বিরাট বিরাট রান করে সেক্রিকেটের প্রকৃতিটাই বদলে দেয়। ব্র্যাডম্যান-পূর্ব আমলে ক্যাপ্টেনরা ফিল্ড সাজাতেন এবং বোলাররা বল করতেন উইকেট লাভের উদ্দেশ্য নিয়ে। ব্র্যাডম্যান আসার পর তাঁরা মনোনিবেশ করলেন রান ওঠা কমাবার চেষ্টার দিকে, আউট করার দিকে নয়। এই পরিবর্তনে খেলা মন্থর হয়ে পড়ে। অন্যদের মতো ডনও এতে ব্যথিত হয়।
এগারো বছর বয়সে ক্রিকেটে ডনের নাটকীয়ভাবে প্রবেশের পিছনে যে-জিনিসটি কাজ করেছে, সেটি হল তার নি:সঙ্গতা।
নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজধানী সিডনির প্রায় দুশো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে কুটামুন্ড্রা নামে একটা গ্রামে ১৯০৮-এর ২৭ আগস্ট ডনের জন্ম। যখন তার বয়স তিন, তাদের পরিবারটি চলে আসে সিডনির ৮০ মাইল দক্ষিণে, প্রায় তিন হাজার লোকের বাস বাওরাল নামে এক গ্রামে। কুটামুন্ড্রা ও বাওরাল কৃষি অঞ্চলের গ্রাম।
ডন তার পরিবারে কনিষ্ঠতম সন্তান। বাবা জর্জ ব্র্যাডম্যান, মা এমিলি, তিন দিদি আইলেট, লিলি এবং মে; দাদা ভিক্টর ডনের ঠিক উপরে, চার বছরের বড়ো। ওদের বাড়ির কাছাকাছি ডনের সমবয়সি কোনো ছেলে ছিল না, ফলে স্কুলের সময় ছাড়া ডনকে বাকি সময় একাই কাটাতে হত।
তার বাবা, দাদা এবং দুই মামা ক্রিকেটের ভক্ত ছিলেন। ক্রিকেটের প্রতি আসক্তিটা ডন এঁদের কাছ থেকেই পায়। কিন্তু তাঁদের এমন সামর্থ্য ছিল না যে, ডনকে ক্রিকেটের সরঞ্জাম বা খেলা শেখার বই কিনে দিতে পারেন।
তাই ডনের সময় কাটানোর উপায় ছিল একা একা ক্রিকেট খেলা। খেলাটা নিজেই বার করেছিল।
বাড়ির পিছনে ইটের দুটো ছোটো থামের ওপর একটা ৮০০ গ্যালনের বড়ো জলের ট্যাঙ্ক ছিল, তার তিন দিকে গোলাঘরের দেওয়াল। উপরে ছাদ, বর্ষা হলেও খেলা যেত। একটা পুরোনো গলফ বল দেওয়ালে ছুড়ত, দেওয়াল থেকে ফেরার সময় ডন বলটাকে একটা ছোটো ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে মারার চেষ্টা করত। ইটের দেওয়ালে ছোড়া গলফ বল খুব জোরেই ফিরে আসে। সুতরাং ডন যা করার চেষ্টা করত, সেটা সহজ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু দিনের পর দিন চেষ্টা করে নি:সঙ্গ ডন এই খেলায় সড়োগড়ো হয়ে ওঠে।
তিন দিকে দেওয়াল এক দিকে খোলা, তাই লেগের দিকে ঘুরিয়ে যতদূর সম্ভব ততদূরে বল মারতে পারত। একা একাই ডন ম্যাচ খেলত আর দলের এগারো জনের প্রত্যেকের হয়ে ব্যাট করত। দলে থাকত তার হিরোরা, অস্ট্রেলিয়ার সেই আমলের ক্রিকেট তারকারা : চার্লি ম্যাকার্টনি, জনি টেলর, জ্যাক গ্রেগরি, কলিন্স প্রভৃতিরা।
