রাখি নির্বাক বিমূঢ় খানিকক্ষণ। এমন একটা সংবাদ সে কল্পনাও করতে পারে না। তার মুখ দেখে প্রতুল সোমও প্রথমে অবাক, পরে অপ্রস্তুত। সে বলেই ফেলল, আপনি এ-সব জানেন না নাকি?
সহজ হবার চেষ্টায় প্রাণান্তকর ধকল। সমস্ত শক্তি দিয়ে হাসতে চেষ্টা করল রাখি। বলল, ঠিক এতটা জানি না…।
বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছে বুঝে প্রতুল নোম আর অপেক্ষা না করে উঠে পালাল।
মাথায় আগুন জ্বলছে রাখির, সে অপেক্ষা করছে।
সন্ধ্যার একটু পরেই মানুষটা এলো টের পেল। সোজা তার শোয়ার ঘরে চলে। গেল। ওর ঘরে আসা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে।
খানিকটা সময় নিয়ে মাঝের দরজা দিয়ে রাখিই ও-ঘরে এসে দাঁড়াল। মেয়ে তখন বাপের বুকের ওপর উপুড় হয়ে কে এসেছিল সেই সমাচার জানাচ্ছে। তার বাবার গায়ে চাদর জড়ানো, শুকনো মুখ। কিন্তু আর লক্ষ্য করার ধৈর্য নেই রাখির। মেয়েকে বলল, ওদিকে আয়ার কাছে যাও।
মেয়ে আজকাল একটু ভয়ই করে তার মাকে। এই মুখের হুকুম শুনে তক্ষুনি চলে গেল। রাখি আরো একটু এগিয়ে এলো।-তুমি অন্য জায়গায় বদলির চেষ্টা করছ শুনলাম?
বদলির চেষ্টা নয়, আসলে সরকারী চাকরি ছেড়ে চলে যাবে কিনা, সম্প্রতি সেই চিন্তাই করছিল সে। জয়পুরের এক কলেজ থেকে তার আমন্ত্রণ যে এসেই গেছে, সেটা এ পর্যন্ত কারো কাছে বলেনি। এখনো বলল না। গায়ে চাদরটা আর একটু ভালো করে জড়িয়ে উঁচু বালিসে মাথা রাখল।
-হ্যাঁ।
-তা এ সামান্য খবরটা আমাকে বলোনি কেন, বাইরের লোকের কাছে বেশ ভালো-মতো অপমান করার জন্যে?
সুবীরকান্ত জবাব দিল না। ..
তীক্ষ্ণ কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাখি।-আমাকে চাকরি ছাড়তে হবে?
–না।
–মেয়ে নিয়ে তুমি একা যাবে?
–হ্যাঁ।
চেয়ে আছে রাখি। মর্মান্তিক দেখাই দেখে নিচ্ছে যেন।–আশা বড় করেছি সেই মস্ত অপরাধে বাসা তাহলে ভাঙাই ঠিক করেছ তুমি?
সুবীরকান্ত নিরুত্তর।
দুচোখ ধক-ধক করে জ্বলছে রাখির। গলার স্বরেও এবার বুঝি আগুন ঝরল। –এত হিংসে তোমার ভেতরে ভেতরে! এত জ্বালা!
ধার কিন্তু পাণ্ডুর মুখে সুবীরকান্ত আস্তে আস্তে বসল। কঠিন স্বরে বলল, রাখি। আমার শরীর সুস্থ নয়, তুমি ও-ঘরে যাবে?
শরীর-মন কিছুই তোমার সুস্থ নয় সে তো অনেক দিন ধরেই দেখছি, ভিতরে এত বিকৃতি যার সে সুস্থ থাকবে কেমন করে? ও-ভাবে দেখছ কী, আজও তুমি মুখ বন্ধ করবে ভেবেছ? তুমি নীচ! তুমি অতি নীচ, অতি ছোট, অতি হীন, বুঝলে-বুঝলে?
তার মুখখানা ঝলসে দিয়েই এক ঝটকায় সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
হাঁপাচ্ছে। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে তখনো।
কবরের স্তব্ধতার মধ্যে কেটে গেল কয়েক ঘণ্টা। ও-ঘরের আলো অনেকক্ষণ। নিভে গেছে। মাঝের পর্দাটা ঝুলছে। রাখি নিজের ঘর থেকে বেরুলো একসময়। খাবার ঘরে আলো জ্বলছে। চাকরটা বসে আছে। তাকে দেখে উঠে এলো।-বাবু রাতে কী খাবেন বললেন না তো?
