গ্রামের নিপুণ শিল্পীরা নানা রকমের জিনিস তৈরী করে থাকে। স্ত্রীলোকেরা মিহি সুতা কেটে এবং তস্তুবায়রা তা দিয়ে সুক্ষ্ম বস্ত্র বয়ন করে। স্বর্ণকার, লৌহকার, চর্মকার আপন আপন শিল্প দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে। রাজপ্রাসাদের কলাচার্তুর্ধময় আসবাবাপত্রের নির্মাতারা এদেরই আত্মীয়স্বজন। কিন্তু যখন আমি এদের দেহ এবং বাসগৃহের অবস্থা দেখেছি তখন বুঝতে পারি, এদেরই আত্মীয়স্বজন। কিন্তু যখন আমি এদের দেহ এবং বাসগৃহের অবস্থা দেখেছি তখন বুঝতে পারি, এদেরেই হস্তনির্মিত দ্রব্যসম্ভার এদের কাছে স্বপ্নময় স্বরূপ। এদের তৈরী শিল্প সামগ্রী গ্রাম থেকে নগর-শহরের সৌধ, প্রাসাদে চলে যায়। আবার সেখান থেকে অনেকে পশ্চিম সমুদ্রতীর ভরূকচ্ছ, আদিতীর্থ হয়ে পারস্য বা মিশররে পথ ধরে, অথবা পূর্ব সমুদ্রতীরে তাম্রলিপ্ত হয়ে যবদ্বীপ, সুবর্নদ্বীপ পৌঁছে যায়। ভাতরে সামুদ্রিক বাণিজ্য এত শক্তিশালী কোনোদিনই হয়নি, এবং আপন পণ্যের বিনিময়ে সমুদ্রপারের লক্ষ্মীও এত বেশী কখনও ভারতে আসেনি, কিন্তু এতে লাভ কার? সকলে চেয়ে বেশী গুপ্তরাজাদের, তারা সকল পণ্যের ওপর অত্যধিক শুল্ক আদায় করে; তাপরপ সামন্ত প্রভুদের মধ্যে যারা বড় বড় রাজপদ বা জায়গীরের অধিকারী, তার কারিগর এবং ব্যবসাদার দু’য়ের কাছে থেকেই লাভের অঙ্ক লোটে। ব্যবসাদারদের নাম সবশেষে করলেও এই তারাও লণ্ঠন-কর্মে নেহাত ছোট অংশীদার নয়। এদের সবাইকে দেখে আমার কাছে এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে, গ্রামের কৃষক এবং কারিগরেরা এত গরীব কেন, এবং ছোট-বড় রাজপথ সমূহকে সুরক্ষিত রাখবার জন্য গুপ্তরাজাদের এত তৎপরতাই বা কেন? গ্রামে দারিদ্র্য আছে ঠিকই, তবে শহরের মতো হৃদয়-বিদারক দৃশ্য গ্রামে কমই দেখা যায়। এখানে পশুর মতো ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য দাসদাসিদের হাট বসে না, ওদের নয় শরীরে চাবুকের দাগ চোখে পড়ে না। আমার গুরু কালিদাস কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, পূর্বজন্মের কর্মফলস্বরূপ লোকে দাস হয়। যেদিন তাঁর মুখে আমি এই কথা শুনি সেইদিনই পূর্বজন্ম সম্বন্ধে আমার সমস্ত বিশ্বাস উবে গেল। গুপ্তরাজারা যেভাবে ধর্মকে সকল রকমে আপন অস্তিত্ব দৃঢ় করবার কাজে লাগিয়েছে , তাতে এখন সকল চিন্তাশীল লোকেই মনেই এই অবিশ্বাস আসা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন আমি সাধারণ প্রজাদের দেখতাম, তাদের এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন মনে হত—কেন? সম্ভবত তারা নিজেদের অসহায় মনে করত। গ্রামবাসীরা শুধু আপন গ্রামের খোঁজ-খবরটুকু রাখত—গ্রামের অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ জমির জন্য তারা যে ভাবে লড়াই করত সম্ভবত কুমারগুপ্তও নিজের কোনো প্রদেশের জন্য এত বিক্রমের সঙ্গে লড়তে পারত না। কিন্তু গ্রামের সীমার বাইরে যাই ঘটে থাক, িএরা তার কোনো খাঁজ রাখত