কিন্তু আরো মাসখানেক না যেতেই রাখি সত্যিকারের দুর্ভাবনার মধ্যে পড়ল। মা তখন জলপাইগুড়ি ফিরে গেছে। রাখি আবার স্কুলে যেতে শুরু করবে। ভাবছে। তিন মাসের পরে আরো দেড় মাসের আধা-মাইনের ছুটিও ফুরিয়ে এসেছে। মেয়ের জন্য সবে ভালো একটা আয়া রাখা হয়েছে। সব সুব্যবস্থার মধ্যে আচমকা। এই খবর।
সুবীরকান্ত কলকাতায় বদলির হুকুম-পত্র পেয়েছে। শুনে রাখি বিমূঢ় একেবারে।
–কি হবে তাহলে?
–কি আবার হবে, যাব!
–আর আমি?
–তুমিও যাবে!
এই নির্লিপ্ততা দেখে রাখি আরো অবাক যেন।–চাকরি ছেড়ে দেব?
সুবীরকান্ত হাসতে লাগল, তুমি কী ভেবেছ চিরকাল আমি এই দার্জিলিংয়েই থেকে যাব?
না, রাখি কিছুই ভাবেনি। সমূহ সমস্যাটাই তার কাছে বড়। সে জোর দিয়ে। বলল, এখন চাকরি ছাড়া কোনো কাজের কথা নয়, তুমি বদলি ক্যানসেল করার ব্যবস্থা করো।
-পাগল নাকি!
এই এক কথাতেই রাখি বুঝে নিয়েছে সেটা সম্ভব নয়, অথবা সম্ভব হলেও এই লোক সে-রকম তদবিরের ধার-কাছ দিয়েও যাবে না। গোড়াতে রাগই হয়ে গেছে। তার। আসলে সে চাকরি করে এটাই বোধহয় তার পছন্দ নয়–ঘরের মধ্যে মেয়ে। আগলে বসে থাকুক তাই চায়। এই অনুযোগের পরেও মানুষটার তাপ-উত্তাপ নেই, কেবল হাসে।
রাখি বলতে ছাড়ে না, এই তো মাইনে, চলবে কী করে?
সুবীরকান্ত যেন আরো মজা পায়।-এক-বেলা খাব, কী আর করা যাবে…এত বড় চাকরিটা তোমার! শেষে হেসেই বলে, তোমার এত ভাবনা কেন, কত লোকে বুড়ো বয়েসে প্রফেসার হয়েও চার-পাঁচটা ছেলেপুলে নিয়ে চালায়, আর একটা মেয়ে। নিয়ে আমাদের চলবে না? তাছাড়া কলকাতায় মেয়ে-স্কুল নেই? চাকরি করতে চাইলে তোমার এত বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা চাকরি পাবে না সেখানে?
এই প্রথম একটু আশার কথা শুনল যেন। আর তারপর সুবীরকান্ত যে প্রস্তাব দিল, ভাবতে গেলে সেটা রোমাঞ্চকরই বটে। সুবীরকান্ত পরামর্শ দিল, একটা কাজ যদি করো তো দেখবে এই বদলিটা আমাদের কাছে আশীর্বাদই হয়েছে। কলকাতায় গিয়ে ঘরে বসে দুটো বছর পড়াশুনা করে এম. এ.-টা পাশ করে নাও। স্কুল ছেড়ে তখন কোন কলেজেই চাকরি পেয়ে যাবে…আর মেয়েটাও ততদিনে একটু বড় হবে।
বরাবর উঁচু দিকে দৃষ্টি রাখির, তাই শোনামাত্র উৎফুল্ল। কিন্তু পরক্ষণে নিজের ওপর অনাস্থা।-হ্যাঁ, এতকাল বাদে আবার আমি করব এম. এ. পাশ, তাহলেই হয়েছে!
মুখে বললেও এ সম্ভাবনাটা একটা বড়গোছের আশার মতই মনের কোণে লেগে থাকল। তবু যাবার আগে তার মন-খারাপ। খুঁতখুঁত করে বলল, এই মেয়েটাই অপয়া, আসতে না আসতে আমার চাকরিটা গেল!
.
