সিঁড়িতে পায়ের শব্দ।…ওদিকের দরজা দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। কিন্তু রাখির নড়ার শক্তি নেই। মেয়ের গলা কানে আসছে। মায়ের ফেরার খবর দিচ্ছে বাবাকে।
খানিক বাদে সুবীরকান্ত এ-ঘরে এলো। শরীর এখনো ভালো করে সারেনি বোধহয়। শুকনো মুখ। নির্লিপ্ত মুখে সামনের বিবর্ণ মূর্তির দিকে চেয়ে রইল একটু। তারপর ঠাণ্ডা গলায় বলল, ভাবনার কিছু নেই, তোমার অনেক ক্ষমতা, দুদিনেই ঠিক হয়ে যাবে। কাল যাচ্ছি আমরা, তুমি আজই আসবে ধরে নিয়েছিলাম, না এলে প্রতুলের কাছে চাবিটাবিগুলো রেখে যেতে হত…যাক, এই তোমার চাবি-পত্র–আর সব যেমন ছিল তেমনি আছে।
প্রাণপণ শক্তিতে নিজেকে সংবরণ করতে চেষ্টা করছে রাখি। অস্ফুট স্বর নির্গত হল গলা দিয়ে–যাচ্ছ কেন?
স্থির নেত্রে সুবীরকান্ত চেয়ে রইল একটু। জবাব দিল, যাচ্ছি, তোমার জীবনে এই নীচ ছোট হীন লোকের আর দরকার নেই বলে।
দরকার আছে।
দুচোখ ধারালো-হয়ে উঠছে সুবীরকান্তর।–আছে? বড় দুর্ভাগ্য আমার। তাহলেও যাচ্ছি, আমার জীবনেও তোমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে বলে।
অসহিষ্ণু হাতে পর্দা ঠেলে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
পর্দাটা দুলে দুলে স্থির হল আবার।
রাতটা কীভাবে কাটল রাখি জানে না। ঘুমোয়নি, আবার জেগেও ছিল না। মাথার মধ্যে কী সব অজস্র হিজিবিজি ব্যাপার চলেছিল। সকাল হতে আর কিছু মনে নেই।
এক রাতের মধ্যে শরীরটা যেন পঙ্গু হয়ে গেছে। সমস্ত অস্তিত্বটাই যেন অনড় হয়ে গেছে। নড়তে-চড়তে কষ্ট। সকাল থেকে বসে আছে নিষ্প্রাণ মূর্তির মতো।
সাড়ে নটা বাজতে ধড়মড় করে উঠল।
অফিসে যাবে।
না খেয়েই বেরিয়ে গেল। অফিসে এলো। নিজের ঘরে বসে রইল চুপচাপ। একটা ফাইলও ওলটালো না। মাথার মধ্যে কী যেন সব তালগোল পাকাচ্ছে সেই থেকে। বেলা দুটো না বাজতে ভিতরে ভিতরে ওঠার তাড়া। ঘন ঘন ঘড়ি দেখল। কিন্তু জোর করে পাঁচটা পর্যন্ত বসেই থাকল। বাড়ি ফিরে কী করবে? কী করতে পারে রাখি? …চোখের সামনে মেয়ের হাত ধরে চলে যাচ্ছে, তাই দেখবে চেয়ে চেয়ে?
