তিনদিন ধরে বাড়িতে লোকে বড় তাজ্জবকাণ্ড দেখছে কর্তার। বাড়ির লোক বলতে এখন ঠাকুর-চাকর, সোমনাথবাবুর গৃহিণী আর ছোট মেয়ে সুলেখা। আরো একটি জীব আছে, প্রভুর কাণ্ড দেখে সেও কম অবাক হবে না। সে কোন লোক নয়, সোমনাথবাবুর অ্যালসেসিয়ান উলফ। সব দেখেশুনে রগচটা এই জীবটিও হকচকিয়ে গেছে।
সব থেকে বেশি হতভম্ব সোমনাথবাবুর স্ত্রী শশীরানী। ডাক্তার ডাকার কথা কদিনই ভাবছেন। একটা ফোন করলেই ডাক্তার এসে পড়বে, কিন্তু শশীরানী ভরসা করে তাও ডাকতে পারছেন না। ডাক্তার এলে এই মানুষ আবার কোন মূর্তি ধরবে কে জানে!
সোমনাথবাবু হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু কদিনের এই মুখ দেখলে কেউ বলবে না মানুষটা হাসতে জানে।
সোমনাথ চাটুজ্যে তেমনি গম্ভীরমুখে উঠলেন। চাকর যেখানে বইয়ের ঢিবি করেছে, পায়ে পায়ে সেখানে এলেন। বইগুলো দেখলেন একটু চেয়ে। ঝকঝকে বই, নতুনের গন্ধ লেগে আছে।
–কটা এলো?
চাকর তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলল, আজও একশ ত্রিশ
পুরনো চৌকস চাকর। তার হিসেবে বিশ্বাস করা যায়।
বললেন, বোস, আরো খান-বিশ-পঁচিশ আসবে।
..প্রথম দিন আনা হয়েছিল পঁচাত্তরখানা। দ্বিতীয় দিনে একশ দশ। তৃতীয় দিনে একশ পঁচিশ। আজ আসবে কম করে একশ পঞ্চাশ। মনে মনে একটু হিসেব করে নিলেন সোমনাথবাবু। মোট দাঁড়াল চারশ পঞ্চাশ।…আরো দেড়শ কিনলে এ-যাত্রার কাজ শেষ।
ভিন্ন ভিন্ন বই নয়। একই বইয়ের কপি সব। উপন্যাস। নাম–অনুরাগ চক্র। এই বইয়ের ঢিবির সবগুলোই অনুরাগ চক্র। আজ চারদিন ধরে থাকে-থাকে খেপে খেপে কেবল অনুরাগ চক্রই আসছে সোমনাথবাবুর বাড়িতে। আরো দেড়শ এই বই-ই আসবে।
উপন্যাসখানার দাম আট টাকা। মোট ছশ বই যদি কিনতে পারেন সোমনাথবাবু, তাহলে দাম দাঁড়াল চার হাজার আটশ টাকা। বই যাদের দিয়ে কেনানো হচ্ছে তাদের মারফত কমিশন পাওয়া যাচ্ছে পঁচিশ পারসেন্ট। তার মানে বারোশ টাকা বাদ। তাহলে খরচা দাঁড়াল তিন হাজার ছশো। এ ছাড়া ওই লোকগুলোকে–যারা বই কিনে আনছে –তাদের বখশিশ দিতে হচ্ছে প্রত্যেককে দশটাকা করে।
যে দেড়শ বই আরো আসবে তার দাম বাদ বাকি সব টাকা সোমনাথবাবু দিয়েই দিয়েছেন।
এ বই অর্থাৎ অনুরাগ চক্রর লেখক সোমনাথ চাটুজ্যে নিজেই।
হ্যাঁ, এই চারদিন ধরে বিভিন্ন লোক মারফৎ নিজের বই-ই কিনে চলেছেন তিনি। কালকের মধ্যে নতুন চার-পাঁচজনকে দোকানে পাঠিয়ে আরো দেড়শ অন্তত কিনবেন।
বাইরে পরিচিত গলার হাঁক শোনা গেল। কার গলা চিনতে পারার সঙ্গে সঙ্গে মুখখানা বিব্রত এবং বিরক্ত। যাঁর পদার্পণ তিনি যে, আসবেনই জানা কথা। ওই ভদ্রলোকের হন্তদন্ত হয়ে আসার মত একটা অস্ত্র সোমনাথ চাটুজ্যেই নিক্ষেপ করেছেন। তবু বিব্রত, তবু বিরক্ত।
