ওপরের দিকের ওরা মস্ত সরকারী বাংলোয় আছে-সস্ত্রীক রমেন্দ্র সরকার, কাপুর, রাখি আর ওয়েলফেয়ার অফিসার। রাতে কাপুরের ফুর্তির আড্ডা বসে। বোতলের রসদ সে কলকাতা থেকেই নিয়ে এসেছে। তাদের চারজনের আনন্দের আসর বসে। আনন্দ যে নেই সেটা বুঝতে না দেবার তাগিদেই রাখি যোগ দেয়। না এলে সোমা বা কাপুর গিয়ে ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসে।
তাদের অনুরোধে গেলাসও হাতে তুলে নেয়। সমস্ত দিনের এত পরিশ্রমের পরেও রাতে ঘুম হতে চায় না। এই তরল জিনিস জঠরে গেলে চিন্তা-ভাবনাও কিছুটা ফিকে হয়ে যায়, ঘুমও একটু হয়। রাখি ভিতরের সমস্ত ক্ষোভ চিন্তা-ভাবনা যাতনা মুছে ফেলতেই চায়।
দশটা দিন কেটে গেল। রমেন্দ্র সরকার সোমা আর কাপুর কাল চলে যাবে। রাখির আরও দিন-দুই থাকা দরকার। মন না চাইলেও থেকেই যাবে।
রাতের আসর আজ একটু বেশিই জমেছে। রাখি গেলাস তেমন মুখে তুলছে না দেখে রমেন্দ্র সরকার নিজে পর্যন্ত দুই-একবার সাহায্য করতে এগিয়েছে। সোমার হাব-ভাবও অন্য দিন থেকে একটু বেশি খুশি-খুশি। বেশি খেয়েছে বলেই বোধহয়।
রাত মন্দ হল না। বরের শরীর খারাপ হবার ভয়ে সোমা একরকম জোর করেই রমেন্দ্র সরকারকে টেনে তুলে নিয়ে চলে গেল।
রাখিও উঠল।
কাপুর বাধা দিল, ম্যাডাম দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
উঠে সোজা এগিয়ে গিয়ে ঘরের পুরু নীল পর্দার ওধারের দরজা দুটো টেনে দিয়ে সোজা তার কাছে ফিরে এলো। খুব কাছে। সঙ্গে সঙ্গে হাত দুটো তার দুই কাঁধে উঠে এলো।
-এ-ভাবে আর কত দিন চলবে? হোয়াই ওয়েস্ট টাইম?
-তার মানে? রাখি হতভম্ব। তার বোধশক্তি কয়েক নিমেষের জন্যে যেন বিলুপ্ত একেবারে।
-ও, ইউ নো ওয়েল! একটা জোরালো আকর্ষণ, পরমুহূর্তে পুরু দুই অধরের নিষ্পেষণে ঠোঁটদুটো যেন জ্বলেপুড়ে গেল রাখির। সর্বাঙ্গ অবশ, পায়ের নীচে মাটি দুলছে।
কয়েকটা মুহূর্ত। প্রাণপণে লোকটাকে ঠেলে সরালো সে। চকিতে বসন সংবরণ করে নিয়ে একটা চাপা আর্তনাদ করে উঠল প্রায়।–এ আপনি কী করছেন?
কাপুর থমকাল একটু। তারপর হেসেই আবার বলল, রাখি, লেটস কাম আউট –আমার ফ্লার্টিং ওয়াইফের সঙ্গে আমার বনছে না, তোমারও ওই রাফ হাজব্যাণ্ডের সঙ্গে বনছে না–সো লেট আস মেক অ্যারেজমেন্ট অ্যাণ্ড লেট দে গো টু হেল!
–এসব; এসব আপনাকে কে বলেছে? আমার কথা আপনাকে কে বলেছে? ক্রোধে আর সেই সঙ্গে এক অব্যক্ত যাতনায় রাখি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
আর তাই দেখেই কাপুর হকচকিয়ে গেল কেমন।-বোসো ম্যাডাম, আই অ্যাম স্থাউন্ড্রেল বাট নট মীন! আমাকে বুঝতে দাও। তুমি তোমার হাজব্যাণ্ডকে ভালবাসো?
