ভালো যে একটুও লাগত না সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা গেছে। আর জবাবটা আরও ভালো লেগেছে।-ইস! এখানেই যখন বিয়ে লেখা, যেভাবে হোক ঠিক তোমার সঙ্গেই জুটে যেতাম আমি।
স্ত্রীর আর একটা স্বভাব লক্ষ্য করে মুখ ফুটে কিছু না বললেও মনে মনে এক-আধ সময় উতলা হয়েছে সুবীরকান্ত। সর্বদাই রাখির দৃষ্টি যেমন উঁচু দিকে, খরচের হাতও সেই রকমই খোলা। বিলেতি ধাঁচের নামী স্কুল, মাইনে ভালই। দ্বীরকান্ত সে টাকা হাতেও নেয়নি কখনো, বলেছে তোমার কাছেই থাক। কিন্তু থাকছে যা এই কমাস সে ভালো করেই দেখছে। সব মাসের শেষেই তার চিন্তা দেখেছে-হাতের টাকা-টুকি ফুরিয়ে গেল, কী-যে করি!
জিনিস দেখলেই তার কিনতে ইচ্ছে করে। মনের মত ঘর সাজায়, সুবীরকান্তর জন্যেও এটা-সেটা কেনে। আর নিজের জামা-কাপড় কেনা তো সব মাসেই লেগে আছে। মাইনের অর্ধেক টাকা দিয়ে হয়ত একখানা শাড়ি কিনে বসল। পরে-পরে তক্ষুনি আবার তাকে দেখানো চাই।-কেমন হয়েছে?
চোখ তুষ্ট হলেও টাকার অংকটা ভিতরে ভিতরে খচখচ করতেই থাকে সুবীরকার। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। ফলে রসিকতা করতে হয়, গরিব মাস্টার–এই রাখিকে আমি রাখি কোথায়?
রাখি তাইতেই খুশি, কোনো প্যাঁচ-পোঁচের ধার ধারে না সে।
যাই হোক, আনন্দের মধ্যেই দিন কাটছিল সুবীরকান্তরও। মাসপাঁচেক বাদে তার মনের দরজায় আর এক বৈচিত্র্য এসে হানা দিল। শুকনো-মুখ-রাখি সেদিন ঘরে ঢুকেই বলল, হয়েছে কাজ, এবারে ঠিক গণ্ডগোল বেঁধেছে!
মুখ থেকে বই সরিয়ে সুবীরকান্ত জিজ্ঞাস করল, কিসের গণ্ডগোল?
-আবার কিসের, যা হয় তাই, আরো খুব আনন্দ করো–কতদিন বলেছি একটু সামলে-সুমলে চলো!
তবু বুঝতে সময় লেগেছে একটু। তারপর বোঝা গেছে যখন বই ফেলে আনন্দে একেবারে উঠে বসেছে।-সত্যি? তারপর মুখের দিকে চেয়ে হাসতে সুরু করেছে।
রাখি রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেলল।-তুমি তো মজা দেখবেই এখন, আমি ওদিকে চিন্তায় মরি!
-কিসের চিন্তা?
স্কুলে তো আর একবছর ধরে ছুটি দেবে না, কিছুদিন গেলেই মেয়েরা ঠিক টের পাবে। কী লজ্জার কথা হল বলো তো?
ছদ্ম গাম্ভীর্যে মাথা নেড়ে সায় দিল।–তহালে এক কাজ করো, স্কুলের চাকরি। ছেড়ে দাও।
-বলো কী, চাকরি ছেড়ে এখন থেকে আমি ঘরে বসে থাকব?
–তাহালে চোখ-কান বুজে স্কুল করতে থাকো।…তোমাদের স্কুলের টিচারদের বুঝি কারো ছেলেপুলে নেই!
-থাকবে না কেন, মেম-টিচারগুলোর তো এক-একজনের তিনটে-চারটে করে ছেলেপুলে, ওদের অত লজ্জাসরমের বালাই নেই!
