রমেন্দ্র সরকারের সামনেই সোমার আব্দার, মিস্টার কাপুর, আমার বন্ধুকে কিন্তু নিতে হবে, নইলে আপনার সঙ্গে কথা বন্ধ।
কাপুর হেসেই ভয়ের কারুকার্য ফুটিয়েছে মুখে।–কী সর্বনাশ, তাহলে তো নিতেই হবে।
পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন আশা সম্ভব সেটা কাপুরই লিখে দিয়েছে তাকে। সে-সব নিয়ে রাখি আবার ঘরের লোকের শরণাপন্ন হয়ছে। এত বড় একটা ব্যাপারে তার নির্লিপ্ততা দেখে সে মনে মনে বিরক্ত। কিন্তু এখন প্রয়োজনে তোয়াজ না করে। উপায় কী?
বড় চাকরি করার ঝোঁক এত প্রবল যে সুবীরকান্তও আর মুখ ফুটে বাধা দেয়নি। নিজে খেটে-খুটে আর বইপত্র ঘেঁটে সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে দিয়েছে। আর গলদঘর্ম হয়ে রাখি সে-সব কণ্ঠস্থ করেছে।
পরীক্ষা হয়ে গেল। রাখি অবাক, আসতে পারে বলে কাপুর যা লিখে দিয়েছিল, হুবহু সেই সবই এসেছে। তার বাইরে একটিও নয়। এর দিনকয়েক বাদে কাপুর লাফাতে লাফাতে এক বিকেলে আপিস-ফেরত বড়কর্তা অর্থাৎ সোমার বাড়ি এসে হাজির। রমেন্দ্র সরকার তখন টুরে। পরীক্ষার ফলাফল জানার আশায় রাখি প্রায়ই সোমার ওখানে যায়। সেদিনও গেছল। তাকে দেখামাত্র কাপুর হৈ-হৈ করে উঠল। –কনগ্রাচুলেশনস ম্যাডাম, কনগ্রাচুলেশনস্! তুমি তো একটি সাংঘাতিক মেয়ে দেখি, পরীক্ষার খাতায় কী কাণ্ড করেছ! সোমার দিকে ফিরল।-বুঝলে ম্যাডাম, তোমার বন্ধু একটি জিনিস, পরীক্ষার খাতায় যা-সব লিখেছে আমার বাবার সাধ্যি নেই সেরকম লেখে! অফিসাররা সব কাড়াকাড়ি করে ওর খাতা পড়েছে!
চাকরি? কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে এর পরেও চাকরি হবে না!
হাওয়ায় ভেসে বাড়ি ফিরেছে রাখি। এতবড় কৃতিত্বটা কার প্রাপ্য সেটা সে ভালই জানে। সুখবরটা তক্ষুনি ভাঙল না। খাওয়া-দাওয়ার পর লোকটা আবার বই নিয়ে শুয়ে পড়েছে। ইদানীং পড়াশুনা একটু বেড়েছে লক্ষ্য করেছে। বইখানা হাত থেকে টেনে নিয়ে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে রাখল, তারপর দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরে যেন একটা সবল অধিকার ঘোষণা করল।
-কী ব্যাপার?
রাখি বলল, ব্যাপার গুরুতর। তোমার এবারের চাকরির পরীক্ষাটা খুব ভালো হয়েছে–একেবারে ফাস্ট!
সুবীরকান্ত কিছুটা নির্লিপ্ত সুরে জবাব দিল, তোমাকে ফার্স্ট করার দায়ে যারা প্রায় প্রশ্নপত্র চালান করেছে, তাদের মুখ রক্ষা হয়েছে বলো!
মনে মনে একটু লজ্জা পেলেও উৎফুল্ল মুখে রাখি বেশ জোর দিয়েই বলল, বেশ যাও, সকলেই তো আর তোমার মত আদর্শ নিয়ে বসে নেই–কি যে হচ্ছে সর্বত্র তুমি খবরও রাখো না।
-বুঝলাম। তোমার চাকরি হচ্ছে তাহলে!
–হচ্ছেই তো। ছদ্ম-কোপে রাখি চোখ পাকালো।-কেন, না হলে তুমি খুশি হও?
সুবারকান্ত হেসেই জবাব দিল, ঠিক বুঝছি না!
