চাপা হেসে রাখি জবাব দিল, তোমার তাতে ভয়টা কী, সঙ্গে আমি আছি, ওর। বরও আছে।
শো ভাঙতে শুধু চড়াও করা নয়, কোনো ওজর-আপত্তিতে কান না দিয়ে সোমা সরকার একেবারে গাড়িতে টেনে তুলল তাদের। আই. এ. এস. সামনে ড্রাইভারের পাশে বসল, তারা তিনজন পিছনে।
হাসিমুখে সোমা সরকার সুবীরকান্তর উদ্দেশে বলল, আপনার স্ত্রী-টি মশাই কি যে দুষ্টু ছিল আপনার কোনো ধারণা নেই, আমাদের একেবারে নাজেহাল করে ছাড়ত!
সুবীরকান্ত মন্তব্য করল, স্বভাব এখনো খুব বদলায়নি।
সোমা সরকার হালকা সুরে চ্যালেঞ্জ করল, আপনাকে তো বেশ ভালো মানুষ মনে হচ্ছে, না বদলালে সামলান কী করে?
সামলাবার চেষ্টাও করি না, হাল ছেড়ে দিয়েছি।
সকলেই হেসে উঠল। এমন কী সামনে থেকে রমেন্দ্র সরকারও হাসিমুখে এদিকে তাকালো।
সোমা সরকার বলল, না সামলালেও আপনার স্ত্রী আগের থেকে ঢের বেশি সুন্দর হয়েছে এখন, বুঝলেন?
সুবীরকান্ত জবাব দিল, আমি সামান্য মাস্টার, এতেও আমার কিছুমাত্র হাতযশ নেই।
আবার একপ্রস্থ হাসি। রাখির কানের কাছে মুখ এনে সোমা সোচ্ছ্বাসে বলল, বেশ লোকটি তো রে তোর! তারপর তেমনি চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, চেহারাখানা। তো দিব্বি কচি রেখেছিস–ছেলেপুলে কী?
-একটা মেয়ে।
সোমা জোরেই বলে উঠল, মাত্র!
রাখি তার হাঁটুতে একটা চিমটি কেটে মুখ বন্ধ করতে চাইল। তারপর গলা। আরো খাটো করে জিজ্ঞাসা করল, তোর?
সোমা সরকার ছদ্ম-কোপে তার আই. এ. এস, স্বামীর দিকে তাকালো একবার। তারপর জবাব দিল, আমার এক গণ্ডা।
বলা বাহুল্য, যত নীচু স্বরেই তারা বাক্যালাপ করুক, সুবীরকান্তর কানে এসেছে সবই।
সোমার বাড়ি-ঘর দেখে দুচোখ জুড়িয়ে গেল রাখির। ছবির মত বাড়ি, চমৎকার আসবাব-পত্র, আর তেমনি পরিপাটি ব্যবস্থা সব-কিছুর। ওর ছেলেমেয়েগুলোও তেমনি ফুটফুটে সুন্দর। সুখের ঘরে রূপের বাসা। রাখির যেমন স্বভাব, নিজের অবস্থার তুলনামূলক চিত্রটা মনে আসছেই।
বাড়ি ফিরে রাত্রিতে বিছানায় গা এলিয়েও ওদের কথাই ভাবছিল। বলল, কী চমৎকার আছে সোমারা, তাই না?
কাছে এগিয়ে এসে সুবীরকান্ত সায় দিয়ে বলল, চমৎকার, কিন্তু ওদের তুলনায় আমি আর এত পিছিয়ে থাকতে রাজি নই!
রাখি উৎসুক নেত্রে তাকালো তার দিকে। ভাবল অবস্থা ফেরানোর কোনো মতলবের কথাই শুনবে।
–ওদের চারটে ছেলেপুলে, আমার মাত্র একটা থাকবে কেন?
–যাও! রাখি ঠেলে সরাতে চেষ্টা করেছে তাকে।–তোমার কেবল ওই চোখে পড়েছে! কার সঙ্গে কার তুলনা!