সুবীরকান্ত আরো গম্ভার।–প্রথমবার বলেই তোমার লজ্জা, পরের বার থেকে আর তোমারও থাকবে না।
এবারে গাম্ভীর্যের আড়ালে কৌতুক লক্ষ্য করল রাখি। রাগতে গিয়ে আবার ও হেসে ফেলল।–ভালো হবে না বলছি, সখ দেখে আর বাঁচি না!
এই সমাচারের দিন-কয়েকের মধ্যে সুধারকান্তর এই বহু প্রত্যাশিত পদোন্নতির সংবাদ এলো। এই কলেজেই লেকচারার থেকে প্রফেসার হয়ে গেল সে। সেদিন। কলেজ থেকে ফিরেই আনন্দে আটখানা হয়ে রাখিকে খবরটা দিল সে। আর রাতে চুপি চুপি বলল, যে আসছে সে বিশেষ ভাগ্য নিয়েই আসছে, বুঝলে…নইলে উন্নতির আশা তো কবে থেকেই করছিলাম, এতদিনেই বা হল কেন?
শুনে রাখিও খুশি বটে, কিন্তু তার মনে তখন নানা চিন্তা।
এর পরের কতগুলো মাসে যথার্থই আনন্দের মধ্য কাটল সুবীরকান্তর। নিজের মনেই জীবনের একটা নতুন স্বাদ অনুভব করে সে। আলো-বাতাসও অন্যরকম মনে হয়। রাখিকেও কেমন নতুন মনে হয় তার। ওর সর্বশরীরে যেন নতুন ছদ, নতুন সুষমার ছোঁয়া লেগেছে। চেয়ে থাকে, চুরি করে দেখে। আবার ধরাও পড়ে। রাখি লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলে।–কী দেখছ?
সুবীরকান্ত হাসে শুধু।
সময় এগিয়ে আসতে স্কুল থেকে রাখি. তিন মাসের ছুটি পেল। ভিতরে ভিতরে তার নানারকম ভয়-ভাবনা। তাই ও প্রস্তাব করল, এ সময়টা মায়ের কাছে গিয়ে থাকলে কেমন হয়! আপত্তি করা উচিত নয়। কিন্তু এবারে সুবীরকান্তই দুর্ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল।–তিন মাসের জন্য? ও বাবা, আমি থাকব কী করে?
অসহায় মুখখানা দেখে তার হাসিই পেল।…মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। বটে, কিন্তু সেই সময় এই লোক কাছে থাকবে না ভেবে আবার ভয়-ভয়ও করছিল। অতএব এখানেই থাকা মনস্থ করল সে। তাছাড়া এখানে ভালো ডাক্তার আর সুব্যবস্থার আশ্বাসও বেশি। তার ওপর সুবীরকান্ত যখন বলল, মাকেই বরং মাসখানেকের জন্য এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবে–তখন অনেকখানি নিশ্চিন্ত।
.
মেয়ে হল।
আর তাতেই যেন সুবীরকান্ত বেশি খুশি। মাস-দেড়েক না যেতে কঁপা হাতে শাশুড়ীর হাত থেকে মেয়ে কোলে নিয়ে বসতে চেষ্টা করেছে। নড়তে-চড়তে ভয়, পাছে মেয়ের লাগে। বাপকে রাগাবার জন্যেই মেয়েটাকে কুচ্ছিত বলে রাখি। তার কারণ মেয়ের রং একটু চাপা হবে বলেই মনে হয়, কিন্তু মুখশ্রী সুন্দর। শাশুড়ীর সামনেই এই নিয়ে ঝগড়া। মেয়ের নাম নিয়েও। সুবীর প্রস্তাব করে রাখির মেয়ের নাম পাখি হোক। রাখি তক্ষুনি স-ঝঙ্কারে আপত্তি করে, হ্যাঁ বয়েসকালে শেষে উড়ে পালাক আর কী! এ সুবীর হাসে।–বয়েসকালে তো উড়ে পালাবেই। শাশুড়ীর অনুপস্থিতিতে সেদিন বলেছিল, উড়ে পালাবার সময় হলে ওকে পরামর্শ দেব দার্জিলিংয়ে জলাপাহাড়ে উঠে বসে থাকতে।
