সাব্বির খানঃ তাহলে ডঃ হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন?
হুমায়ুন আহমেদঃ কারন যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিৎ যে, যে-কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয়না।
সাব্বির খানঃ ঠিক একই কারনে কি তাসলিমা নাসরিন দেশ থেকে বিতাড়িত?
হুমায়ুন আহমেদঃ হ্যাঁ, হয়তোবা।
সাব্বির খানঃ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেশ-দ্রোহীর মামলার মাথায় নিয়ে মৃত্যু বরন করেছেন। ওঁনার অপরাধ কি ছিলো? আপনি কেমন বোধ করেন এব্যাপারে?
হুমায়ুন আহমেদঃ ওনাকে তো কেউ খুন করেনি। উনিতো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ওঁনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহীর কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তার বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহীর মামলা করা হয়নি। তাছাড়া সমস্ত ব্যাপারটাই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, সমস্তটাই ছিল একটা সাজানো খেলা। এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নাই। মৌলবাদীরাতো কতবার আমাকে মুরতাদ বলেছে, তাতে কি আমি মাথা ঘামিয়েছি কখনো? কখনোই না।
সাব্বির খানঃ আপনি কি সমাধীকারে বিশ্বাস এবং নিজের জীবনে চর্চা করেন?
হুমায়ুন আহমেদঃ অবশ্যই। এটা বাংলাদেশে সবাই করে। বিশেষ করে আজকালকার অফিস আদালতের দিকে তাকালে প্রচুর মেয়েদের দেখা যায়, যা পূর্বে ছিলনা। আমি নিজেওতো আমার স্ত্রীর সাথে পরামর্শ না করে কিছু করিনা। তার মতামতের যথেষ্ঠ গুরুত্ব আমি দেই।
সাব্বির খানঃ আপনার নিজের ব্যাপারে কি শুনতে আপনার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে?
হুমায়ুন আহমেদঃ আমার ব্যাপারেতো আমি খারাপ কিছু শুনিনা। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি বলে যে, আপনার এই বইটা খুব একটা সুবিধার হয় নাই, তাহলে খারাপ লাগে। পরচর্চাও খারাপ লাগে। আমি নিজেই তার শিকার হয়েছিলাম যখন একটা ফ্যামিলি ছেড়ে দিয়ে, নতুন একটা ফ্যামিলি শুরু করলাম, তখন এরকম হয়েছিল।
সাব্বির খানঃ আপনি কেমন আছেন স্যার?
হুমায়ুন আহমেদঃ আমি ভালো, আমি খুব ভালো আছি।
সাব্বির খানঃ আপনি কি সুখী? আপনার সংসার কেমন চলছে?
হুমায়ুন আহমেদঃ হ্যাঁ, আমি ১০০% সুখী। আমার সংসার ভালো চলছে। আমার সংসার ভালো না চললে কি আমি আমার স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে বাইরে ঘুরতে আসতাম! আমার বড় ছেলেটিও আমার সাথে এসেছে।
সাব্বির খানঃ স্যার, আপনি অনেক সময় দিয়েছেন আমাকে আজ। আমার এবং দৈনিক সমকালের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই এবং আপনার সুখী-সমৃদ্ধ জীবন কামনা করি। ভালো থাকবেন।
হুমায়ুন আহমেদঃ তোমাকে এবং তোমার মাধ্যমে আমার পাঠকদের জানাই অনেক ধন্যবাদ।
[সংগ্রহ : আনোয়ার জাহান ঐরি, চলন্তিকা ডট কম।]
সাক্ষাৎকার – মার্চ, ২০০৭ – দৈনিক সমকাল
২০০৭ সালের ৩ মার্চে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় নূহাশ হুমায়ুন, গুলতেকিন ও হূমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করা হল। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও অনুলিখন করেছিলেন আরিফুর রহমান।
মা গুলতেকিনের সঙ্গে নূহাশ হূমায়ূন
চশমা পরা হ্যাংলা ফরসা ছেলেটাই নূহাশ, নূহাশ হূমায়ূন। পড়ে সানবিম স্কুলে নবম শ্রেণীতে। ওর বয়স এখন ১৫ বছর। অবসরে ছবি আঁকে, অ্যানিমেশন করে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, ছবি তোলে, গল্প লেখে, গান লেখে। এবারের বইমেলায় বেরিয়েছে নূহাশের প্রথম বই ‘ইকুয়েশন অব ফিহা’। ,বইটি সে ইংরেজিতে আনুবাদ করেছে যা বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ওর বাবা হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন। নূহাশ এবং তার বন্ধুরা বেশকিছু ত্রিমাত্রিক ছবিও নির্মাণ করেছে। সে খেলাধুলা করতে খুব একটা পছন্দ করে না। তার পড়তেও ভাল লাগে না। তবে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে ও খুব পছন্দ করে। নূহাশ ছবি আঁকছে দু’তিন বছর হলো। সে মূলত পেন্সিল স্কেচ করে। ওর ছবির বিষয় মানব শরীর।
আমার বইঃ ‘ইকুয়েশন অব ফিহা’ বইটা লেখা হয়েছিল ১৯৮১ অথবা ’৮২ সালে। কিন্তু পড়ে মনে হয় অনেক আধুনিক। আমি যখন বইটা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করছিলাম, তখন আমার প্রধান ভয়টা ছিল, বাংলাটা পড়ে যেমন চোখে পানি চলে আসে, ইংরেজিটা পড়েও কি চোখে পানি আসবে! তাই কয়েক পৃষ্ঠা লিখেই আমি বাবার কাছে লেখাগুলো নিয়ে যাচ্ছিলাম প্রায় প্রতিদিন। বাবা দেখে তার মতামত জানাচ্ছিলেন। পড়তে পড়তে বাবা এক সময় বললেন, ‘এখন তো আমি আর তোমার প্রুফ রিডার না। আমি পড়ে তো আর ভুল ধরতে পারছি না। আমি গল্পের ভেতর পুরো ঢুকে গেছি।’ এটা শুনে আমার খুব ভাল লাগল। মনে হলো, আমি সফল হয়েছি ।
আমার আছেঃ আমার অনেক ধরণের সংগ্রহ আছে। আমার সংগ্রহে আছে অনেক বড় বড় রোদ চশমা, যা কেউ পরে না। আছে মজার কিছু মুখোশ । এর কিছু বাবা দিয়েছেন, কিছু আমি কিনেছি। একটি কঙ্কাল আছে, আমার খুব প্রিয়। আমরা বন্ধুরা মিউজিক নিয়ে এক সঙ্গে অনেক কাজ করি। আমাদের সিনেমায় ব্যবহার করার জন্য আমরা কিছু গান লিখেছি। আমি সব ধরনের গানই শুনি। তবে প্রোগ্রেসিভ রক বেশি শুনি। মাঝে মাঝে পপ অথবা হেভি মেটালও শুনি। বাংলা গান তেমন শোনা হয় না। নতুন একটা সিনেমা করছি ‘কোকিল’। আর বাবার লেখা বই গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা একটা বই আমার এত ভাল লাগবে, আমি কখনো ভাবিনি। অন্যগুলোর মধ্যে ময়ুরাক্ষী আমার অনেক মজা লেগেছে। মিসির আলীর বইগুলো ভাল লাগে। কারণ এগুলো পড়লে বোঝা যায়, অনেক চিন্তা-ভাবনা করে লেখা। মন খারাপ থাকলে হিমু পড়তে ভাল লাগে।
