আর তখুনি ঘরের লোকের আরেক রূপ দেখল সে। প্রথমে বিরক্ত হয়ে হুকুম করল, সব কটা পেপারে শূন্য পেলেও গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হবে। তারপর বলল, আচ্ছা তোমার পাশ-ফেলের দায় আমার। যা বলি তুমি শুধু তাই করে যাও, আর কিছু ভাবতে হবে না।
এরপর থেকে দেখা গেল, ইতিহাস বই ছেড়ে তার ইকনমিক্স বই নিয়ে পড়াশুনায় মগ্ন হয়েছে লোকটা। আর দুবেলা নিজেই তাকে পড়াতে বসে যায়। প্রথমে বাংলায় জলের মত করে বোঝায়, তারপর ইংরেজিতে। এক-একটা দুরূহ পরিচ্ছেদ যে এত সহজে শেষ হতে পারে তার যেন বিশ্বাস হয় না। পড়ানো হলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, ঠিক হলে উত্তর লিখে রাখতে বলে। আগের কয়েক বছরের প্রশ্নপত্র এনে সেগুলির খুঁটিনাটি জবাব শেখায়–লেখায়। খবরের কাগজ থেকে অর্থনৈতিক প্রসঙ্গের কাটিং রেখে তাকে পাঁচবার করে পড়তে বলে, লিখতে বলে। সব লেখাই আবার ধৈর্য ধরে সংশোধন করে দেয়। এই তন্ময় গম্ভীর মানুষটাকে তখন যেন খুব কাছের কেউ বলে মনে হয় না তার।
নিজের অগোচরেই একটু একটু করে আস্থা ফিরছে রাখির। তাই শঙ্কার ভাবটা কমছে। সব থেকে বড় কথা, একটু দুশ্চিন্তা দেখলেই মানুষটা ধমকায় তাকে।–তোমাকে তো বলেছি, শূন্য পেলেও তোমার কোন দোষ হবে না–সব দায় আমার।
এ-কথা শুনলে মনের জোর কার না বাড়ে! তাই রাত্রে দুজনে মুখোমুখি আধশোয়া হয়ে পড়াশুনা চলে যখন, রাখির মাথায় এক-এক সময় দুষ্টুমি চেপে বসে। একেবারে বুকের কাছে এগিয়ে গেলেও এত তন্ময় যে খেয়াল করে না। রাখি তখন আচমকা দুহাতে জাপটে ধরে তাকে, গালে গাল চেপে বলে, তারপর?
ধ্যানভঙ্গ হয় তখন। সেদিন এমনি ব্যাপারের পর সুবীরকান্ত তাকে টেনে ধরে রেখে জবাব দিল, তারপর পরীক্ষা হয়ে গেলেই আর একবার নির্ঘাত তোমার নার্সিং। হোমে যাবার ব্যবস্থা!
ছিটকে সরে আসতে চেষ্টা করেছে রাখি।-খবরদার, কখখনো না।
আর ছেলেপুলে হবার ব্যাপারে রাখির বেজায় আপত্তি। বলে, একটাই বেঁচে থাক, পাখিকে ভালো করে মানুষ করো, আর বেশিতে কাজ নেই।
মেয়ের ডাক-নাম পাখিই আছে। সুবীরকান্ত হাসে। বলে দেখা যাবে।
পরদিন সকালেই আবার সেই পঠন আর পাঠনের তন্ময়তা।
বেশ নির্বিঘ্নে এম. এ পাশ করার পরেও রাখি ভোলেনি আসল কৃতিত্বটা কার। ভালই পাশ করেছে। মাঝামাঝির থেকেও একটু উঁচুর দিকের সেকেণ্ড ক্লাস। সেটুকুও আশার অতিরিক্ত। ফল যেদিন বেরুল রাখি সেদিন গম্ভীর মুখে সুবীরকান্তকে জিজ্ঞেস করেছিল, জীবনে বোধহয় এই পরীক্ষাটাই সব থেকে খারাপ হল, কেমন?
