হাসিমুখে সুবীরকান্ত নিজের রুমাল এগিয়ে দিল। দ্বিধা দেখে রুমালটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, বিপাকে পড়লে লজ্জা করতে নেই!
অগত্যা তার রুমালেই মুখ মুছল রাখি। শরীরে কী এক অজানা অনুভূতি শিরশির করছে। রুমালটা তার হাতে ফেরত দিয়ে হাসিমুখে বলেই ফেলল, এটা বিপাক! ২৬০
রুমালটা দিয়ে বেশ চেপে চেপে নিজের মুখ মুছল সুবীরকান্ত। একটা লোভনীয় স্পর্শ যেন ওতে লেগে আছে। জবাব দিল, দুজনের দুরকমের বিপাক। তোমার বিপাক জলটা এল বলে, আর আমার বিপাক ওটা এত চট করে থেমে গেল বলে।… এবারে বোধহয় ভদ্রলোকের মতো আমার ওই পাথরটাতে উঠে যাওয়া উচিত।
হাসছে রাখিও। চোখের কোণে দুষ্টুমি। অল্প মাথা নাড়ল। অর্থাৎ তাই উচিত।
সুবীরকান্ত তক্ষুনি আবার বলল, কলেজের মাস্টার তো, উচিত কাজ করে করে ওটার ওপর একেবারে অরুচি ধরে গেছে। যেতেই পারে–তুমি কী বলে?
মুখের দিকে চেয়ে রাখি এবারে বেশিই হেসে ফেলল। জবাব দিল, আমিও স্কুলের মাস্টার।
সুবীরকান্ত মহা উৎফুল্ল। ওইটুকু পাথরের মধ্যেই মুখোমুখি ঘুরে বসার চেষ্টা।–তার মানে তোমারও অরুচি ধরেছে? ওয়ারফুল!
রাখির ভালো লাগছে বটে, আবার ভাবগতিক দেখে ভয়ও করছে। রুচি বদলাবার আশায় আরো কী করে বসে ঠিক কী! কলেজের ছেলে বা স্কুলের মেয়ে এসে হাজির হতে পারে, আর সুলতাদি রমলাদি কেউ এ অবস্থায় দেখলে ওকে আস্ত রাখবে কিনা সন্দেহ।
সুবীরকান্ত হাসতে হাসতে বলল, আজ এই বরাত আমার কল্পনাও করিনি, ভেবেছিলাম তোমাকে সেদিন বিব্রত করার জন্যে দুটো পোশাকী কথা বলেই চলে যেতে হবে। পরের মুহূর্তে কী মনে পড়তে আঁতকে উঠল যেন।–কী সর্বনাশ!
কেউ এসেই গেছে ভেবে সচকিত হয়ে রাখি এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। কাউকে না দেখে বিমূঢ় দৃষ্টি গা-ঘেঁষা-লোকটার দিকে ফেরালো।
সুবীরকান্ত বলে উঠল, এটা তো শ্রাবণ মাস এসে গেল!
দুশ্চিন্তার কারণটা সঠিক বোধগম্য হল না। রাখি চেয়েই রইল।
–ভাদ্রয় বিয়ে নেই, আশ্বিনে বিয়ে নেই, কার্তিকে বিয়ে নেই! তোমাকে কাল পরশুর মধ্যেই ছুটি নিতে হচ্ছে, তারপর চলো দুজনে জলপাইগুড়ি পালিয়ে গিয়ে কাজটা সেরে আসি আমার অত দেরি সহ্য হবে না।
তার চোখে চোখ রেখে রাখি হাসতেই লাগল।
.
বিয়ে হয়ে গেল। সেটা এত সহজে হল যে রাখির ভাবতেই অবাক লাগে। এই বিস্ময়ের সঙ্গে একটা রোমাঞ্চকর বিহ্বলতার মধ্যে দুটো মাস কেটে গেল।
তারপর শ্রীমতী রাখি চক্রবর্তী ধীরেসুস্থে তার শ্রীচক্রবর্তাটিকে নতুন করে আবিষ্কার করতে লাগল। তার প্রথম চোখ গেল লোকটার পড়ার নেশার দিকে। বই পড়ে লোক এত আনন্দ কী করে পায়, রাখি ভেবে পায় না। ফি-মাসে পার্শেলে কলকাতা থেকে বই আসে। তার বই যে কলেজের পাঠ্যবই-এর অন্তর্গত তা নয়, আবার ওই সব পড়ার ব্যাপার নিয়ে আলোচনার উৎসাহও কম নয়। ফলে রাখির ধৈর্য ফুরোতে সময় লাগে না। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে শোনার ভান করেই কাছে এগোয়। লেকচার শুনতে শুনতে এক সময় চুপি চুপি বইটা সরিয়ে ফেলে। তারপর আলস্যভরে বুকের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে হাই তুলে বলে, তারপর?
