সেই বিকেলেই রাখি চুপচাপ একা না বেরিয়ে পারল না। রাস্তায় নেমেই বুকের ভেতরটা কেমন ঢিপঢিপ করতে লাগল।
জলাপাহাড়েই উঠল।
কেউ কোথাও নেই।…নিজে থেকে এসে আন্দাজে কোথায় খুঁজবে? একবার ভাবল ম্যালের দিকটা ঘুরে এদিকে এলে পারত। আবার ভাবছে সেটা যেন বেশি বেশি হবে। পরিচিত জায়গাটা ছেড়ে আরো খানিকটা পিছনদিকে পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে বসল। এরও মনস্তত্ত্বগত কারণ আছে। রমলাদি সুলতাদি এসে পড়লে দূর থেকে দেখে ভাববে কেউ নেই। কিন্তু যে কারণে এই সাবধানতা, তারই দেখা মিলবে কিনা কে জানে!
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দেখা মিলল। কাছে এসে দাঁড়াল। আগের দিনের মতো সামনে বসে পড়ল না। বলল, সেদিন ও-কথা বলে আপনাকে এতটা বিব্রত বা বিরক্ত করা হবে বুঝতে পারিনি। কটা দিন আপনার বেরুনোই বন্ধ হয়ে গেল! যাক, আপনার দিক থেকে কোনো সঙ্কোচের কারণ নেই, ও ব্যাপারে স্বাধীন মতামত তো সকলেরই থাকা স্বাভাবিক। কিছু মনে করবেন না, দ্বিতীয়বার আর বিরক্ত করব না।
রাখি ফাঁপরে পড়ল। ও যে বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে–এই রকমই ভাবা স্বাভাবিক। …এবারে চলেই যাবে বোধহয়। অতএব তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, আপনি জলপাইগুড়ি যান নি?
সুবীরকান্ত হাসল একটু। প্রশ্নটা যেন আশাপ্রদ ঠেকল কানে। বলল, যে জন্যে যাবার চিন্তাটা মাথায় এসেছিল তার আলোচনা তো এখানেই হয়ে গেল। এরপর কিছু না জেনে সেখানে একলা ছুটে লাভ কী?
রাখি নীরব আবার। কী ভাবে যে প্রাসঙ্গিক আলাপটা শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না।
–আপনি কী ভেবেছিলেন আমি জলপাইগুড়ি চলে গেছি?
এবারে রাখি একটু বুদ্ধিমতীর মতো কাজ করল। হাঁ-না কিছুই জবাব না দিয়ে। অল্প একটু হেসে বলল, বসুন।
কদিনের মধ্যে দেখা না মেলার একটাই অর্থ ধরে নিয়েছিল সুবীরকান্ত। তাকে এড়াবার চেষ্টা। কিন্তু এই সামান্য অভ্যর্থনার ফলেই সংশয় দেখা দিল। সামনের পাথরে বসে ঈষৎ আগ্রহ নিয়েই তাকালো তার দিকে।
অন্য দিকে চোখ রেখে মৃদু গলায় রাখি বলল, আজ সকালে আমিও মায়ের চিঠি পেয়েছি।
আরো কিছু শোনার আশায় সুবীরকান্ত অপেক্ষা করল একটু। তারপর জিজ্ঞাসা। করল, আমি কী ধরে নেব, আমার সেদিনের প্রস্তাবটা বাতিল হয়ে যায় নি?
চোখ তুলে রাখি একবার তার দিকে না তাকিয়ে পারল না। আর তার পরেই সঙ্কোচ কেমন কমে আসতে লাগল। আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করল, আমাদের বাড়ির সব খবর আপনার জানা আছে?
সুবীরকান্ত অবাক একটু।–কী খবর?