কলকাতায় এসে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু। আড়াইখানা ছোট ঘরের ফ্ল্যাট নিয়েছে একটা। তারই ভাড়া এককাড়ি। গোড়ায় গোড়ায় রাখি আবার চিন্তা করেছে –চলবে কী করে?
–ঠিক চলবে, কিছু ভেবো না। সুবীরকান্তর সেই এক কথা।
চলে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু রাখির মনে মনে বাসনা, আর একটু ভালো চললে ভালো হত। ভিতরে ভিতরে সেই ভালো দিনে পদার্পণের সঙ্কল্প নিয়েই এম, এ, পড়ার জন্য প্রস্তুত হল সে।
আলাপ-আলোচনা করে ইকনমিক্স-এ এম. এ. পড়া সাব্যস্ত হল। বি. এ.-তে এই বিষয়টা ভালই লাগত তার। এ ব্যাপারে সুবীরকান্তরও উৎসাহ কম নয়। বই-পত্র সংগ্রহ করে দিল। তার কলেজের ইকনমিক্স-এর এক তরুণ লেকচারারকে বাড়িতে এনে হাজির করল। সুদর্শনা ছাত্রী-বউদিকে সে যথাসাধ্য সাহায্য করবে সানন্দে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল।
সুবীরকান্ত বলল, খুব বিদ্বান ছেলে, যতখানি পারো আদায় করে নাও।
রাখি ধরেই নিয়েছে তার এম. এ. পাশের রাস্তা সুগম। মনের আনন্দে তাই ঠাট্টা করেছে, বেশি আদায় করতে গেলে সেও যাদি কিছু আদায় করতে চায়?
অরসিক স্ত্রীর কাছে সুবীরকান্তও নয়। পাল্টা ঠাট্টা করেছে, গুরু যখন, চাইলে কী আর করা যাবে…কিন্তু খুব গোপনে, আমি যেন জানতে না পারি।
রাখির ভালো পাশ করার ইচ্ছে, যত, ধৈর্য তত নয়! বেশি পড়াশুনার নামে তার হাঁপ ধরে যায়। বিশাল সমুদ্র সে পার হবে কী করে, বই-পত্র খুলে এক-একসময় গালে হাত দিয়ে তাই ভাবে। ভাবতে ভাবতে অসময়ে ঘুম পেয়ে যায়। তারই ঘরের লোক বিনা উদ্দেশ্যেও অত পড়ে কী করে সেটা তার কাছে এখন এক বিস্ময়। বইগুলো বোঝার মত ঠেকে। মন হালকা করার জন্যে বিকেলের শোযে দুজনের সিনেমার। টিকিট কেটে বসে। সুবীরকান্ত কখনো বিরক্ত হয়, কখনো হাসে।এভাবে চললেই পাশ করা হয়েছে আর কী!
রাখি রেগে যায়, না হয় না হবে, আর পারিনে বাপু, কেবল মাস্টারি! কখনো বলে, আমার দ্বারা কিছু হবে-টবে না, আমার জন্যে তুমি একটা স্কুল-মাস্টারিই দেখো।
সুবীরকান্ত সে-কথা কানে তোলে না। পড়ার তাগিদ দেয়। ফাঁক পেলেই রাখি মেয়ের ঘাড়ে দোষ চাপায়, ওর জন্যে পড়াশুনা হচ্ছে না। মেয়ের জন্যে ওদিকে সর্বক্ষণের ঝি আছে একটা। আর বাপের আদুরে মেয়ে, বাপকে দেখলেই তার কোলে চেপে বসে থাকে। তাই ওর জন্যে পড়া কেন হয় না সুবীরকান্ত ভেবে পায় না। তা ছাড়া ঠিকে-চাকর আছে একটা, দুবেলার রান্না আর বাড়ির কাজ সে-ই করে দিয়ে যায়। এসব ব্যবস্থার ফলে প্রতি মাসেই খরচের টানাটানি। কিন্তু পারতপক্ষে সুবীরকান্ত তা জানতে দেয় না।
দ্বিতীয় বছরের কয়েকটা মাস কেটে যেতে রাখি একদিন হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল। পড়া কিছুই এগোয়নি, কী করে পরীক্ষা দেবে!