সত্যি কথাই বলেছে। কিন্তু সব সত্যি কথা সর্বদা ভালো লাগে না। শেষের। এই তুলনার উক্তিটুকু সুবীরকান্তর কানে খুব মিষ্টি লাগল না।
এরপর সোমা সরকার একদিন তাদের ফ্ল্যাটে এলো। রাখি তাকে কোথায় বসাবে, কতভাবে আপ্যায়ন করবে ভেবে পায় না। তার গাড়ি পাঠিয়ে ওকেও দুতিনদিন তার। বাড়িতে নিয়ে গেল।
সেদিন তাদের বাড়ি থেকে রাখি রীতিমত একটা উত্তেজনা নিয়ে ফিরল। একটা অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্য যেন সেধে তার দোরগোড়ায় এসে হাজির হবার উপক্রম করেছে। এখন শেষ পর্যন্ত এলে হয়।
সুবীরকান্ত ব্যাপারটা শুনল। আই. এ. এস. রমেন্দ্র সরকার এখন ডিরেক্টর অফ সোস্যাল ওয়েলফেয়ার, অর্থাৎ এই বিভাগটির সর্বময়কর্তা। এম. এ. পাশ করে রাখি কলেজে চাকরির চেষ্টা করছে শুনে সে একটা আশাতীত প্রস্তাব দিয়েছে। তার বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট ওয়েলফেয়ার অফিসার নেওয়া হবে একজন–স্যোসিওলজির এম. এ. চাই, ইকনমিক্সও চলতে পারে, কারণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ.-তে এই সাবজেক্ট নেই। অবশ্য এ চাকরি হওয়া খুব সহজ নয়, পরীক্ষা হবে, ইন্টারভিউ হবে, তারপর চাকরির প্রশ্ন। তবে রমেন্দ্র সরকার সহায় বলেই আশা। সে নিজেই বলেছে, যতটা সম্ভব চেষ্টা করবে। আর সোমা তাকে বলেছে, ওরা ওরকম হাতে রেখে বলে, শেষ পর্যন্ত চাকরি তোরই হবে জেনে রাখ।
আশ্চর্য, এমন একটা খবর শোনার পরেও লোকটা প্রায় নির্বিকার! খানিক চুপ করে থেকে মন্তব্য যা করল শুনে রাখির রাগ হবারই কথা। বলল, মেয়েদের পক্ষে এ বড় ঝামেলার চাকরি, তার থেকে কলেজই ভালো।
-বলো কী? গোড়াতেই গেজেটেড র্যাঙ্ক, কলেজে যেখানে শেষ এখানে প্রায় সেই মাইনের শুরু। এর ওপর কত প্রমোশন আছে–ওয়েলফেয়ার অফিসার তো হওয়া যাবেই, অ্যাসিস্টান্ট ডাইরেক্টার, ডেপুটি ডাইরেক্টার পর্যন্ত হওয়ার আশা আছে। তাছাড়া কলেজের চাকরি যে পাবই তারই বা ঠিক কী?
না পেলে স্কুলে তো পাবেই।
ঠাট্টা করছে কিনা রাখির প্রথমে সেই সন্দেহ হল। পরে রেগেই গেল।–তোমার কী মাথা খারাপ হয়েছে?
সুবীরকান্ত জবাব দিল না, চুপচাপ মুখের দিকে চেয়ে রইল শুধু।
এরপর দিনকতকের জন্যে আহার-নিদ্রা ঘুচে গেল রাখির।
দরখাস্ত করা হল। রোজই একবার করে সোমার ওখানে ছুটতে লাগল। লিখিত পরীক্ষার জন্য কীভাবে তৈরি হবে, ইন্টারভিউতেই বা কী ধরনের প্রশ্ন করা হয়ে থাকে, এ-সব ব্যাপারে তার কিছুই ধারণা নেই। সোমাকে বলে, পরীক্ষায় চিত্তির করে এলে আর এ বাড়িতে মুখ দেখাতে আসতে পারব না বলে দিলাম।
আর ওখানে যজ্ঞেশ্বর কাপুর নামে একজনের সঙ্গে সরকার আলাপ করিয়ে দিল। জয়েন্ট ডাইরেক্টার, রমেন্দ্র সরকারের ঠিক নীচের লোক। সোমা বলেছে, আপিসের সর্বকর্মে সেই নাকি বৃহস্পতি। বয়েস রমেন্দ্র সরকারের থেকে কিছু বেশি হবে। হাসি-খুশি দিলদরিয়া মানুষ। এখানে অনেককাল আছে, মোটামুটি ভালই বাংলা বলতে পারে। তুমি বলে। তুমিটা অন্তরঙ্গসূচক জানার পর থেকে একটু খাতির হলেই সে আর কাউকে আপনি করে বলে না।