আরো মৃদু সুরে রাখি জবাব দিল, আমাদের বাড়ির অবস্থা-টবস্থা…
বলার পর নিজেরই বিচ্ছিরি লাগল রাখির। অনুরাগ-পর্বের যেটুকু জানা আছে। তাতে কোনো মেয়ে নিজে মুখ ফুটে এ-কথা বলেছে বলে শোনেনি। ওদিকে বক্তব্যটা বোধগম্য হতে সুবীরকান্ত তার দিকে চেয়ে হাসছে মিটি মিটি। বলল, কাকা কিছু কিছু বলেছেন, কিন্তু ও নিয়ে আমি মাথা ঘামানো দরকার মনে করিনি।…আমি গরিবের ছেলে, রাজত্ব বা রাজকন্যার আশা রাখি না, শুধু মনের মতো একটি কন্যা পেলেই খুশি।
কথাগুলো কান পেতে শোনার মতো। রাখির সমস্ত মুখে লালের আভা ছড়াচ্ছে। হাসছে অল্প অল্প। হাওয়া অনুকূল সেটা সুবীরকান্ত বুঝে নিয়েছে। তাই আরো কিছু বলার লোভ সংবরণ করতে পারল না। সামনের দিকে আর-একটু ঝুঁকল। হাসছে।–বললে বিশ্বাস হবে কিনা জানি না, বছর আটেক আগে একবার কাকার কাছে এসে তিস্তার চরে কতগুলো মেয়েকে হুটোপুটি করতে দেখতাম। তার মধ্যে একটি মেয়েকেই ভারী জীবন্ত মনে হত আমার। তারপর আরো অনেকবার এসেছি, অনেকবার দেখেছি, কিন্তু দার্জিলিংয়ে এসে কাকা যে সেই মেয়েকেই দেখতে বলে দিয়েছিলেন এতবার করে, কী করে জানব!
লজ্জা সত্ত্বেও রাখি আবার তার চোখ না তুলে পারল না। এই মুহূর্তে যেন একটা অদ্ভুত ভালো লাগার স্বাদ তার অস্তিত্ব ভরাট করে তুলছে।
সুবীরকান্ত সরাসরি কাজের কথায় চলে এলো এবার।–এখন তাহলে আমি আমার কাকাকে চিঠি লিখতে পারি?…হাঁ কী না বলো?
মুখে বলা গেল না। রাখি হাসিমুখে মাথা নেড়ে সায় দিল। পুরুষগুলো এত চট করে আপনি থেকে তুমিতে চলে আসে কী করে ভেবে পায় না!
ভাবতে না পারার আরও একটু বাকি ছিল। মাথার ওপর একটা চলতি মেঘ যে আরো একটু আচমকা কৌতুক বর্ষণের জন্যে এগিয়ে এসেছিল দুজনের কেউ লক্ষ্য করেনি। হঠাৎ একপশলা বৃষ্টিতে সচকিত দুজনেই। রাস্তায় বেরুলে এখানে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতোই ছাতা একটা থাকে সঙ্গে। সুবীরকান্তর সঙ্গে ছাতা আছে, কিন্তু বেরুবার তাড়ায় রাখি ছাতা আনতে ভুলে গেছে। চট করে নিজের ছাতাটা খুলে এগিয়ে এলো, তারপর রাখির গা ঘেঁষে ওই পাথরটাতেই বসে পড়ল।
দুজনে অনায়াসে বসার মত বড় নয় পাথরটা। রাখি আড়ষ্ট একটু। গায়ে গা ঠেকছে, কাঁধে কাধ লাগছে। তাছাড়া অন্তরঙ্গ না হলে পাঁচমিনিটের বৃষ্টির ঝাঁপটায় সর্বাঙ্গ ভিজবে। কিন্তু পাশের লোকের তাকে ভিজতে দেবার ইচ্ছে নেই। বৃষ্টির ধারা আরো জোরে নামতে একেবারে গায়ের সঙ্গে লেগেই বসল। ওদিকে আচমকা বৃষ্টির প্রথম ঝাঁপটাতেই রাখির মুখ আর মাথার খানিকটা ভিজে গেছে।
সুবীরকান্ত হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করল, আজ ছাতা আনোনি যে?
–ভুলে গেছি।
সুবীরকান্ত বলল, ভুলের জন্যে কৃতজ্ঞ।
রাখিও হেসেই ফেলল।
পাঁচমিনিটের বৃষ্টি। মেঘটা চলে যেতেই ঝলমলে আলো। যেন রসিকতা করার জন্যই আসা। ছাতা বন্ধ করে সুবীরকান্ত পকেট থেকে রুমাল বার করে হাতমুখ মুছতে গিয়ে দেখে রাখি তার ব্যাগ খুলে রুমাল খুঁজছে। ব্যাগে রুমাল নেই, অর্থাৎ তাও ভুলেছে।
