তখন ঠাণ্ডা।
মনঃপূত নয় এমন কিছু করলেই অভিমান। নিজের খেয়ালখুশিতেই রাখি এমন অনেক কিছুই করে বসে। বেঁকের মাথায় স্কুল থেকে হয়ত দলের সঙ্গে সিনেমায় চলে গেল, নয়ত একেবারে সন্ধ্যার পর বেরিয়ে ফিরল কোথাও থেকে। ব্যস, মুখ ভার। ফলে আগের থেকে মানুষটাকে ঠাণ্ডা রাখার কৌশলও রপ্ত করেছে রাখি।…সেদিন সুলতাদি রমলাদি ধরল–কাল রবিবার, তাদের টাইগার হিলএ নিয়ে যেতে হবে। খরচ সব রাখির। এড়ানো গেল না। ঠিক হল খুব সকালে বেরুবে, বেলা দেড়টা দুটো নাগাদ ফিরে আসবে।
কথা দিয়ে আসার পর রাখির ভাবনা। মানুষটা সঙ্গে যাবে না জানা কথাই৷ রবিবারে প্রথমে ছাত্র পড়তে আসবে গুটিকয়েক, তারপর মাস্টাররা আসবে কেউ কেউ। তাদের চা-টা একদিন অবশ্য ছোকরা চাকরটাই দিতে পারবে, কিন্তু তাহলেও ছুটির দিনে সকাল থেকে বেলা দুটো পর্যন্ত বাইরে কাটানো বাবুর সহজে বরদাস্ত হবে না। তার ওপর একটু অন্যরকম রান্নাবান্না করা হবে না বলে বেলা দুটো আড়াইটে পর্যন্ত হয়ত না খেয়েই বসে থাকবে।
অতএব উল্টো প্যাঁচ কষল রাখি। বাড়ি ফিরে মুখহাত ধুয়ে বিকেলেই মুখরোচক কিছু খাবার তৈরী করল। তারপর গুনগুন করে গান করতে করতে খাবারের ডিস সামনে এনে ধরল। সুবীরকান্ত বই-মুখে চিৎপাত হয়ে বিছানায় শয়ান। রাখি তার মুখে কিছুটা খাবার গুঁজে দিতে সে হাসিমুখেই উঠে বসল।
জলযোগ শেষ হতে টুকিটাকি কিছু কাজ করার জন্য বেরিয়ে এলো। ও লোকটা আবার বই নিয়ে শুয়ে পড়বে জানা কথাই। খানিক বাদে রাখি লঘুপায়ে ঘরে ফিরল আবার। পর্দটা টেনে দিয়ে সোজা শয্যায় তার পাশে বসে পড়ে বইটা হাত থেকে টেনে ফেলে দিল। তারপর আধ-বসা হয়েই তার বুকের ওপর বুক রেখে দুহাতে মাথাটা ধরে ঝাঁকালো একবার। তারপর একেবারে মুখের ওপর ঝুঁকে বলল, মাস্টারমশায়, আমার একটা আর্জি আছে।
এই গোছের বিস্মৃতি পেলে তখনকার মতো পড়াশুনার আশায় জলাঞ্জলি দিতে সুবীরকান্তর একটুও আপত্তি নেই। দুহাতে তাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আর্জি যেন মঞ্জুরই করে ফেলল।–এই দিনের বেলাতেই?
–ধ্যেৎ, অসভ্য কোথাকার! হাত ছাড়াবার চেষ্টা।
–আচ্ছা বলো বলো।
–না, আগে তুমি কথা দাও!
–কথা দিলে শেষে যদি তুমি ফ্যাসাদে ফেলো আমাকে?
–ও, এই টান আর এই বিশ্বাস তোমার আমার ওপর?
–ছাড়ো
ছদ্ম রাগে আবারও হাত ছাড়ানোর চেষ্টা।
–আচ্ছা, কথাই দিলাম। বলো।
কাল সকালে তুমি ছেলে পড়াবে না, আমার সঙ্গে এক জায়গায় যাবে?
–কোথায়? আঁতকে উঠল যেন।
টাইগার হিলএ। খুব সক্কালে উঠে যাব, বেলা একটা দুটোর মধ্যে ফিরে আসব। সুলতাদি রমলাদি এমন ধরেছে, আমি কিছুতে এড়াতে পারলুম না। ওরা ঠাট্টা করে, মুখে মুখ লাগিয়ে আর কতকাল কাটাবি, চার সাল তো হয়ে গেল!
