-আপনার আর আপনার মায়ের ব্যাপার নিয়ে লেখা। পড়ুন।
–রাখি খামটা নিল। খুলল। কিন্তু পড়তে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে দেহের রক্তকণাগুলো বুঝি মুখের দিকে ছোটাছুটি আরম্ভ করে দিল। একটু অনুযোগের সুরেই ভাইপোকে কাকা লিখেছেন, এর আগে দুদুটো চিঠি লিখেও আসল প্রসঙ্গের জবাব পাননি। দার্জিলিংয়ে আসার সময় সে কথা দিয়ে গেছল রাখি গাঙ্গুলির সঙ্গে দেখা করে এবং আলাপ করে তার মতামত জানাবে। এদিকে ভদ্রমহিলা (রাখির মা) আশায় দিন গুনছেন আর প্রায় রোজই খোঁজ নিচ্ছেন ভাইপোর মতামত কিছু জানা গেল কিনা। ভরসা পেলেই মেয়েকে তিনি চিঠি লিখতেন। কোনো খবর না পেয়ে মহিলা ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছেন। কাকা লিখেছেন, পছন্দ যদি না-ই হয়ে থাকে তো এভাবে ঝুলিয়ে না রেখে সেটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে অসুবিধে কি? শেষের মন্তব্য, তাঁর মতে মেয়েটি ভালো এবং অপছন্দের নয়, ভাইপো এখানে বিয়ে করলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুশিই হতেন।
চিঠি শেষ করতে গিয়ে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে বসেও রাখি ঘেমে ওঠার দাখিল। চিঠি খামের মধ্যে পুরে রাখতে গিয়েও হাত কাঁপছে যেন। ও যতক্ষণ চিঠি পড়ছিল, সুবীরকান্ত ওর মুখের ওপর থেকে চোখ ফেরাতে পারেনি। বিড়ম্বিত রমণী-মুখের এমন মিষ্টি কারুকার্য আর বুঝি দেখেনি! হাত বাড়িয়ে খামটা নিল।
রাখি আর এদিকে ফিরে তাকাতেও পারছে না।
একটু অপেক্ষা করে সুবীরকান্ত বলল, এখন আমার মত আমি জানাতে পারি, কিন্তু একতরফা মতের উপর তো কিছু নির্ভর করছে না, কী জবাব দেব বলুন?
নিজেকে রাখি বচনপটু বলে জানত। কিন্তু এখন আর গলা দিয়ে শব্দ বেরুতে চায় না। এমন আচমকা বিড়ম্বনার মধ্যে জীবনে পড়েনি। সামনের দিকে চোখ রেখেই বলল, এ সম্পর্কে আমি কিছু ভাবিনি।
–ঠিক কথা।…আপনার মা আপনাকেও লিখলে পারতেন, তাহলে এ-রকম বিব্রত বোধ করতেন না। তার বোধহয় ধারণা, আমার মত পেলেই আটকাবে না। সে যাক, আপনার ভাবার সুবিধের জন্যে নিজের সম্পর্কে দুই-একটা কথা বলে রাখি। জলপাইগুড়ির ওই এক কাকা ছাড়া আমার তিনকুলে আর কেউ নেই। ম্যাট্রিক থেকে এম.এ. পর্যন্ত স্কলারশিপের টাকায় পড়েছি। বি.এ. আর এম. এ. দুটোতেই ফার্স্টক্লাস পেয়েছি। একেবারে প্রোফেসারি পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পিছনে সুপারিশের জোর না থাকায় লেকচারারের পোস্ট অ্যাকসেপ্ট করতে হয়েছে, আর এক-আধ বছরের মধ্যে প্রোফেসার হব আশা করাটা খুব বেশি হবে না বোধহয়।
এতগুলো কথা শোনার ফাঁকে রাখি কখন এদিকে মুখ ফিরিয়েছিল জানে না। কথা শেষ হতে খেয়াল হল দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে আছে। তাড়াতাড়ি মুখ ফেরাল আবার।
সুবীরকান্ত উঠে দাঁড়াল।–আচ্ছা আর বিরক্ত করব না, ভেবে আমাকে জানাবেন।
চলে যাচ্ছে। রাখি সেদিকে চেয়ে আছে। যতক্ষণ দেখা গেল চেয়েই রইল। তারপর খেয়াল হল, রমলাদি সুলতাদি এক্ষুনি ফিরে এসে তাকে নিয়ে পড়বে।
উঠে হনহন করে সেও বোর্ডিংয়ের উদ্দেশে নেমে চলল। গিয়ে কোন রকমে ঘরের দরজা বন্ধ করতে পারলে হয়। ভিতরটা কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তার। আবার সেই সঙ্গে মনে হচ্ছে, পাহাড়ী শহরটার রঙ যেন এক মুহূর্তে বদলে গেছে।…প্রথম দিন এসে আলাপ করা থেকে এ-পর্যন্ত লোকটার কোনো আচরণই এখন আর বিসদৃশ লাগছে না।
.