তার দিকে চেয়ে রাখি থমকালো একটু।–কী খাবেন মানে?
চাকর জানালো, আজ দুদিন বাবুর শরীর খারাপ, দুবেলাই দুধ-সাগু খাচ্ছেন –আজ কী খাবেন কিছুই বলেন নি।
কয়েক মুহূর্ত রাখি নির্বাক। তারপর চাকরকে বলল, আর অপেক্ষা না করে খেয়ে নিতে। তারও খিদে নেই বলে এলো।
.
পরদিন।
মেয়ে স্কুলে চলে গেছে। অফিসে বেরুবার আগে এক-রকম জোর করেই রাখি ঘরে ঢুকল।…চোখ বুজে শুয়ে আছে। টেবিলে ওষুধের শিশি একটা। তেমনি পড়ে আছে–এক দাগও খাওয়া হয়নি। কাল বিকেলে ডাক্তারের কাছে গেছল বোঝা গেল। সকালে টোস্ট পাঠিয়েছিল, তা তেমনি পড়ে আছে, শুধু চা খেয়েছে।
ফিরে তাকাতে দেখল তার দিকেই চেয়ে আছে। রাখির মানসিক যাতনা একটুও কমেনি। সমস্ত রাত বরং আরো বেশি জ্বলেছে। তবু এই মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ দার্জিলিংয়ের একবারের সামান্য অসুখের কথা মনে পড়ল। রাখি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে কয়েকটা কথা বলেছিল।…এ মুখের সঙ্গে সেই মুখের মিল নেই একটুও।
জিজ্ঞাসা করল, তোমার কী অসুখ?
জবাব পেল না।
–আজ কলেজ যাবে?
নিরুত্তর।
–দুপুরে কী খাবে সে-কথা বলবে?
নির্বাক।
রাখি বেরিয়ে এলো। কাল বাদে পরশু অত বড় ট্যুর-প্রোগ্রাম, অফিসে অনেক কাজ। কিন্তু কাজ না থাকলেই বা কী করত? ও বাড়ি থাকলেই বরং না খেয়ে না দেয়ে ওই ভাবে বসে থেকে তাকে আক্কেল দেবে। ক্ষোভ আর একটা অসহ্য যাতনা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
এমনি স্তব্ধতার মধ্যেই সেই দিনটা গেল। পরের দিনও। সন্ধ্যা। প্রাণান্তকর বিমুখতা সত্ত্বেও পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল।…বসে আছে। পাশে মেয়ে।
-কেমন আছ?
জবাব পেল। মেয়ে সামনে আছে বলেই।-ভালো।
ট্যুরে বেরোনোর খবর আগেই জানত। পাঁচ-ছদিন আগে রাখি বলে রেখেছিল। ভিতরে ভিতরে মানুষটা কোন ছুরি শানাচ্ছে তখনো জানা ছিল না। জিজ্ঞাসা করল, কাল আমার ট্যুর-প্রোগ্রাম, কী করব?
যাবে।
–ফিরতে আট-দশদিন দেরি হবে।
হবে।
বাইরে এসে কাজের চাপে সাময়িকভাবে যাতনাটা ভুলতে চেষ্টা করল রাখি। শুধু যাতনা নয়, সেই সঙ্গে বিদ্বেষ, ক্ষোভ-আবার কী একটা অজ্ঞাত ভয়ও…মানুষটার অভিসন্ধি জানার পর এতবড় একটা ব্যাপার ঘটে গেছে যখন, ভয়ের কিছু আছে। ভাবছে না। তবুও ভয়।
.
সমস্ত দিনে ফুরসত নেই বললেই চলে। বড় ব্যাপার। সোমাকে নিয়ে ডাইরেক্টর রমেন্দ্র সরকার এসেছে, জয়েন্ট ডাইরেক্টর কাপুর এসেছে, রাখি এসেছে, ওয়েলফেয়ার অফিসার এসেছে, আর আরো নীচের কর্মচারীরা যে কত এসেছে ঠিক নেই।