এর পর রমলাদি-সুলতাদির সঙ্গে ওকে ছাড়াই টাইগার হিল ঘুরে আসার জন্যে পাল্টা অনুরোধ শোনার পালা। ছেলেগুলো সমস্ত সপ্তাহ এই একটা দিনের আশায়। বসে থাকে, কী করে যায় সুবীরকান্ত-আগে জানলেও না হয় কথা ছিল!
বেগতিক দেখলে রাখি এই গোছের কৌশলে ঘরের লোকের অভিমান ঠেকিয়ে রাখে।
কিন্তু ও যেমন স্বামীর মান-অভিমান সবলতা-দুর্বলতার সন্ধান পেয়েছে, স্বামীটিও যে ঠিক তেমনি করেই তার স্ত্রীর চরিত্রটি নানা খুঁটিনাটির ভিতর দিয়ে সকৌতুকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে–সে খবর রাখির জানা নেই।
না, এযাবৎ নিজের স্ত্রীর প্রতি সুবীরকান্ত বিরূপ কখনো হয়নি। বরং অনেক ব্যাপারে তার ছেলেমানুষি দুর্বলতা দেখে বেশ মজাই লেগেছে।…ব্যাপারে আধুনিক চটকের ওপর স্ত্রীটির অনুরাগ। প্রথমেই তার নাক ধরে টান দিয়েছিল, বলেছিল, আচ্ছা নামের সঙ্গে তুমি আবার একটা কান্ত জুড়েছ কেন? সুবীর চক্রবর্তী তো বেশ নাম।
ও হেসে জবাব দিয়েছে, কান্ত নাই বলে বোধহয় বাপ-মা নামের ওপর দিয়ে অভাবটুকু উশুল করতে চেয়েছে।
–এখন ছেটে দাও।
–ছাঁটতে রাজি নই, বরং নাম বদলে রাখিকান্ত হতে পারি।
বিয়ের পরেই বাপেরবাড়িতে দিনকয়েক রাখি ওকে সুবীর বলেই ডেকেছে। কিন্তু একদিন ওর মায়ের কানে যেতে সুবীরের সামনেই কষে ধমক।-ও কী বিচ্ছিরি! খবরদার নাম নিয়ে ডাকবি না!
-বা-রে! ও যে নাম ধরে ডাকে?
–ও ডাকুক, তুই ডাকবি না।
আপত্তি সত্ত্বেও মায়ের কথা ফেলতে পারেনি। এখন আর ডাকে না।
দার্জিলিংয়ে আসার দিনকয়েক বাদে হঠাৎ একদিন বলেছিল, আচ্ছা এত বড় স্কলার হয়েও তুমি আই, এ. এস. পরীক্ষা দিলে না কেন?
–দিলে কী হত?
–দিলে আই. এ. এস, হতে পারতে না? আমার বন্ধু সোমার আই. এ. এস. বর, কী বিরাট চাকরি করে এখন জানো?
ঠিক এই গোছের ছেলেমানুষি ধরনের কথা না হলে সুবীরকান্তর হয়ত খারাপই লাগত। হেসেই ফিরে জিজ্ঞাসা করেছে, কেন, কলেজের মাস্টার পছন্দ নয়?
-মাস্টার পছন্দ নয়, তোমাকে পছন্দ।…চেষ্টা করলে তুমি আই. এ. এস. হতে পারতে।
-তা হয়ত হতে পারতুম, কিন্তু এই রাখিকে পেতাম না।
-কেন?
–তখন আর দার্জিলিংয়ে আসতুম না, তোমার সঙ্গে দেখাও হত না। তাছাড়া আই. এ. এস. হলে হয়ত লোভ আরো বেড় যেত, রাজকন্যা আর অর্ধেক রাজত্ব খুঁজতাম।
যুক্তিটা অস্বীকার করেনি রাখি, মাথা নেড়ে বলেছে, তা সত্যি, কী খরচটাই করেছিল তোমার কাকা, আমাদের ঘর-বাড়ি বেচলেও অত হত না।
স্ত্রীর উঁচু দৃষ্টির আঘাত পরের এই ছেলেমানুষি উক্তির দরুণই একটুও লেগে থাকে না। রং মজাই লাগে শুনতে। গম্ভীর মুখে ও-কথার পর বলেছিল, ধরো। আই. এ. এস, অফিসার হয়ে, আর তোমার বদলে তোমার বন্ধু সোমার বরটি হয়ে, আমি দার্জিলিংয়ে বেড়াচ্ছি-তোমার দেখতে কেমন লাগত?
