–চব্বিশ।
বিভার মন্তব্য, আগের দিনের মানুষদের বিয়ে তো একটু আগেই হত-তাহলে ভদ্রলোকের মেয়ে হওয়াই সম্ভব।
মোহিনী সরকারের উকীলের মাথা, তার ভাবনাও একেবারে অত সহজ বা সরল কিছু না। জবাব দেন কিন্তু মেয়ে মনে হয় না। প্রথম কথা, ভদ্রলোককে মহিলার আগলে রাখার মধ্যে একটু মিষ্টি শাসনের ভাব আছে যা বাদ দিলে তোমার সঙ্গেও একটু আধটু মেলে।
বিভা ছোট্ট প্রতিবাদ করলেন, আ-হা
–দ্বিতীয় কথা, আজই তোমাতে আমাতে ওই ঢিবিতে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম, বিকেলের আলোয় টান ধরতে না ধরতে ব্যাগ থেকে চাদর বার করে মহিলা নিজের হাতে বেশ করে ভদ্রলোকের গায়ে গলায় জড়িয়ে দিলেন, যা অনেকটা শরৎবাবর নায়িকাদের সঙ্গে মেলে। কিন্তু তাদের মধ্যে একমাত্র শেষ প্রশ্নে তাজমহলে বেড়াতে এসে আশু বদ্যির মেয়ে মনোরমাকে বার দুই বলতে শুনেছি বাবা ওঠো, তোমার। ঠাণ্ডা লাগবে। নিজে হাতে কিছু করে নি। মোট কথা, ওভাবে চাদর জড়িয়ে দেওয়াটা বাবা মেয়ের সম্পর্কের মতো আমার একটুও মনে হয় নি।
কি বলতে চান বিভা অতটা তলিয়ে না ভেবেই জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে কি অনেক ছোট বোন-টোন হবে?
মোহিনী সরকার হালছাড়া গলায় বললেন, এত আধুনিক বই গিলে শেষে এই ছন্দপতন! ভাই-বোনের ছাদ-ছিরিতে এমন অসম্ভব তফাৎ হয়! হলেও আমার ভাবতেই নীরস লাগে। আমি বলছিলাম, ভদ্রমহিলা ভদ্রলোকের তৃতীয় বা চতুর্থ পক্ষের উনি হতে বাধাটা কি–তা হলে অনেকগুলো কনডাক্ট রুল মনে আচরণ-বিধি মেলে।
বিভা সরকার বক্র শ্লেষে তক্ষুণি সেই সম্ভাবনা বাতিল করেছেন।-হুঁ, খোঁজ নিয়ে দেখো গে যাও বয়েসকালে প্রথম পক্ষ করার জন্য কত ছেলে ও মেয়ের পায়ের কাছে গড়াগড়ি খেয়েছে–দেখলে বুঝতে পারো না? অমন খ্যাংরাকাঠির তৃতীয়-চতুর্থ হবার তার দায় পড়েছে।
-তা অবশ্য ঠিক, কিন্তু অমনটি হলেই একটু রসের হয় না?
-বাজে বোকো না, শেষে দেখবে বাপ-মেয়ে বা সেই গোছের কিছু, তখন সে বেরিয়ে যাবে। তুমি যে বলেছিলে, কদিন দেখার পর ভদ্রলোকের মুখখানা একটু চেনা চেনা ঠেকছে, কোথাও দেখেছ মনে হচ্ছে–মনে পড়ছে?
