–এখানকার গভর্নমেন্ট কলেজে?
–হ্যাঁ, তাছাড়া আর বদলি হয়ে আসব কী করে? …এসে এই দুমাসের মধ্যেই। হাঁপ ধরে গেছে, এখন থেকেই কবে পালাতে পারব ভাবছি।
কলেজের মাস্টার শোনার পর আগের মতো আর অবজ্ঞার চোখে দেখা গেল না লোকটাকে। রাখি জিজ্ঞাসা করল, কেন?
-প্রথম কারণ, এখানকার অভদ্র রকমের শীত। একেবার জ্বালিয়ে মারলে। দ্বিতীয় কারণ, রাস্তাঘাট। হয় নাক উঁচিয়ে উঠতে হবে, নয়তো চোখ পায়ে ঠেকিয়ে নামতে হবে–আর তৃতীয় কারণটাই আসল, এখানে এ মাইনেয় পোযায় না, এখানে চাকরি করতে হলে মাইনে ডবল হওয়া উচিত।
জবাবটা বেশ স্বচ্ছ ঠেকল কানে। অথচ এই বয়সের লোকের শীতে কাবু হওয়া বা উঁচু-নীচু পথের দরুণ বিতৃষ্ণ হওয়া তেমন বীরোচিত সমস্যা বলে ঘোষণা করা উচিত নয়। আর শেষের উক্তির সঙ্গে রাখিও একমত। কিন্তু এই সামান্য আলাপের মধ্যে খরচায় না পোষানোর কথাটা রাখি গাঙ্গুলি অন্তত বলে ফেলতে পারত না। কিন্তু একজন কলেজের মাস্টার আর একজন স্কুল মাস্টারকে এ-কথা বলছে বলেই হয়ত ঝরঝরে স্পষ্টোক্তির মতো লাগল কথাগুলো।
পিছনে রমলাদির গলা শুনে রাখি সচকিত হয়ে ঘাড় ফেরাল। সুলতাদি আর রমলাদি দুজনেই এদিকে আসছে। রমলাদি বোধহয় পাথরে হোঁচট-টোচট খেয়েছে, তার গলা দিয়ে অস্ফুট একটা কাতর শব্দই বেরিয়ে এসেছে। সুবীরকান্তও ফিরে তাকিয়েছে। সুলতাদি হাসি চাপতে চেষ্টা করছে।
কাছে এসে দুজনেই গম্ভীর। রমলাদি আরো বেশি। সুবীরকান্ত তাদের উদ্দেশ্যে দুহাত কপালে তুলল। জবাবে তারা একবার মাথা নেড়ে সপ্রশ্ন গম্ভীর দৃষ্টিতে রাখির। দিকে তাকালো।
রাখি তাড়াতাড়ি পরিচয় করিয়ে দিল, ইনি এখানকার গভর্নমেন্ট কলেজের প্রোফেসার, সুবীরকান্ত চক্রবর্তী, দার্জিলিংএ নতুন এসেছেন–
সুবীরকান্ত সবিনয়ে বলল, প্রোফেসার হবার আশা শিগগীরই আছে বটে, তবে এখনো লেকচারার।
রমলাদি গম্ভীরমুখে সুলতাদিকে বলল, বোসো সুলতা। নিজেও একটা ছোট পাথরে বসে সদ্যপরিচিতের দিকে তাকালো।–আমরা স্কুলমাস্টার, তাই কলেজের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাকটরকেও প্রোফেসার বলে সম্মান দেখাই, আপনি হবু প্রোফেসার যখন, আমাদের চোখে প্রায় ভাইস প্রিন্সিপাল।
মাত্রা-ছাড়ানো রসিকতার কথা শুনে সুবীরকান্ত হাসতে চেষ্টা করল একটু। সুলতাদি ফস করে জিজ্ঞাসা করে বসল, রাখির সঙ্গে আগে আলাপ ছিল না, এখানে নতুন এসে আলাপ হল?
