“কিন্তু রাজা বিষ্ণুর অংশবিশেষ।”
“কুমার গুপ্ত নিজের সঙ্গে ময়ুরের চিত্র অস্কিত করবে এবং আগামী দিনের কোনো কবি তাকে কুমারের অবতার বলবে। এই ধোকাবাজী, এই বিকৃতি কিসের জন্যে? সুস্বাদু, দুগ্নধ চাল, আর মধুর মাংসসৃপের জন্যে, রাষ্ট্রের সমস্ত সুন্দরীকে আপন প্রমোদপুরে ঢুকাবার জন্যে, কৃষি আর শিল্পকর্মে নিষ্পেষিত মানুষের কষ্টোপার্জিত অর্থ আপন ভোগসুখে জলের মতো খরচ করবার জন্যে? আর এ জন্য আপনি গুপ্তদের ধর্ম-সংস্থাপক বলছেন!বিষ্ণু? হ্যাঁ, গুপ্তরা নিজেদের বৈষ্ণব বলে প্রচার করছে। ব্রাক্ষণেরা তাদের বিষ্ণুর অংশ বানাচ্ছে। মুদ্রার ওপর লক্ষীর মুর্তি অস্কিত করা হচ্ছে। বিষ্ণুর মুর্তি আর মন্দির তৈরীর জন্যে প্রজাদের তাতে মেরে, তাদের সর্বস্ব লুট করে প্রচুর টাকা খরচ করা হচ্ছে এই আশায় যে, গুপ্তবংশের রাজ্বত্ত অন্তকাল ধরে কয়েম থাকবে।”
“এ সব তুমি কি বলছ সুপর্শ! রাজার বিরুদ্ধে এত কঠোর কথা কেন বলছ?”
“হ্যাঁ আচার্য আজ আপনার সামনে বলছি, কোনোদিন পরমভট্টারক সহারাজের সামনেও বলব। জীবিতবস্থায় আমার পক্ষে এই ধোঁকাবাজী বরদাস্ত করা মুস্কিল। তবে এ ভবিষ্যতের কথা, কিন্তু আমি চাই আপনিও অশ্বঘোষের পদাস্ক ানসরণ করুন।”
“আমি নিছক কবি; অশ্বঘোষ কবি এবং মহাপুরুষ দুই-ই ছিলেন। তাঁর কাছে সংসারের সুখভোগের কোনো মূল্য ছিল না, আমি চাই বিক্রমাদিত্যের প্রমোদশালায় সুন্দরীদের মতো সুন্দরী, চাই রক্তবর্ণ দ্রাক্ষাসুরা, চাই প্রাসাদ এবং পরিচারক। আমি কেমন করে অশ্বঘোষ হতে পারি? আমি ‘রঘুবংশ’—এ ছদ্মনামে আমি গুপ্তবংশেরই প্রশংসা করেছি, যাতে প্রসন্ন হয়ে বিক্রমাদিত্য এই প্রসাদ দিয়েছেন, কাঞ্চনমালার মতো যবনসুন্দরী আমাকে প্রদান করেছেন—পনেরো বছর আমার সঙ্গে থেকে ও যে আমাকে তার সোনালী কেশ-পাশে বেঁধে রেখেছে। আমি এখন ‘কুমারসম্ভব’ রচনা করছি, দেখ এ কাব্য আরও কত কি এনে দেয় আমার হাতে।”
“আমি বিশ্বাস করি না আচার্য, আপনি যদি ‘বুদ্ধ-চরিত’ সৌন্দরান্দ’ লিতেন তবে আপনাকে বভুক্ষায় মরতে হত বা সর্বোতোভাবে ভোগসুখ থেকে বঞ্চিত হতেন। এ আপনার ভুল ধারণা, যে রাজার ক্ষতি না করলে আপনার জীবন সম্পূর্ণ রিস হয়ে যাবে। আগামী দিনের কবিদের জন্য আপনি অত্যন্ত কু-উদাহরণ রেখে যাচ্ছেন। সকলেই কবি কালিদাসকে অণুকরনের নামে নিজেদের দোষ ঢাকতে চাইবে।”
“মহৎ কাব্যও আমি রচনা করব।”
“কিন্তু এমন কিছুই লিখবেন না যাতে গুপ্তদের ভ্রষ্টাচার লোকে জানতে পারে।”
‘সে আমার দ্বারা হবে না সুপর্ণ, আমি বড় নরম হয়ে পড়েছি।”
“রাজানুষ্ঠি সকল পাপের সপক্ষে ধর্মের দোহাই তো দেবেন?”
“তারও প্রয়োজন আছে। এ ছাড়া রাজশক্তি দৃঢ় হতে পারে না, বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রও এ ধরনের কাজ করা প্রয়োজন মনে করেছিলেন।”
“বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রও কবি কালিদাসের মতো প্রাসাদ এবং সুন্দরীর লোভে এই পাপ-পথে পা বাড়িয়েছিলেন।”
“সুপর্ণ, পুথিগত বিদ্যা ছাড়াও শুনলাম, যুদ্ধবিদ্যাও তুমি আয়ত্ত করেছ, যদি তোমার সম্মতি থাকে তবে মহারাজাধিরাজকে বলি। তোমাকে কুমারামাত্য বা সেনানায়কের পদে অভিষিক্ত দেখলে খুশী হব আমি, মহারাজাও খুশী হবেন।”
“আমি কারও কাছেই নিজেকে বিক্রয় করব না আচার্য।”
“আচ্ছা, রাজপুরোহিতের মধ্যে একটা স্থান যদি পাও?”
“ ব্রাহ্মণদের স্বার্থপরতায় আমার ঘৃণা ধরে গেছে।”
“কি করবে তা’হলে?”
