এবারে কাছাকাছির মধ্যে সস্ত্রীক ঘাটশিলায় এসেছেন। ছেলে বা ছেলের বউ তাঁদের সঙ্গে কখনো বেরোয় না। এদিকে মোহিনী সরকার সস্ত্রীক আসা মানে সঙ্গে পুরনো খানসামা আসা, একটা ছোকরা চাকর আসা, চাকরের থেকে প্রমোশন পাওয়া বয়স্ক অথচ কর্মঠ কেয়ারটেকারের আসা। সকলেই এসেছে। সেই সঙ্গে কলকাতা থেকে আরামে বা ভালো থাকার জন্যে যেসব সরঞ্জাম আনা সম্ভব তা-ও এসেছে। অথচ সরকার দম্পতি এখানে একমাস থাকবেন কি এক সপ্তাহ সেটা কেমন লাগে তার ওপর নির্ভর। বেশ নিরিবিলি ছিমছাম জায়গা, স্বাস্থ্যকর তো বটেই, আশা করা যায় ভালোই লাগবে।
এখানে এসে তিন চার দিন ধরে মোহিনী সরকার আর বিভা সরকার আর একজোড়া ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাকে লক্ষ্য করছেন। এদের দৃষ্টিতে তারা আর যা-ই হোন দম্পতি বলে মনে হয় নি। মোহিনী সরকার উকিলের চোখ দিয়ে তাঁদের দেখছেন। আর বিভা সরকার তার সহজাত মেয়েলি কৌতূহলের চোখ দিয়ে। খুব সকালে তিন মাইল দূরের বাজারে বা কিছুটা কাছের হাটে দুজনকে দেখেছেন। এখানে খুব সকালে ভিন্ন বাজার থেকে পছন্দের মাছ তরকারি বা মাংস মেলা ভার। বেড়ানোর মৌসুমে লোকের ভিড়ে তো বাজার আরো আকাল হয়ে ওঠে। মোহিনী সরকার সস্ত্রীক সাইকেল রিকশয় আসেন, হাট বা বাজার সেরে তাতেই ফেরেন। তাদের লক্ষ্যের ওই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাও তাই। মোহিনী সরকার তাদের বাজার করাও একটু আধটু লক্ষ্য করেছেন। ভদ্রলোককে এই বয়সেও একটু পেটুক মনে হয় তার। কারণ, সামনে যা দেখেন সঙ্গিনীকে তাই কিনতে বলেন। আর সঙ্গিনীটি সুন্দর মুখে একটু ভুরু কুঁচকে বা একটা হাত অল্প একটু নেড়ে তার বেশির ভাগই বাতিল করে দেন। মোহিনী সরকার বেশ লক্ষ্য করেছেন, মহিলা নিজের বিবেচনামতো পরিমিত বাজার করেন। নিজেই শক্ত হাতে বাস্কেট বা ব্যাগ নিয়ে বাজার বহন করেন। মাথায় কাপড় থাকে না তখন, শাড়ির আঁচল গাছকোমর করে জড়ানো থাকে। মোহিনী বা বিভা সরকারের বাজারের ব্যাগ আর থলে অবশ্যই ছোকরা চাকরটার হাতে। সময় হিসেব করে তাকে আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাজার শেষে ছোকরাটা হেঁটে ফেরে, আর বাজার ফেরে তাদের রিকশয়।
হাটে বা বাজারে ছাড়া রাস্তায় দেখা হচ্ছে, শীর্ণ সুবর্ণরেখার ধারে বা কাছের পাহাড়ী টিলাটার কাছেও দেখা হচ্ছে। কাছাকাছির মধ্যে বেড়াবার জায়গা এই দুটোই। শহরের মধ্যে বেড়াতে বেরুলে এর এক জায়গায় না এক জায়গায় দেখা হবেই। কিন্তু বেড়াতে তো আরো অনেকেই বেরিয়ে থাকেন। অথচ সরকার দম্পতির অবধারিত লক্ষ্য ওই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাটি।