এদের এই বেশি-বেশি কথা বিচ্ছিরি লাগছিল রাখির। সুবীরকান্ত জবাব দিল, আলাপ আজই…তবে জলপাইগুড়িতে আগেও দেখেছি ওঁকে, আমার কাকা আর ওঁর কাকা বিশেষ বন্ধু।
–ও। রমলাদি গম্ভীরমুখেই মাথা নাড়ল।–সেই জন্যেই, নইলে কলেজের মাস্টাররা স্কুলের মাস্টারদের দিকে ফিরেও তাকায় না।
সুবীরকান্ত জবাব দিল, তা কেন, অবস্থা তো দুজনেরই সমান।
সুলতাদি যেন প্রস্তুত হয়েই ছিল, ফোড়ন কাটল, দার্জিলিংয়ের উঁচু জায়গায় এসে আপনার দৃষ্টির আধোগতি হয়েছে দেখছি-কলেজে কী পড়ান, ফিলসফি নিশ্চয়ই?
-আজ্ঞে না, ইতিহাস।
ছদ্ম-বিস্ময়ে সুলতাদি তার সহচরীর দিকে ফিরল।-তুমিও তো ইতিহাস পড়াও রমলাদি, এ-রকম সাম্যবাদের কথা আছে নাকি কোথাও?
ঠোঁট উল্টে রমলাদি জবাব দিল, ঢের। সুলতান মামুদ নাদির, তৈমুর লং মন্দির দেখলেই ধ্বংস করেছে, ছোট বড় তফাত করেনি, আর খুন করার সময়ও মেয়ে-পুরুষে তফাত রাখেনি। তারপর ইংরেজ… হিন্দু মুসলমান ফরাসী শিখ–কাউকে ছোট করে দেখেনি, সক্কলের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।
দুই মহিলার দ্বারা এ-ভাবে আক্রান্ত হয়ে আঁর শেষে সাম্যবাদের এই বেপেরোয়া বিশ্লেষণ শুনে সুবীরকান্ত গোবেচারার মতো হাসতে লাগল। রাখি ভাবছে, লোকটা বুদ্ধিমান হলে এবার তার উঠে পালানো উচিত।
সুলতাদি বলল, রমলাদি একটু বেশি কথা বলেন, আপনি কিছু মনে করবেন না যেন।
হাসিমুখে মাথা নেড়ে সুবীরকান্ত এবারে উঠেই দাঁড়াল।–না, এখানে এসে পর্যন্ত একঘেয়ে লাগছিল, আলাপ হয়ে আজ সময়টা বরং ভালই কাটল। আচ্ছা, আবার দেখা হবে নিশ্চয়
সুলতাদি সায় দিল, নিশ্চয়, আমরা তো প্রায়ই আসি এখানে।
সকলের উদ্দেশে নমস্কার জানিয়ে সুবীরকান্ত প্রস্থান করল। সেদিকে খানিক চেয়ে থেকে রমলাদি ডাকল, রাখি–
এবারে তাকে নিয়ে পড়বে ওরা, রাখি ভালই জানে। সদ্যপরিচিত একটা লোকের সামনে এই গোছের বাঁচালতা তার ভালো লাগছিল না। ডাক শুনে তাকালো শুধু।
-একটা গান কর তো!
রাখি কোনদিন গান করেও নি, গান জানেও না। কিন্তু এই ফর্মাসের তাৎপর্য বুঝেছে। এই দুজনের মধ্যে রমলাদির মুখখানাকেই সকলে বেশি সমঝে চলে। বয়েস ছত্তিরিশ, দেখতে ভালো নয়, বিয়ে-থা হবার আশা নিজেও আর রাখে না। কিন্তু এতটুকু রসের হদিস পেলে আর রক্ষা নেই।
–তোমার প্রাণে বাতাস লেগে থাকে তো তুমি করো!
টেনে টেনে রমলাদি বলল, লেগেছে, ছত্তিরিশের প্রাণে বাহাতুরে বাতাস, গান। কর না একটা, আজ বোধহয় চেষ্টা করলে পারবি!
রাখি হেসে ফেলল।
অমনি সোজা হয়ে বসে চোখ পাকালো রমলাদি।–আবার হাসি! বলি, এক কাকার ভাইপোর সঙ্গে আর-এক কাকার ভাইঝির কিছু একটা হয়ে-টয়ে যাবার সম্ভবনা আছে?
রাখি প্রায় রাগ করেই বলল, তুমি একটি অসভ্য!
–ও! আর নিজেরা যে নিরিবিলিতে ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে বসেছিলি? স্কুলের কোনো মেয়ে দেখে ফেললে?