যেন সুবীরকান্তই পরীক্ষা দিয়েছে এবং পাশ করেছে। সে হেসে জবাব দিয়েছে, হ্যাঁ।
জীবনযাত্রার পট পরিবর্তন আসন্ন বলেই বোধহয় এমন দিনে একজনের সঙ্গে দেখা রাখির। সেদিন কী একটা ইংরেজী সিনেমা দেখতে গেছল তারা, তাদের সামনেই ঝকঝকে গাড়ি থেকে নামল একজোড়া মেয়ে-পুরুষ। মেয়েটি গোলগাল মোটাসোটা, পরনে দামী শাড়ি, গলায় আর হাতে দামী গয়না। পুরুষটি ফিটফাট বাঙালী সাহেব। গাড়ি থেকে দম্পতিটিকে নামতে দেখেই সিনেমা দেখার আকর্ষণ ভুলে রাখি হাঁ করে তাদের দিকে চেয়ে রইল। পাশ কাটিয়ে যাবার মুখে মহিলাটিও তাকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
অস্ফুট বিস্ময়ে রাখি বলে উঠল, সোমা না?
–রাখি, তুই!
হলের সামনে দুটি রমণীর পুলকিত জড়াজড়ির দৃশ্য দেখল অনেকে। তাদের স্বামী দুটি পরস্পরকে দেখে নিল একবার।
রাখির সহপাঠিনী সেই সোমা আর তার আই. এ. এস. স্বামী রমেন্দ্র সরকার। বান্ধবীর হাত ঝাঁকিয়ে রাখি বলে উঠল, কী গোল হয়ে গেছিস রে তুই, আমি তো প্রথমে হকচকিয়ে গেছি! পরক্ষণে আই. এ. এস-এর দিকে তাকিয়ে দুহাত জুড়ে নমস্কার জানালো, চিনতে পারেন?
বিব্রত জিজ্ঞাসু নেত্রে স্ত্রীর দিকে তাকালো ভদ্রলোক।–সোমা সরকার বলল, চিনবে কী করে, বিয়ের সময় সেই তো একবার দেখেছে! পরিচয় করিয়ে দিল, আমার বন্ধু রাখি গাঙ্গুলি–ওমা, গাঙ্গুলি বলছি কেন! সুবীরান্তর দিকে চোখ আটকালো তার, পরক্ষণে রাখির দিকে ফিরল।–বল না, ইনি নিশ্চয়?
হাসিমুখেই মাথা নাড়ল রাখি।–প্রফেসর সুবীর চক্রবর্তী।
আর এক-দফা সৌজন্য বিনিময়। ওদিকে সিনেমায় দ্বিতীয় বেল বেজে গেছে। খুশির ব্যস্ততায় সোমা জিজ্ঞাসা করল, সিনেমা দেখবি তো? কোথায় সীট তোদের?
কোথায় সীট রাখি জানে না, তবু বিব্রত অভিব্যক্তি একটু। সুবীরকান্ত জবাব দিল, নীচে।
সোমাদের ওপরের সব থেকে সেরা সীট সন্দেহ নেই রাখির। কিন্তু সোমা কিছু খেয়াল না করেই বলল, শো শেষ হলে পালাবি না বলছি, এইখানে দাঁড়াবি–কতকাল বাদে দেখা!
এত দিন বাদে দেখা হওয়ার ফলে রাখিও খুশি কম নয়। কিন্তু সোমার সঙ্গে তার অবস্থার তারতম্যটা এভাবে স্পষ্ট না হয়ে উঠলে যেন আরো খুশি হত। এতদিন বাদে আজ আবার মনে হল, তার ভদ্রলোকও যদি আই এ. এস-টাই হতে পারত–ইতিহাসের মাস্টার হয়েও যে আনায়াসে এম. এ. ক্লাসের ইকনমিকস পড়াতে পারে–ইচ্ছে করলে সে অনেক কিছু হতে পারত!
সীটে বসে বিস্ময় প্রকাশ করল, সোমাটা কী বিষম মোটা হয়েছে, দিব্বি ছিপছিপে চেহারা ছিল!
একটা কথা ভেবে সুবীরকান্ত মনে মনে কৌতুক বোধ করছিল, পরিচয় দেবার সময় রাখি সুবীরকান্ত বলেনি, শুধু সুবীর চক্রবর্তী বলেছে। ওর কথা শুনে মৃদু জবাব দিল, তোমার মত তো আর মাস্টারের বউ নয়, আই. এ. এস-এর বউ-সুখে আছেন। …কিন্তু শো ভাঙলে মহিলা আবার তো চড়াও করবেন মনে হচ্ছে!