দেওয়ালে বল মেরে খেলায় পোক্ত হয়ে যাওয়ার পর ডন খেলাটাকে আরও কঠিন করার একটা উপায় বার করে। বাড়ির কাছে লোহার রেলিং-ঘেরা একটা ছোটো গোচারণ ভূমি ছিল। গলফ বলটাকে সেতিরিশ বা চল্লিশ ফুট দূরে থেকে রেলিংয়ে ছুড়ত আর ফিরতি বলটাকে লোফার বা মারার চেষ্টা করত। এজন্য প্রচন্ড নিখুঁত ও নির্ভুলভাবে তাকে ছুড়তে হত, যাতে বলটা তার দিকেই আসে; বলটা যখন আচমকা সামনের দিক থেকে আসে, তখন সেটা লোফার জন্য তীক্ষ্ণ আন্দাজ করতে ও শরীরটাতে লহমায় গতিসঞ্চার করতে হত।
ডন নিছকই পরিবেশের চাপে, চোখ ও কবজিকে প্রশিক্ষিত করার, সময়বোধ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংযুক্ত চালনা নিখুঁত করে তোলার অদ্ভুত এক পদ্ধতি বার করে ফেলে। সন্দেহ নেই, বাওরালে বাড়ির পিছনে ডন যে-দক্ষতা অর্জন করে, তার সঙ্গে তার মেধা এবং একাগ্রতা যুক্ত হয়ে তাকে ক্রিকেটের সবথেকে ওস্তাদ ব্যাটসম্যানে, নিরাপদতম ফিল্ডারদের একজনে পরিণত করে।
০২. প্রথম শতরান
বারো বছর বয়সে ডন ব্র্যাডম্যান বাওরাল হাই স্কুলের প্রথম টিমের কনিষ্ঠতম সদস্য হয় এবং ‘সত্যিকারের’ পিচে জীবনে প্রথম খেলতে নামে। অস্ট্রেলিয়ার জেলাগুলিতে যেরকম পিচ হয়ে থাকে কংক্রিটের ওপর ম্যাটিং ঢাকা। সিডনিতে এসে গ্রেড ক্রিকেট খেলার আগে পর্যন্ত ডন কখনো ঘাসের পিচে খেলেনি। অস্ট্রেলীয় আবহাওয়ায় ঘাসের পিচ রক্ষণাবেক্ষণের যা খরচ, গ্রামের ক্লাবগুলির পক্ষে তা সামলানোর সাধ্য ছিল না।
প্রথম একাদশের পক্ষে প্রথম খেলাতেই ডন মিটাগং স্কুলের বিরুদ্ধে শতরান করে। মোট ১৫৬ রানের মধ্যে ডনের রান ১১৫ নট আউট। বলা বাহুল্য, ডন খুশিতে ডগমগ। পরের দিন হেড মাস্টারমশাই গোটা টিমটাকে মাঠে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘কাল তোমাদের মধ্যে একজন শতরান করেছে শুনলাম। ভালো কথা, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, খেলতে গিয়ে সেখানে স্কুলের একটা ব্যাট ফেলে রেখে দিয়ে আসতে পার।’ ডনের শতরানটা একদমই মাঠে মারা যায়।
ডন স্কুলের হয়ে আর একটি মাত্র খেলায় নেমেছিল। রান ছিল ৭২ নট আউট। অর্থাৎ আউট না-হয়ে ১৯৭ রান করে দুটি খেলায়। আজকের দিনে হলে নিশ্চয়ই এইরকম ছেলে সঙ্গে সঙ্গে স্কুল কোচ বা গেমস মাস্টারের নজরে পড়ত এবং তার খেলার বিকাশ যাতে ঘটে তার ব্যবস্থা হত। কিন্তু ডনের আমলে স্কুলে স্কুলে তখন খেলা নিয়ে এখনকার মতো মাতামাতি ছিল না।
ক্রিকেট সবচেয়ে প্রিয় হলেও ডন কিন্তু স্কুলের হয়ে টেনিস ও রাগবি খেলেছে আর অ্যাথলেটিকসে ১০০ গজ থেকে আধ মাইল পর্যন্ত সব ক-টি পাল্লার দৌড় চ্যাম্পিয়ন হয়। গ্রামের ছেলেদের মতোই সেঅনেক দূর দূর হেঁটে শিকার করত, নদীতে মাছ ধরত। সাঁতার শিখতে গিয়ে দু-বার প্রাণান্তকর ব্যাপার ঘটায় আর জলে নামতে যায়নি, পড়ার মধ্যে অঙ্কটাই ডনের ভালো লাগত, তারপরই বিজ্ঞান।