রাখি বলল, তুমি একটা স্বার্থপর, একটা ভালো চাকরি করবো তাও তোমার হ্য হয় না। মেয়েদের পোস্ট, আমি না পেলে আর কোনো মেয়েই পেতো এটা–তাহলে আমি কী দোষ করলাম!
সুবীরকান্ত অন্তরঙ্গ আকর্ষণে তাকে আগলে রেখে হেসেই জবাব দিল, দোষ কিছু নয়, বিয়ের পর থেকে তোমার বড় হবার ঝোঁক দেখে আমার ভয়।
-বারে, চাকরিই যখন করব, ছোট চাকরি করব কেন?
সুবীরকান্ত তক্ষুনি ফিরে প্রশ্ন করল, আমার চাকরিটা ছোট চাকরি, না?
এবারে রাখি লজ্জা পেল একটু।-তুমি তো তবু প্রোফেসার, তোমার মতো তো। হলার নই আমি, প্রোফেসার হতে হতে বুড়িয়ে যাব।
-তাহলে তোমার স্কুলের চাকরিটা ছোট চাকরি ছিল বলো?
–অত সব জানি না, বিচ্ছিরি চাকরি।
এই প্রসঙ্গ বাতিল করে দিয়ে মনের আনন্দে আরো নিবিড়ভাবে বক্ষলগ্ন হল। নে। কিন্তু মানুষটাকে কেমন যেন অন্যমনস্ক মনে হল তার।
.
জীবনের একটা ছোট বৃত্ত থেকে অনেক দিনের আকাঙ্ক্ষিত একটা বড় বৃত্তে দার্পণ করল যেন রাখি। এই বৃত্তের রূপ আলাদা, রঙ আলাদা।
গোড়ায় গোড়ায় তার কাণ্ড দেখে সুবীরকান্ত হাসত। দুঘরের ফ্ল্যাটে আর চলছে, তিনঘরের ফ্ল্যাট একটা সংগ্রহ করতেই হল। ঘর হলেই হল না, তার যোগ্য সাজসজ্জা চাই। সোফা সেট এলো, তার সঙ্গে রং মিলিয়ে জানলা দরজার পর্দা এলো। টেলিফোন তো অফিস থেকেই মিলেছে। ছমাস না যেতে মাসিক কিস্তির ব্যবস্থায় ছোটখাটো একটা ফ্রীজও কিনে ফেলল সে।
মুখের হাসি আস্তে আস্তে কমে ব্যঙ্গোক্তি করেছিল, এবারে একটা গাড়ি চাই না?
–রোসো, আস্তে আস্তে সব চাই। তোমার কি, ভোলানাথ, কিছুই চাই না।
এ-সবের সঙ্গে তাল রেখে চাকরির মর্যাদা অনুযায়ী নিজের বেশবাসের ব্যবস্থা।
ছমাসের মধ্যে কম করে চারমাসের শেষের দিকেই বিব্রত মুখে রাখি এসে বললে, কিছু টাকা দিতে পারো, আমার হাতে যা ছিল ফুরিয়ে গেছে!
সুবীরকান্ত টাকা দেয়, কিন্তু টিপ্পনীও কাটে।–তুমি বড় চাকরি পাওয়াতে আমার কত সুবিধেই না হচ্ছে!
-বেশ যাও। সব যেন আমি নিজের জন্যে খরচ করছি। আর টাকাগুলোও ছাই কিভাবে যে খরচ হয়ে যায়–তা গোড়ায় গোড়ায় তো এরকম হবেই, একবার সব গোছানো হয়ে গেল তখন দেখো।
কিন্তু গোছানোর শেষ কোনো কালে হবে এমন ভরসা সুবীরকান্ত রাখে না।
বছর ঘুরতে পাখিকে নিয়ে তাদের মধ্যে ছোটখাট ঝগড়াই হয়ে গেল একটা। পাখি চার-এ পড়েছে, অতএব এখন ওকে কিন্ডারগার্টেনে না দিলেই নয়। নামজাদা এক মিশনারী স্কুলে ব্যবস্থা করল রাখি।
কিন্তু এ ব্যাপারে ওর বাপের বেয়াড়া গো দেখে মনে মনে রীতিমত বিরক্ত। তার সাফ কথা, ওর জন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না–যখন সময় হবে, আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মত ও সাধারণ স্কুলেই পড়বে।