রাখি অসহিষ্ণু জোরের সঙ্গে বলে উঠল, হ্যাঁ।
–সে তোমাকে ভালবাসে?
–বাসে।
কাপুর ধুপ করে সোফায় বসে পড়ল।–দেন আই অ্যাম এ ফুল অ্যাণ্ড হ্যাভ প্লেড ইন হার হ্যাঁণ্ডস এগেইন! শোনো ম্যাডাম, আমি একেবারে ভুল ধারণা থেকে এগিয়েছি–দ্যাট লেডী, সোমা সরকার, সী ইজ অ্যান ইনট্রিগিং গার্ল! নাও আই আণ্ডারস্ট্যাণ্ড এভরিথিং! –ওয়েলফেয়ার অফিসার মণিমালা ঘোষকে মনে আছে? ওদের আত্মীয়। সি লাইকড মি..পরিবারের দুর্নাম হবে সেই ভয়ে আমাদের মাঝখানে ওরা তোমাকে নিয়ে এলো। সোমা সরকার কত যে প্রশংসা করেছিল তোমার ঠিক নেই। আর আমারও সত্যি তোমাকে ভালো লাগতে শুরু করেছিল, সেটা বুঝেই মণিমালা সরে গেছে।
রাখি স্তব্ধ। কাপুর উঠে লম্বা ঘরটায় একবার পায়চারি করে তার হাত-কয়েক দূরে এসে দাঁড়াল।-ইদানীং সোমা সরকার তোমার স্বামীর সম্পর্কে আমার কাছে অজস্র নিন্দা করত, তাকে রোগ বলত, বলত বিয়ের পর থেকে কোনোদিন তুমি শান্তি পাওনি বলে তার ধারণা।-কেন বলত জানো? বিকজ হার হ্যাঁজব্যাণ্ড হ্যাঁজ স্টার্টেড লাইকিং ইউ, ইয়েস সী ক্যান স্মেল দ্যাট!–তাই সে এখন আমাকে দিয়ে তোমাকে ভালোমত আড়াল করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। আজ বিকেলেও আমাকে বার বার বলেছে, না এগোলে হবে কি করে, এতবড় সুযোগ পেয়েও এগোচ্ছ না কেন?
অদ্ভুত একটা হাসি দেখা গেল কাপুরের মুখে। সব ঝেড়ে ফেলেই যেন বলল, যাক, লেট এভরিওয়ান অফ আস একসেপটিং ইউ গো টু হেল! ক্যান ইউ ফরগিভ মি?
রাখি চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে। জবাব দিতে পারেনি।
পরদিন সন্ধ্যাতেই বাড়ি ফিরল রাখি। একটা দিনও আর দেরি করতে পারেনি। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, কী একটা ব্যাপারে যেন বড় দেরি হয়ে যাচ্ছে। থেকে থেকে একটা দুর্যোগের ছায়া পড়ছে।
তাই ছুটে আসার তাড়া।
মেয়ে দৌড়ে এলো কাছে।-মা তুমি এসে গেছ! আমার কী খারাপ যে লাগছিল, ভাবছিলাম তোমার সঙ্গে যাবার আগে বুঝি দেখাই হল না!
বিষম চমকে উঠল রাখি। সত্রাসে তাকালো মেয়ের দিকে।–কোথায় যাবি?
-বারে, কাল যে আমরা জয়পুর চলে যাচ্ছি! বাবু বলেছে, কাল এই সময় ট্রেন।
রাখি বাকশক্তিরহিত। কোনরকমে দুপা এগিয়ে পাশের ঘরের পরদা সরালো। ঘরে কেউ নেই।
মেয়ে বলল, বাবা আরো কী সব কিনতে গেছে।
…নিজের ঘরের শয্যায় এসে বসল পাখি। নিস্পন্দ, কাঠ। রাখি পাশে দাঁড়িয়ে সাগ্রহে কী যেন বলছে..বলছে বাবাকে আর সেই সঙ্গে ওকেও কলেজে নিয়ে গিয়ে কত খাতির করেছে, বাবাকে মোটা মোটা মালা পরিয়েছে, কত ভাল ভাল কথা বলেছে, তারপর কত কী খাইয়েছে তাদের!
নিষ্প্রাণ মূর্তির মত রাখি বসেই আছে।