লক্ষ্যের প্রধান কারণ বোধহয় দুজনের বয়সের ফারাক। ফারাকটা অবশ্য সরকার দম্পতির বিবেচনায়। দুজনেরই ধারণা, ভদ্রলোকের বয়েস সত্তরের কিছু ওপরে ছাড়া নিচে হবে না। মাথায় চুল যেটুকু আছে সবই সাদা। গায়ের রং না কালো না ফর্সা। চোখে মোটা কাঁচ আর মোটা ফ্রেমের চশমা। লাঠি ব্যবহার করেন না বটে তবে ধীরেসুস্থে পা ফেলে হাঁটেন। মুখখানা হাসি-হাসি, কিন্তু, মহিলার তুলনায় কথা কম বলেন যে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যখনই দেখা হয়, মহিলাকে বেশ সুন্দর ভঙ্গীতে একটু একটু হাত নেড়ে কথা বলতে দেখা যায়। ভদ্রলোকের বেশির ভাগ শ্রোতার আর অল্প অল্প হাসার ভূমিকা।
কৌতূহলের বা লক্ষণীয় হয়ে ওঠার আসল কারণ ওই মহিলা। দুজনেরই মতে তার বয়েস খুব বেশি হলে সাতচল্লিশ কি আটচল্লিশ। মাথায় একরাশ কুচকুচে চুলের ওপর দিয়ে কতগুলো রুপোলি চুল ছড়িয়ে না থাকলে বা কানের দুপাশেও কিছু পাকা চুল দেখা না গেলে সাতচল্লিশ আটচল্লিশও আদৌ বলা যেত না। গায়ের রং রীতিমতো ফর্সা, মুখশ্রীও সুন্দরই বলতে হবে। কিন্তু অমন ফর্সা বা অমন মুখশ্রীও হামেশাই দেখা যায়। এ ছাড়াও মহিলার মধ্যে দর্শনীয় কিছু আছে যা চট করে ঠাহর করা যায় না, অথচ অনুভব করা যায়। বয়েসকালে প্রায় দীর্ঘাঙ্গী মহিলার স্বাস্থ্য-সম্পদ নিশ্চয় চোখে পড়ার মতো ছিল। তারই তৎপরতাটুকু এখনো যেন সর্ব অঙ্গে ছড়িয়ে আছে। তার বাস্কেট হাতে বাজার করা, হাঁটা চলা কথা বলার সময় ঈষৎ চঞ্চল ভঙ্গীতে সুডৌল হাত নাড়া–সবকিছুর মধ্যে সেই সূতৎপর মাধুর্যটুকু রমণীয় হয়ে ওঠে। সুগৌর। কপালে ঘোটর ওপর জ্বলজ্বলে সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে সিঁদুরের জ্বলন্ত আঁচড়। এ রকমই হয়তো সকলে পরে, কিন্তু মহিলার সজীবতার দরুন তা-ই হয়তো একটু বেশি উজ্জ্বল মনে হয়। মহিলার মধ্যে দর্শনীয় কি মোহিনী সরকারের ধারণা তিনি ধরতে পেরেছেন এবং স্ত্রীকেও বলেছেন। সাতচল্লিশ বা আটচল্লিশ যে বয়েসই হোক এখন, মহিলার চাল-চলনে তা-ও যেন একটু তফাতে সরে আছে–ছুঁয়ে থেকেও ছুঁতে পারছে না। বিভা সরকার এই মন্তব্যের সঙ্গে খুব দ্বিমত হননি।
এখন প্রশ্ন বা কৌতূহল, ভদ্রমহিলা ভদ্রলোকের কে হতে পারেন? আত্মীয়া তো বটেই। তাদের বাড়ির আধ মাইলের মধ্যে রেল লাইনের কাছাকাছি দুখানা ঘরের একটা ছোট্ট বাংলোয় ওঁরা আছেন–আসতে যেতে সরকার দম্পতি তা-ও দেখে রেখেছেন। আত্মীয়া ভিন্ন ওই বুড়োর সঙ্গে এসে এক বাড়িতে থাকা, এক রিকশয় চেপে বাজারে যাওয়া বা বিকেলে একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া সম্ভব কেউ ভাবে না। আত্মীয়া তো বটেই, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়াই মনে হয়। কিন্তু সেটা কি হতে পারে? অবকাশ অঢেল, তাই আলোচনাতেও আলস্য নেই। মোহিনী সরকার আর বিভা একটু হিসেবও করেছেন। বিভা বলেছেন, ধরা যাক ভদ্রলোকের বয়েস বাহাত্তর, তার বেশি ছাড়া কম কিছুতে হবে না, আর ওই মহিলার বড়জোর আটচল্লিশ–তাহলে তফাৎ কত হল?