“আপাতত আরও বিদ্রঅর্জনের আমার বাসনা।”
৪
উচ্চয়িনীতে অবস্থানকালে আমি শুধু নিজের জ্ঞান-পিপাসা তৃপ্ত করবার সুযোগই পাইনি, সেই সঙ্গে বিস্তৃত এই সংসারকে জানবার সুযোগও হয়েছে। সেখানে থাকতে, কাছে থেকে সেই সঙ্গে বিস্তৃত এই সংসারকে জানবার সুযোগও হয়েছে। সেখানে থাকতে, কাছে থেকে আমি দেখেছি, কেমন করে ব্রাহ্মণেরা রাজার কাছে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের বিক্রয় করে দেয়। এমন একটা সময় ছিল যখন অপরে স্বীকার না করলেও ব্রাহ্মণত্বের গর্ব আমার প্রবল ছিল। গ্রাম ছেড়ে আসবার পর আমি খাঁটি যবনদের দেখলাম, যারা প্রায়ই ভরূকচ্ছ থেকে উচ্চয়িনী আসত। সেখানে তাদের বড় বড় পন্যশালা ছিল, আমি বছ শক, আভীর পরিবারে গিয়েছি, যাদের পূর্ব পুরুষেরা এক শতাব্দী আগে উজ্জয়িনী, লাট (গুজরাট) এবং সৌরাষ্ট্রের শাসক মহাক্ষত্রপ ছিল। পাকা নারঙ্গী রঙ-এর গাল, রোমহীন মুখমণ্ডল এবং গোলাকার আঁখিযুক্ত হুনদেরও আমি দেখেছি—যুদ্ধে অত্যন্ত নিপুণ, কিন্তু অন্যদিকে তেমন প্রতিভা নেই। এইসবব রকমারি মানুষজন দেখবার সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হল বৌদ্ধবিহার (মঠ), যা একাধিক সংখ্যায় উজ্জয়িনীর বহির্দেশে রয়েছে। আমার মাতুল-কুলের লোকেরা বৌদ্ধ ছিলেন, আর বহু নাগর-ভিক্ষু এইসব মঠে থাকতেন। এ জন্য আমাকে প্রায়ই সেখানে যেতে হত। ভরূকচ্ছতেও আমি একবার গিয়েছিলাম।
পুথি-পাঠ সমাপ্ত করে আমি দেশভ্রমণের সাহায্যে আমার জ্ঞান প্রসারিত করতে চােইলাম। এই সময় আমি জানতে পারলাম যে, বিদৃর্ভে অচিন্ত্যবিহার (অজান্তা) নামে এক প্রসিদ্ধ বিহার আছে সেখানে পৃথিবীর সকল দেশের বৌদ্ধ ভ্ক্ষিুরা এসে থাকেন। আমি সেখানে গেলাম।
এতদিন পর্যন্ত আমি যেখানেই গিয়েছি, আমার সঙ্গে প্রচুর সম্বল এবং সঙ্গী নিয়ে গিয়েছি। এই প্রথম বার আমি নিঃসহায় নিঃসম্বল অবস্থায় বেরিয়ে পড়লাম। পথে চোর-ডাকাতের ভয় ছিল না; গুপ্তদের এই ব্যবস্থার প্রশংসাই করতে হবে। কিন্তু গুপ্তশাসন কি দেশের প্রত্যেক পরিবারকে এতই সমৃদ্ধশালী করে রেখেছে যে, বাটপাড়ি, রাহাজানি সম্পূর্ণ উঠে গেল? গুপ্তরাজেরা কর আদায়ের ব্রাপারে পুর্বতন সকল শাসককেই হার মানিয়েছে। রাজপ্রাসাদ তৈরীর কাজে কখনও এত অর্থ ব্যয়িত হয়নি। পাহাড়, নদী, সরোবর এমন কি সমুদ্রকে সশরীরে উঠিয়ে এনে এরা আপন সুরম্য প্রাসাদের সংলগ্ন করে রাখবার প্রায়স পেয়েছে। এদের ক্রীড়া-উদ্যান সত্যিকারের বনের মতোই মনোরম। এখানে পিঞ্চরে আদ্ধ হিংস্র পশু আর খোলা জায়গায় হরিণের দল গুরে বেড়ায়। ক্রীড়াপর্বতের স্বাভাবিক পার্বত্য বন-উপবন, জলপ্রপাত তৈরী করা হয়েছে। সরোবরের সঙ্গে যুক্ত কৃত্রিম জলস্রোতের ওপর সেতু আর নৌকার বহর দেখা যা। হাতির দাঁত, সোনা, রূপা নানা রকম রেশমী বস্ত্র এবং মহার্ঘ গালিচার প্রাসাদের অন্তদেশে সজ্জিত রয়েছে। প্রাসাদকে সজ্জিত করতে চিত্রকর তার তুলির সৌন্দর্য সবটুকুই ঢেলে দিয়েছে। ভাস্কর তার মর্মর এবং ধাতু-নির্মিত মূর্তি সুন্দর রূপ বিন্যাস করেছে। বিদেশী যাত্রী এবং রাজদূতের মুখে আমি এই সব চিত্র এবং মূর্তির ভুরি ভুরি প্রশংসা শুনেছি, যাতে সত্যিই আমার শির গর্বোন্নত হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন আমি ক্ষুদ্র গ্রামের পর্ণ কুটিরের অবস্থা দেখি, তখন উজ্জয়িনী এই সব প্রাসাদ আমার দেহের রক্ত চঞ্চল করে তোলে! মনে হয়েছে, গ্রামের এই দারিদ্র্যের কারণ এইসব প্রাসাদ।