অন্যদিন অফিসের গাড়িতে বাড়ি ফেরে। আজ ট্রামে উঠল। তাতেও বেশ কিছুটা সময় চলে গেল। জায়গায় নামল। ট্রাম-স্টপের উল্টোদিকের রাস্তা ধরে আধ মিনিট হাঁটলে বাঁ-দিকে বাড়ি। ট্রাম-স্টপ থেকে বাড়িটা দেখা যায়।
রাখি রাস্তা পার আর হল না। ট্রাম-স্টপেই দাঁড়িয়ে রইল। বাড়িটার দিকে নিস্পলক চেয়ে রইল।
বিকেলের ছায়া ঘন হয়ে আসছে।
…বাড়ির দোরে একটা ট্যাক্সি দাঁড়াল। ও-মুখ করে। ওই ফাঁকা রাস্তা ধরে স্টেশনে যেতে সুবিধা। রাখির বুকের ওপর হাতুড়ির ঘা পড়ল। চাকরটা নেমে ভেতরে চলে গেল।
একটু বাদে মাল-পত্র তুলতে লাগল। বেশি কিছু নয়। মেয়ের হাত ধরে তার বাবা ট্যাক্সির সামনে এসে দাঁড়াল।
সমস্ত শক্তি একত্র করে রাখি দেখছে। নিঃশ্বাস রুদ্ধ।
তারা উঠল। ট্যাক্সি চলে গেল। ওই চাকাগুলো বুঝি রাখির বুকের ওপর দিয়েই। চলে গেল।
সামনে রাজ্যের অন্ধকার ধেয়ে আসছে। রাখি এবার তার আগেই বাড়ি পৌঁছুতে চায়। নইলে আর পারবে না। পায়ের নিচে মাটি দুলছে। পৃথিবী ঘুরছে।
…বাড়ি। সিঁড়ি ধরে দোতলা। দোতলায় পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে সামনের দুটো শূন্য ঘর যেন হাঁ করে গিলতে এলো তাকে। মিনিটখানেক শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রাখি আত্মরক্ষা করল।
তারপর পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকল।
মাথার মধ্যে আবার কী সব হিজিবিজি তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। রাখি তারও জট ছাড়াতে চেষ্টা করছে।…কী এমন হয়েছে? কিছু হয়নি। পৃথিবী রসাতলে যায়নি। সবই ঠিক আছে। জয়পুর আর কতদূর?…দার্জিলিংয়ে কবে যেন একটা লোক অসুখে পড়ে আনন্দ ছলছল চোখে বলেছিল–এত দিন তার কেউ ছিল না, এখন সব আছে। … আর ও নিজের হাতে খাবার তৈরি করলে সেই লোকটা ছোট ছেলের মত খুশি হত। অনেকদিন কিছু করা হয়নি। কিন্তু তাতে কী, দিন কী ফুরিয়ে গেল নাকি…জয়পুর কত আর দূর?
..কাপুর জিজ্ঞেস করেছিল, হাজব্যাণ্ড ওকে ভালবাসে কিনা, আর জিজ্ঞেস করেছিল, ও হাজব্যাণ্ডকে ভালবাসে কিনা। যেন এরকম সম্ভাবনার মতো ছেলেমানুষি। সম্পর্ক এটা। ঠোঁট দুটো বিষম জ্বালা করে উঠল হঠাৎ, সুরাযুক্ত দুটো অধরের স্পর্শ। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে বেশ করে মুখটা ধুয়ে এলো।…সোমাটা হতচ্ছাড়ি একটা, দিল একটা ভালমানুষকে ক্ষেপিয়ে! কী না, ওর বর রাখিকে পছন্দ করতে শুরু করেছে! করলেই হল, অত সস্তা আর কী! জয়পুর যেন ভয়ানক দূর!
আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বিছানায় বসল।–কী যেন ভাবছিল। কী যেন ভাবা দরকার। কিন্তু আজ আর কিছু পারছে না। ভয়ানক ক্লান্ত। ঘুম পাচ্ছে। কাল ভাববে। পরশু ভাববে। ইচ্ছেমতো যে-কোন দিন ভাববে। আজ ঘুম পাচ্ছে–মোটা কথা, জয়পুর এমন কিছু দূর নয়!
ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা রাখি শয্যায় এলিয়ে দিয়ে নির্জীবের মত চোখ বুজল। আজ আর কিছু ভাবতে পারছেই না। কাল ভাববে। পরশু ভাববে। ইচ্ছেমতো যে কোনদিন ভাববে। আজ রাখি ঘুমুবে।
আহুতি
সোমনাথ চাটুজ্যের কাছে আজও একে একে পাঁচ-ছ দফা লোক এলো। প্রত্যেকের কাঁধের ঝোলায় বিশ-পঁচিশখানা করে বই। বইগুলো তারা সোমনাথবাবুকে বুঝিয়ে দিয়ে বখশিশ নিয়ে চলে গেল! সোমনাথবাবুর থমথমে মুখ। বাড়ির চাকর সে বইগুলো তাঁর নির্দেশে ভিতরে নিয়ে গেল। ভিতরে মানে রান্নাঘরের সামনে ঢিবি করে রাখাল সেগুলো।