ফলে তারপর যা সেটা কোনো আলোচনার বিষয় নয়।
আবার কোনো সময় বা লেকচার শুনতে শুনতে টান মেরেই হাতের বই ফেলে দিয়ে নিজের দুই ঠোঁট দিয়ে খানিকক্ষণ পর্যন্ত ওই মুখ বন্ধ করে রাখে। শেষে নিরীহ মুখে জিজ্ঞেস করে, তারপর?
রাখি লক্ষ্য করেছে, এই একটি মাত্র উপায় ভিন্ন লোকটাকে পড়াশুনার জগৎ থেকে অন্য দিকে টেনে আনা খুব সহজ নয়।
তার দ্বিতীয় আবিষ্কার, লোকটা স্নেহ আর দরদের কাঙাল। খুব অল্পবয়সে বাপ মা হারিয়েছে, আর আপনার বলতে তেমন কেউ নেই বলেই বোধহয়। ওর কাকা বা রাখির মা চিঠিতে আদর করে দুকথা লিখলেই ভারী খুশি। দুজনের সংসারে কমবাই-হ্যাণ্ড গোছের একটা লোক রাখা হয়েছে। প্রেসার-কুকারে রান্না সে-ই করে নটা না বাজতে রাখি স্কুলে ছোটে, আসতে তো বিকেল। এরই মধ্যে ছুটির দিনে ও যদি মানুষটার জন্যে বাড়তি একটু খাবার-দাবার করে, তাতেই আনন্দে আটখানা। মাঝে একদিন সর্দিজ্বর হয়েছিল। স্কুল থেকে ফিরে রাখি সেদিন আর বেরোয়নি, শিয়রের কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সেটা যে বিশেষ কিছু করা, রাখির মনেও হয়নি। কিন্তু একটু বাদেই অবাক সে। দুচোখ যেন ছলছল করছে।
রাখি ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল কষ্ট হচ্ছে খুব?
মুখের দিকে চেয়ে থেকেই আস্তে আস্তে মাথা নেড়েছে, কষ্ট হচ্ছে না। বলেছে, কত সময় অসুখে পড়ে থাকতাম, ওঠার শক্তি নেই, হামা দিয়ে গিয়ে এক গেলাস জল গড়িয়ে খেতে হয়েছে।…আর আজ?
রাখিরও বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল, মনে আছে নিজের গালটা তার কপালের ওপর ছিল।
তৃতীয় ব্যাপার লক্ষ্য করেছে, মানুষটার গোঁ-ভরা অভিমান। প্রত্যাশা বেশি বলেই অভিমান বেশি। রাখি আগে স্কুলে চলে যায়। কিন্তু একটা দিন তার জামা-কাপড় ঠিক-ঠাক করে না রেখে গেলে ময়লা জামা-কাপড় পরেই কলেজে চলে যাবে। ভুল করে নয়, ইচ্ছে করে। তারপর ফিরে এসে অভিমান–অর্থাৎ বাক্যালাপ কম, চুপ।
রাখি হয়ত বলল, তোমার কি নিজের চোখ নেই? আমার মনে ছিল না বলে এই জামা-কাপড়ে কলেজ করে এলে?
জবাব, এলাম–এরপর যাতে তোমার মনে থাকে সেই জন্যে!
আর একদিনও এই ভুল হয়েছিল। সেদিনও একই ব্যাপার। মিষ্টিকথায় দুই-এক কথায় নিজের ভুলের কথা বলার পরেও গম্ভীর দেখে রাখিরও রাগ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাগ করতে গিয়ে হেসে ফেলেই বলেছিল, আচ্ছা আমার কী আগে আরো দুপাঁচবার বিয়ে হয়েছে যে এত অভিজ্ঞতা–কোনো কিছুর ভুল হতে পারবে না?
