রাখি প্রতিবাদ করল, ঘেঁষাঘেঁষি, মানে! ভদ্রলোক তো ওই পাথরে বসেছিল।
সুলতাদি ইন্ধন যোগালো, পাহাড় কিনা, নীচে থেকে ঘেঁষাঘেঁষি মনে হয়।
–হোক। পাহাড়টা কী আমার, ভদ্রলোক এসে বসলে কী করব?
রমলাদি তক্ষুনি জবাব দিল, দুটো কাজ করতে পারতিস। আসামাত্র বলে উঠতে পারতিস, এসো নাথ, আমি উমা, শিবের তপস্যায় এই শৈলশিখরে বসে মাথা খুঁড়ছি! নয়তো এসে বসামাত্র পাথর তুলে তাড়া করতে পারতিস! কিছুই যখন করলি না, বুঝতে হবে তোর মনে অনিশ্চয়তার পাপ ঢুকেছে।
নিরুপায় রাখি আবারও হেসেই ফেলল।
এখানেই যে প্রজাপতির নির্বন্ধ সেটা রাখি দিনকতকের মধ্যেই জেনেছে। আর সেটা এমন আচমকা জানা যে সে হকচকিয়ে গেছল।
তার আগে কটা দিন সুবীরকান্তর সঙ্গে প্রায় রোজই দেখা হয়েছে। কোনদিন রমলাদি-সুলতাদির সামনে, কোনোদিন বা একা। এই দেখা হয়ে যাওয়াটা যে লোকটার সক্রিয় চেষ্টার ফল সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয়নি। রমলাদি-সুলতাদির ঠাট্টা-তামাসায় নাজেহাল হয়ে লোকটার প্রতি রাখি বলতে গেলে একটু বিরক্তই তখন।…কলেজের মাস্টার, এমনিতে হাবভাব গম্ভীর, কিন্তু তার মধ্যেই তার প্রতি উৎসুক-উৎসুক ভাবটা রাখি টের পায়। রমলাদি সুলতাদি আরো বেশি টের পায়। তাকে একলা দেখলে যেন আরো বেশি খুশি হয়। গায়ে পড়ে নিজের কাকার কথা বলে, ওর কাকার কথা, বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করে, স্কুলে কী পড়ায়, উঁচু ক্লাসে পড়ায় কিনা খোঁজ নেয়–আর কিছু কথা না পেলে রমলাদি-সুলতাদির প্রশংসা করে।
রাখিও মনে মনে বলে–সুবীরকান্ত না হ্যাংলাকান্ত!
কিন্তু আচমকা সেদিন এক অভাবিত মানসিক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে গেল রাখি গাঙ্গুলি।…রমলাদি আর সুলতাদির সঙ্গেই জলাপাহাড়ের দিকে যাচ্ছিল, কিছুদূরে ওই মূর্তি। গম্ভীর মুখে যেন তারই প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। রমলাদি গলা দিয়ে একটা চাপা শব্দ বার করে রাখিকে বলল, একটু ভাওতাবাজী করব?
–যা খুশি করগে। ভ্রুকুটি করে রাখি জবাব দিল।
–আচ্ছা তুই বোসগে যা। বলেই সুলতাদির হাত ধরে টেনে রমলাদি ভাঁওতাবাজী করতে চলল। রাখি একাই তাদের বসার জায়গায় উঠে গেল।
কিন্তু মিনিট সাতেক না যেতেই অবাক সে। তক্ষুনি বুঝে নিল রমলাদি ভাওতাবাজীটা আসলে কার সঙ্গে করেছে। তার দিকেই একলা উঠে আসছে সুবীরকান্ত, ওরা দুজন নিপাত্তা।
কাছে এসে সামনের পাথরটায় বসে পড়ল। তাড়াতাড়ি ওঠার দরুণ অল্প অল্প হাঁপাচ্ছে। বলল, এ-রকম শরীর খারাপ নিয়েও পাহাড়ে ওঠা-নামা করেন কী করে, আশ্চর্য! তার ওপর আজ সমস্ত দিন কিছু খাননি শুনলাম!
রাখির রাগই হচ্ছে, সেই সঙ্গে বিব্রতও কম নয়। জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ওঁরা কোথায়?