– বাইরের ঘরে চেনা-গলার হাঁক শুনে আড়াল থেকে মনে মনে আশান্বিত কেউ যদি হয়ে থাকেন, তিনি শশীরানী। অন্যদিন হলে খুশিমুখে তিনিই বেরিয়ে আসতেন। আজ পারলেন না। আজ সঙ্কোচ। কিন্তু তা সত্ত্বেও আশা, ঘরের মানুষের এই মতির কিছু হদিশ মিলতে পারে এবার।
গাড়ি হাঁকড়ে যিনি এসে হাজির হয়েছেন তার নাম বিজয় ঘোষ। বাংলা দেশের এক নামজাদা প্রকাশক। তার অনুগ্রহ সরস্বতীর দপ্তরে প্রবেশের ছাড়পত্রের সামিল। অনেক মাঝারি লেখককেও প্রচারের মাধ্যমে প্রথম সারিতে এনে হাজির করেছেন তিনি, এ-দেশের লেখককুল তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু সোমনাথ চাটুজ্যের সম্পর্কে আজ অন্তত ঠিক একথা খাটে না। তিনি মাঝারি নন। একেবারে সামনের সারির একজন। বিজয় ঘোষের সঙ্গে তার বহুদিনের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব এখন অপর লেখক এবং প্রকাশকের চোখ টাটানোর মতো ফলপ্রসূ-এই শুধু বলা যেতে পারে।
সোমনাথ চাটুজ্যে বাইরের ঘরে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে বিজয় ঘোষ গলায় কাপড়ের খুটটা জড়িয়ে নিয়ে দুহাত জোড় করল।–কী অপরাধ বলো!
মিনমিন করে সোমনাথবাবু জবাব দিলেন, অপরাধ আবার কি, বোসো…।
গম্ভীর মুখে আসন নিয়ে বিজয় ঘোষ পকেট থেকে একটা রেজেস্ট্রি খাম বার করলেন।–আমি কি বিশ্বাস করব, এটা তুমিই আমাকে পাঠিয়েছ?
সোমনাথবাবু তেমনি মিনমিন করেই জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ ভাই…পাঠাতে হল। বিজয় ঘোষের গোল মুখের ওপর দৃষ্টি স্থির হল একটু।
-তোমাকে কে কী বলেছে?
–কেউ কিছু বলেনি।
–আমার থেকে কেউ বেশি টাকার টোপ ফেলেছে?
–না।
-আমি বাইশশ ছেপে দুচার হাজার ছেপেছি, এ-রকম রিপোর্ট কেউ দিয়েছে। তোমাকে?
– না।
সেদিন, যখন তুমি আমাকে টেলিফোন করেছিলে, আমি জানিয়েছিলাম দেড়মাসে দেড়হাজারের বেশি কপি বিক্রি হয়ে গেছে। হঠাৎ এই চারদিন ধরে বাকি কপিগুলো মুড়িমুড়কির মত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে–আর দেড়শ বইও নেই। তবু আমি ঠিকমত তোমার বই বিক্রি করতে পারছি না–এ-কথা কেউ বলেছে?
-না, সে-সব কিছুই না।
ঈষৎ অসহিষ্ণু অভিমানক্ষুব্ধ স্বরে বিজয় ঘোষ বলে উঠলেন, তাহলে আমার ওপর এই চিঠির বজ্রাঘাত কেন খুলে বলবে তো?…এই কদিনের বিক্রি দেখে রাতারাতি পরের এডিশন ছাপার জন্য আমি একসঙ্গে চারটে প্রেসের সঙ্গে ব্যবস্থা করে ফেলেছি-তার মধ্যে তোমার এই হুকুমজারি, এই বই আমি ছাপতে পারব না!
-ইয়ে, পরে সব তোমাকে বলবখন।
–এখনো পরে বলবে! তোমার এই চিঠির হুকুমই পাকা তাহলে?
–হুকুম আবার কী, বিশেষ দরকার হয়েছে…তাই।