না। একিট গ্রামের ঘটনা আমার মনে আছে। সেখানে প্রায় চল্লিশটি কুটির ছিল, সবই খড়ের ছাউনি। গরমের দিনে উনুন থেকে একটা ঘরে আগুন লেগে যায়। সারা গ্রামের লোক জল নিয়ে সেই ঘরের দিকে দৌড়ে গেল। কিন্তু একটি ঘরের এক দম্পতি ঘড়ায় জল ভরে আপন ঘরের কাছে বসে রইল। সৌভাগ্য-বশত গ্রামে এম গ্রত ঐ একটিই ছিল, না হলে গ্রামের একটা ঘরও সেদিন রক্ষা পেত না। সে সময় আমার যৌধেয় গণ-রাজ্যের কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে রাষ্ট্রের সকল লোক আপন রাষ্ট্রের জন্য জীবন-মরণ পণ করতে কুণ্ঠিত হত না। এমনিতেই তো সমুদ্র গুপ্ত, চন্দ্রগুপ্ত, কুমারগুপ্তের দিগ্বিজয়ের জন্য লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু সে শুধু দাসের মতো অপরের লাভের জন্য—স্বাধীন মানুষের মতো নিজের এবং নিজ নিজ জনগণের হিতার্থে নয়।
জনসাধারণের মধ্যে মাত্র একশ’ বছরের এই ুপ্তশাসনের প্রভাব লক্ষ্য করে আমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল । আমি ভেবে দেখলাম, ুদি এমন শাসন-ব্যবস্থা কয়েক শতাবঈ ধরে চলে, তবে এই দেশ সম্পূর্ণভাবে দাসের দেশে পরিণত হবে। যারা শুধু আপন রাজার জন্যই রড়তে-মরতে জানবে, যাদের মন থেকে এ চিন্তা বিলুপ্ত হবে যাবে যে, সব মানুষেরই কিছেু অধিকার আছে।
অচিন্ত্যবিহার বড়ই রমণীয়্ অর্ধচন্দুাকার নদীপ্রবাহ হরিৎবসনা পাহাড়ী উপত্যকার পাশ কেটে বয়ে চলেছে। এই ক্ষুদ্র অথচ সদানীরনা পাহাড়ী নদীর বামসতটে অবস্থিত পাহাড় কেটে শিল্পীরা কত গুহাময় সুন্দর মন্দির, নিবাসস্থল এবং সভাগৃহ রৈী করেছে। এই সব গুহাভ্যন্তরেও রাজপ্রাসাদের মতো চিত্র মুর্তি ইত্যাদি সজ্জিত-যদিও তা বহু পুরুষের পরিশ্রমের ফলে এবং সম্ববত আগামী কয়েক শত পুরুষের জন্য্। চিন্ত্য-বিহারের ভিত্তি-চিত্র সুন্দর, মর্মর-শিল্প সুন্দর । কিন্তু এগুলো গুপ্ত রাজপ্রাসাদের প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়াতে পারে না, আর সে জন্য আমাকে তত আকর্ষণও করে না। হ্যাঁ, আমার কাছে আকর্ষণ ছিল এখানকার ভিক্ষুমন্ডুলী। দেশ-দেশান্তরের লোক প্রেমভাবে এক হয়ে এক পরিবারের মতো বাস করছে এখানে আমি সুদুর চীনের ভিক্ষুদের দেখেছি, পারসিক এবং যবন ভিক্ষুদের দেখেছি, সিংহল, যব এবং সুবর্ণদ্বীপের লোকও এখানে যথেষ্ট রয়েছে। চম্পাদ্বীপ, কম্বোজদ্বীপের নাম আমি এখানে এসেই শুনলাম এবং তাদের প্রাণবান অধিবাসীরে স্বচক্ষে দেখলাম; কপিসা, উদ্যান, তুষার এবং কুচা-র কাষায়ধারী পীতকায় ভিক্ষুদেরও এখানে দেখলাম; বাহিরের দেশগুলো সম্বন্ধে জানবার আমার প্রবল আকাঙ্কা ছিল। যদি এই সব বিদেশী ভিক্ষুদের পৃথক পৃথক সময়ে পেতাম, তবে তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমি এক একটি বছর কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু এক সঙ্গে এত অধিক সংখ্যায় সমবেত ভিক্ষুমন্ডলীর মধ্যে –বিপুল ভৈবববের মাঝে পড়া দরিদ্রনিধির মতোই আমি নিজেকে অসহায় মনে করতে লাগলাম!