–ওঁরা বাজারের দিকে গেলেন। বললেন, শরীর খারাপ তাই আপনার জন্যে ফল কিনতে যাচ্ছেন, আর আমাকে বললেন, গল্প করার ইচ্ছে থাকলে ওপরে চলে। যান। হাসল। রমলা দেবী আবার ঠাট্টা করলেন, আমার বরাতেও কিছু ফল-টল জুটতে পারে।…আমি বেশ পেটুক আছি জানেন, এবারে আসার আগে আপনার মা আমাকে একদিন খুব যত্ন করে খাইয়েছিলেন…কী চমৎকার রান্না তার!
কী থেকে কী কথা! রাখি অবাক, আমার মা?
-হ্যাঁ, কাকা নিয়ে গেছলেন। খুব ভালো লেগেছিল তাকে।
রাখি ভেবেই পেল না তার মা হঠাৎ এই লোককে আদর-যত্ন করে খাওয়াতে গেল কেন? সুবীরকান্ত অন্তরঙ্গ সুরে জিজ্ঞাসা করল, যাক, আপনার কী হয়েছে বলুন তো?
-কিছু না।
সমস্ত দিন কিছু খান নি শুনলাম যে?
–খেয়েছি। ঈষৎ বসুরে জবাব দিল, তাছাড়া দার্জিলিংয়ের বাতাস খেলেও কিছু কাজ দেয়।
-বলেন কি! আমার তো উল্টে ঘণ্টায় ঘণ্টায় খিদে পায়! হাসছে।…ওঁরা তাহলে ঠাট্টা করেছেন, আমি কিন্তু আজ সত্যি আপনাকে খুঁজছিলাম–দেখা না হলে হয়ত আপনার বোর্ডিংয়েই চলে যেতাম।
রমলাদি আর সুলতাদির জন্যেই মেজাজ প্রসন্ন নয় রাখির। অন্তরঙ্গ উক্তিটা তাই স্পর্ধার মতো ঠেকল কানে। জিজ্ঞাসু দুচোখ তার মুখের ওপর থমকালো।
সুবীরকান্ত বলল, সামনে চার দিন ছুটি আছে, আপনাদেরও ছুটি নিশ্চয়, ভাবছি একবার জলপাইগুড়ি ঘুরে এলে হয়।…যাবেন?
–না।
এ-রকম সাদাসাপ্টা জবাব আশা করেনি সুবীরকান্ত। মুখের দিকে একটু চেয়ে থেকে আবার বলল, ছুটির মধ্যে এখানে বসে থেকে কী করবেন, চলুন না একসঙ্গে ঘুরে আসি।
রাখির রাগ চড়ছে। মাসের শেষে হাত খালি, ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হত না। কিন্তু অসহিষ্ণুতার আসল কারণ, লোকটার হ্যাংলামি দেখে। মাত্র কটা দিনের আলাপে এ-রকম অনুরোধ করার মতো অন্তরঙ্গতা কিছু হয়নি। কিন্তু কলেজের মাস্টারের সঙ্গে কত আর অভদ্র ব্যবহার করতে পারে। আবারও সংযত জবাবই দিল, না, আমার যাওয়া সম্ভব নয়।
একটু চুপ করে থেকে লোকটা দ্বিধান্বিত মুখে হাসল একটু। তারপর বলল, আপনি বোধহয় বিরক্ত হচ্ছেন, কিন্তু এদিকে আমি একটু মুশকিলে পড়ে গেছি…যাবেন না যখন, বোঝাপড়াটা এখানেই সেরে নিই…আপনার সত্যই শরীর খারাপ নয় তো?
এবারে রাখি অবাক। গোড়া থেকেই আজ কথাবার্তার সুর অন্যরকম ঠেকছিল কানে। জবাব না দিয়ে মুখের দিকে তাকালো শুধু।
সুবীরকান্ত পকেট থেকে খাম বার করল একটা। তারপর সেটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, দার্জিলিংয়ে আসার পর আমার কাকার এই তিন নম্বর চিঠি। পড়ুন
বিস্ময়ের ওপর বিড়ম্বনা।–আমি কেন!