কটা দিনের মধ্যে রাখি আর বোর্ডিং ছেড়ে বেরুতেই পারল না। কী একটা সঙ্কোচ যেন পায়ে জড়িয়ে আছে তার।
নিজের বিয়ের সম্পর্কে ওর নিজেরই কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। বিয়ের কল্পনা করেনি এমন নয়–করেছে যখন বেশ ঘটা করেই করেছে। কল্পনায় ঘটা করতে দোষ। কী? সেই সম্ভাব্য জীবনের মানুষকে একসময় সর্ব-যোগ্যতার চূড়ায় তুলেও বসিয়েছে। তার সঙ্গে আর যাই হোক, কলেজের মাস্টার সুবীরকান্ত চক্রবর্তীর মিল। নেই। কিন্তু নিজের এই সংগোপন কল্পনাটাকে রাখি গাঙ্গুলি বাস্তবের মর্যাদা কখনো দেয়নি। বরং আচমকা যে মানুষটা এগিয়ে এসেছে তাকেই এখন অন্যরকম লাগছে।…চেহারা সাদামাটা হলেও চোখদুটো ভারী উজ্জ্বল। কথাবার্তাগুলোও স্পষ্ট আর স্বচ্ছ। ম্যাট্রিক থেকে এম.এ. পর্যন্ত স্কলার, এও খুব কম কথা নয়। তার ওপর স্কুল-মাস্টার তো নয়, প্রোফেসার। প্রোফেসার আর লেকচারারে এখনো খুব তফাত দেখে না সে।
….সেদিনের নিজের ব্যবহারে রাখি নিজেই লজ্জা পাচ্ছে। কী করে জানাবে ভিতরে ভিতরে এই ব্যাপার চলেছে। রমলাদি আর সুলতাদির ঠাট্টাতামাসা–কলেজ-মাস্টারের হ্যাংলামি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেনি। চারদিনের ছুটি শুয়ে বসে কেটে যাচ্ছে, একসঙ্গে জলপাইগুড়ি গেলেও মন্দ হত না। অন্তত ওরকম ঠাসঠাস জবাব না দিলেও
আবার বিয়েটা এখানে যে হয়েই যাবে, চিন্তার এই নিশ্চিত প্রশ্রয়েও গা ভাসাতে পারছে না।…বিয়ের বাজারে এই সব ছেলের দামও কম নয়। কতটা আশা করে বসে আছে, ঠিক কি? যদিও খুব বেশি আশা করছে বলে তার মনে হয় না। তবু তাকে এখানে এই বড়লোকী চালে থাকতে দেখে কী ভেবে বসে আছে ঠিক কী? তাদের বাড়ি-ঘরের ভেতরের অবস্থা ঠিকঠিক জানে কী না তাই বা কে জানে!..মায়ের তো ওই পাঁচ হাজার টাকা সম্বল!
চিন্তা যে ভাবেই করুক, বাইরে বেরুবার জন্যে ভেতরটা কদিন ধরে ছটফট করছিলই। সেদিন সকালে মায়ের একটা চিঠি পেল। অন্যান্য পাঁচকথার পর মা লিখেছে, ওমুকের ভাইপো সুবীরকান্ত নামে একটি ছেলের সঙ্গে তার ইতিমধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা জানাতে। ছেলেটি এখানকার কলেজের প্রোফেসার। তাকে দেখে আর তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে খুবই ভালো লেগেছিল। আশা ছিল, নির্বন্ধ থাকলে এখানেই রাখির বিয়েটা দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারবে। তার কাকাও আশা দিয়েছিল। এতদিনেও কোনো খবর না পেয়ে মনে হচ্ছে–হবে না। ছেলেটির হয়ত আরও বড় ঘরে বিয়ে করার ইচ্ছে। তবু এ-রকম কোনো ছেলের সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে কিনা মেয়েকে জানাতে লিখেছেন।
