীবনের মুকুর ও প্রতিভূ।
আমাদের জাতীয় সাহিত্যে অগ্রগতির পরিচয় নিলে বোঝা যাবে আমাদের কতখানি ঘটেছে মনের মুক্তি, কতখানি সুস্থ ও সুস্থ আমাদের চিত্তলোক আর কীভাবে এবং কোনো পথে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা-বিশেষ করে তরুণের দৃষ্টিতে তার সামগ্রিক রূপটি কীভাবে ধরা পড়ছে মিলবে তারও আভাস।
দোভাষী পুথির ভাষা
০১.
ছাপাখানা প্রবর্তিত হবার পূর্বেকার হস্তলিখিত পুস্তকমাত্রেই পুথি নামে পরিচিত ছিল। পুথি শব্দ সংস্কৃত পুস্তিকা শব্দজাত। কাজেই পুথি বলতে প্রাচীন অমুদ্রিত গ্রন্থাবলীকেই বোঝানো উচিত। কিন্তু অধুনা কেউ কেউ আঠারো, উনিশ ও বিশ শতকের বাংলা-হিন্দুস্তানী মিশ্রিত ভাষায় রচিত দোভাষী (দ্বিভাষী) কাব্যগুলোকেই বিশেষ অর্থে পুথি নামে অভিহিত করেন। সেজন্যে আমরাও পুথি সাহিত্য অর্থে দোভাষী পুথিই বুঝব।
দোভাষী পুথির ভাষা সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে একটু ভূমিকা প্রয়োজন। আর্য-পূর্ব যুগে বাঙলা দেশে বিভিন্ন গোত্রের যে-সব লোক বাস করত, তাদের স্ব স্ব ভাষা ছিল বা সর্বজনীন একটি মিশ্রভাষায় (অস্টিক-দ্রাবিড়-মোঙ্গল ও অন্যান্য অনার্য ভাষার মিশ্রণজাত) তারা কথা বলত–এটা আমরা অনুমান করতে পারি। কারণ খ্রীস্টীয় আট শতকে রচিত আমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প নামক সংস্কৃত গ্রন্থে উল্লেখ আছে, অসুরানাং ভবেৎ বাঁচা গৌড় পুড্রোদভবা সদা।–অসুরেরা গৌড় ও পুণ্ড্রবর্ধন জাত ভাষা ব্যবহার করে।
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম নিয়ে যখন ধর্মপ্রচারক ও শাসক হিসেবে মুখ্যত আর্য সংস্কৃতিবাহী ও আর্যভাষা (প্রাকৃত)-ভাষী একদল লোক বাঙলা দেশে তাদের প্রভাব বিস্তার করলেন, তখন এদেশীয় প্রাচীন অধিবাসীরা অপেক্ষাকৃত উন্নত আর্যধর্ম, দর্শন, ভাষা ও সংস্কৃতি বিনাদ্বিধায় গ্রহণ করে নিল, এও আমরা অনুমান করতে পারি। কারণ, সবল ও উন্নত শাসকজাতির কাছে দুর্বল, বিজিত ও শাসিত জাতির সংস্কৃতির পরাজয় ও বশ্যতা চিরকালীন ঐতিহাসিক সত্য ব্যাপার।
বাঙলা দেশে যে-আর্যভাষা প্রথম প্রবেশ করেছিল তা বৈদিক বা সংস্কৃত ভাষা নয়–বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বাণীবাহক পালি বা প্রাকৃত। ভারতের নানাস্থানে যূরোপীয়দের হাতে দীক্ষিত ভারতীয়গণ যেমন ইংরেজিকে তাদের নিজেদের ভাষারূপে গ্রহণ করে; বাঙালিরাও তেমনি পালি প্রাকৃতকে মাতৃভাষারূপে বরণ করে। কারণ, তাদের নিজেদের কোনো লিখিত ভাষা ও সাহিত্য ছিল বলে কোনো প্রমাণ মেলে না। এখনো কোল, মুণ্ডা, কুকী ও নাগাদের কোনো বর্ণমালা বা লিখিত ভাষা নেই। কাজেই বাঙালিরা পালি-প্রাকৃতকেই গ্রহণ করে বলে বিশ্বাস করা চলে। সংস্কৃতের সঙ্গে তাদের পরিচয় হতে পারেনি।
উক্ত পালি-প্রাকৃত ভাষায় তাদের নিজেদের ভাষার যেসব শব্দের প্রতিশব্দ পাওয়া যায়নি, অথবা পালি-প্রাকৃতের যেসব শব্দ তাদের কাছে শ্রুতিসুখকর বা প্রয়োজনীয় ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ বলে মনে হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে তারা নিজেদের শব্দসম্পদ বর্জন করেনি। ফলে আজো বাঙলা ভাষায় আমরা বহু দেশী তথা অপ্রাকৃত শব্দ পাচ্ছি। কালক্রমে যে আরো বহু শব্দ লুপ্ত হয়ে গেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
তারপর বিদেশী মৌর্য ও গুপ্ত শাসনকালে এবং পাল রাজাদের আমলে কিছু কিছু সংস্কৃত শব্দ আমদানি হয়ে বাঙালির ভাষায় স্থায়ীভাবে ঠাই পেল। এরপর ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজাদের আমলে এদেশে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চার ধুম পড়ে গেল। সে সময় সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য বাঙালির উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। বাঙালির ভাষা সংস্কৃত শব্দসম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে উঠে।
এরপর আসেন মুসলমান ধর্মপ্রচারক ও শাসকগণ। এসময় অনিবার্য কারণে বহু ফারসি, তুর্কী ও আরবি শব্দ ভাষায় স্থায়ী আসন লাভ করে।