দুতিন দিন দেখার পর মোহিনী সরকারের সত্যি মনে হয়েছে ভদ্রলোকের ওরকম একখানা মুখের আদল, বিশেষ করে ওই গোছের একটু মিষ্টি মিষ্টি হাসি কবে কোথাও দেখেছেন। ওকালতিতে আইনের ধারা পড়ে পড়ে হোক বা যে কারণেই হোক, আজও তাঁর প্রখর স্মরণশক্তি। কিন্তু অনেক ভেবেও তিনি ঠিক করতে পারেন নি, এই ভদ্রলোকটিকে কোথাও তিনি দেখেছেন কি দেখেন নি। অথচ মনে হয় দেখেছেন।
জবাব দিলেন, না, কত অচেনা লোককেই তো অনেক সময় চেনা-চেনা মনে হয়।
স্ত্রীটি তক্ষুণি সন্দিগ্ধ।–আসলে তোমার মেমরি খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
আরো দুদিন বাদে চাক্ষুষ দেখা আর সামনা-সামনি আলাপ। বিকেলের দিকে মোহিনী সরকার আর বিভা সরকার রেল লাইনের দিক ধরে বেড়াতে বেড়াতে আসছিলেন। ওই দু ঘরের বাংলোর সামনের ঘরের দরজা খোলা। দরজা আগলে বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। গায়ে একটা আধা গরম চাদর জড়ানো। তাঁদের দিকেই চেয়ে আছেন।
মোহিনী সরকারও তার দিকে চেয়ে হঠাৎ হাসলেন একটু। অবশ্যই সৌজন্যের হাসি।
ভদ্রলোকও তক্ষুণি হাসলেন এবং মিষ্টি হাসি।
মোহিনী সরকার আর বিভা সরকার তখন বাংলোর দশ গজের মধ্য দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। মোহিনী সরকার হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে হাসিমুখে দু হাত কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার জানালেন।
ভদ্রলোকও তক্ষুণি প্রতি-নমস্কার করে অন্তরঙ্গ অভ্যর্থনা জানালেন, আসুন আসুন –বেড়িয়ে ফিরছেন?
মোহিনী সরকার ঘুরে স্ত্রীর হাসিছোঁয়া মুখখানা একবার দেখে নিয়ে ভদ্রলোকের দু গজের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।-হা… আপনারা আজ বেরোন নি?
মুখখানা একটু বিরস করে ভদ্রলোক জবাব দিলেন, নাঃ, আমার শরীরটা নাকি আজ খুব ভালো নেই।
শুনে মোহিনী সরকার এবং তার পিছনে বিভা সরকার অবাক। নিজে বলছেন, শরীরটা নাকি ভালো নেই–এ আবার কি কথা?
ভদ্রলোক আবার সাদর আহ্বান জানালেন, আসুন, ভিতরে আসুন।
তাঁরা তবু একটু দ্বিধান্বিত। অসুবিধে হবে কিনা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই ভদ্রলোকের পিছন থেকে কচি ছেলের গলার মতো মিষ্টি রমণীকণ্ঠ শোনা গেল, কার সঙ্গে কথা হচ্ছে?
ভদ্রলোকের এবারের জবাবও অদ্ভুত। পাশের ঘরের দিকে সামান্য ঘাড় ফিরিয়ে জবাব দিলেন, আমাদের সেই ওঁরা–
না বুঝে ঈষৎ বিস্ময়ে ভিতরের মহিলা এগিয়ে এসে ভদ্রলোকের পাশ দিয়ে দেখলেন। তারপরেই হাসিমুখে ব্যস্ত আহ্বান জানালেন, ও… আসুন আসুন। আঃ, দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকলে ওঁরা আসেন কি করে!
শেষেরটুকু ভদ্রলোকের উদ্দেশে। তিনি অপ্রস্তুত মুখে সরে দাঁড়ালেন। মোহিনী আর বিভা সরকার ভিতরে ঢুকলেন। মহিলা সামনের কাঠের চেয়ার দুটো দেখিয়ে বললেন, বসুন–
চেয়ার দুটোর পাশেই একটা ইজিচেয়ার পাতা। বিভা হাসি হাসি মুখে একটা কাঠের চেয়ারে দিকে এগোলেন। কিন্তু বসার আগেই বাধা পড়ল। মোহিনী সরকার প্র্যাকটিস অনেক ছেটে দিলেও বাঘা উকিল তো বটেন। মনে মুখে তেমন লাগাম টেনে কথা বলার অভ্যেস নেই। তিনি ভদ্রলোকের দিকে ফিরে বলে উঠলেন, দাঁড়ান, একটা জিনিস আগে বুঝে নিই, উনি (মহিলা) কার সঙ্গে কথা হচ্ছে জিজ্ঞেস করতে আপনি জবাব দিলেন, আমাদের সেই ওঁরা–মানে, আপনাদের আমরা… কি রকম ব্যাপার?
