আমি দিঙনাগের নাম শুনেছিলাম। কালিদাস নিজে গুপ্তরাজ, রাজতন্ত্র এবং তাদের পরম-সহায়ক ব্রাক্ষণ্য ধর্মের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। আর কি অভিপ্রায় থেকে তা ছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি। দিঙনাগকে তিনি তাঁর পরাক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করতেন। করতেন বলতেন, ‘ এই দ্রাবিড় নাস্তিকের সমনে শুধু বিষ্ণু নয়, তেত্রিশকোটি দেবতারই সিনংহাসন টলে ওটে । রাজা ও ব্রাক্ষণের স্বার্থরক্ষার জন্য ধর্মের নামে আমি যা কিছু কুটকৌশল বের করি, তার রহস্য তার কাছে অজ্ঞাত থাকে না। মুস্কিল এই যে, বৃদ্ব বসুবন্ধুর দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের রাজধানী অযোধ্যায় বছর কয়েক কাটিয়েছিলেন- রাজদরবারী হয়ে নয়, স্বাধীন, সম্মানিত শুরুর মর্যাদা নিয়ে। পরে গুপ্তদের নীচতায় নিরাশ হয়ে আপন জম্নভুমি পুরুষপুরে চলে যান।
লৌহ-তীর অথবা খড়গ নয়, তার চেয়েও তীক্ষ্ণ জ্ঞান এবং তর্কের অস্ত্র বিতরণ করবার ব্রত দিঙরাগ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ করলেই চোখের সামনে ব্রাক্ষণত্বের সমস্ত মায়াজাল তাসের ঘরের মতো ধ্বসে পড়ে। আমি ছয় মাস অচিন্ত্যবিহারে ছিলাম। প্রতিদিন দিঙনাগের মুখ থেকে তাঁর সর্বব্যাপী উপদেশাবলী শুনতাম। দিঙরাগের মতো শুরু পাওয়ায় আমার গর্বের শেষ ছির না। তাঁর জ্ঞান অত্যন্ত গভীর, আর বাক্য ছিল জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো। সংসারের বিস্তীর্ণ মায়াজাল দেখে আমার মতোই তিনিও ক্রোধোম্নত্ত হয়ে উঠতেন।
একদিন তিনি বলেছিলেন “সুপর্ণ প্রজাশক্তির সহায়তায় হয়ত কিছু করা যেত, কিন্তু জনসাধারণ এখন পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দুর চলে গেছ্ তথাগত জাতিবর্ণ-ভেদ উঠিয়ে দেওয়ার জন্য অতীব প্রয়াস করেছিলেন দেশের বাইরে থেকে যবন, শক, গুর্জর আভীর –যারাই আসত, ব্রাক্ষণরা তাদের ম্নেচ্ছ বলে ঘৃণা করত। কিন্তু তথাগতের সঙ্ঘ তাদের মানুষ বলেই স্বীকার করে নিত।কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মনে হয়েছিল. এ দেশ থেকে জাতিভেদ প্রথা মুছে যাবে কিন্তু ভারতের দুর্ভাগ্য যে গুপ্ত সম্রাটরা এখন ব্রাক্ষণদের খপ্পরে এসে গেছে। গুপ্তরা যখন প্রথম ক্ষমতায় এল, তখন ব্রাক্ষণরা তাদের ম্নেচ্ছ বলত। কিন্তু কালিদাস তাদের গৌরব বর্ধনের জন্য ‘রঘুবংশ’এবং ‘কুমারসম্ভব’ লিখলেন। গুপ্তরা আপন রাজবংশকে অনন্তকাল কায়েম রাখবার চিন্তায় পাগল হয়ে উঠেছে। ব্রাক্ষণরা তাদের এই আশায় ইন্ধন যোগাচ্ছে কিন্তু ভদন্ত বসুবন্ধু এমন কোনো আশা তাদের দিলেন না। তিনি লিচ্ছবী গণতন্ত্রের আদর্শে ভিক্ষুসঙ্ঘের অনুগামী ছিলেন। ব্রাক্ষণরা বৌদ্ধদের প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিদ্বন্ধী বলে মনে করে। তারা জনে, সারা দেশের বৌদ্ধরা গোমাংস খায়। এই জন্য ব্রাক্ষনরা ভারতে গোমাংস বর্জন, গো-ব্রাক্ষণ রক্ষার আন্দোলন সুরু করে। বৌদ্ধরা জাতিবর্ণ ভেদ তুলে দিতে চায়। ব্রাক্ষণরা তাই বর্ণবহির্ভুত যবন, শক ইত্যাদিকে উচ্চবর্ণে অভিষিক্ত করতে থাকে। এই ফাঁদ এত জটিল যে , অনেক বৌদ্ধ-গৃহস্থ এতে জড়িয়ে আছে। এইভাবে প্রজাদের শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে তারা রাজশক্তি এবং ব্রাক্ষণ-শক্তিকে দৃঢ় করতে চায়। কিন্তু এর পরিণাম আম্নঘাতী হবে সুপর্শ, কারণ দাসেদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।”
আমি আপন যৌধেয়কুলের আত্নোৎসর্গের কাহিনী বলাতে আেোর্ষের হুদয় অভিভুত হয়ে গেল। যখন আমি য্যেধেয় গণকে পুরনুজ্জীবিত করবার আপন ইচ্ছা তাঁর সামনে প্রকাশ করলাম, তখন তিনি বললেন, “আমার শুভেচ্ছা এব আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে রইল। উদ্যোগী প্ররুষসিংহের কোনো বিস্ন-বাধাকে ভয় করা উচিত নয়।”
তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে আমি চলছি যেধেয় রাজ্যাভিসুখে। তাদের মৃত গণ-রাজ্যকে গুনরায় উদ্ধার করব, না হলে বালুতটে অস্কিত পদচিহ্নের মতো মিলিয়ে যাব।
১৩. দুর্মুখ (কাল : ৩৬০ খৃষ্টাব্দ)
আমার নাম হর্ষবর্ধন, শীলাদিত্য বা সদাচারের সুর্ষ আমার উপাধি। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নিজে বিক্রমাদিত্য (পরাক্রমের সৃর্য ) উপাধি গ্রহণ করেছিলেন; আমি এই নম্র উপাধি গ্রহণ করেছি। বিক্রমে অপরকে দমন করে রাখার, অপরকে জয় করার চিন্তা পেয়ে বসে; শীল-সদাচারে কাউকেও দাবিয়ে রাখার বা কারও ওপর অত্যাচার করার চিন্তা মনে আসে না। গুপ্তরা নিজেদের পরম ষ্ণৈব বলত। আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাজ্যবর্ধন –যাঁকে গৌড়-শশাস্ক বিশ্বসঘাতকতা করে তারুণ্যেই হত্যা করে এবং যাঁকে স্মরণ করে আজও আমার হৃদয় অধীর হয়ে ওঠে-পরম সৌগত ( পরম বৌদ্ধ ) ছিলেন তিনি। সুগত ( বুদ্ধ ) যেমন ক্ষমা-মুর্তি ছিলেন, তিনিও তেমনি! নিজেকে সর্বদা তাঁর চরণসেবী মনে করেও আমি পরম মাহেশ্বর অর্থাৎ শৈব হওয়া পছন্দ করেছি। কিন্তু শৈব হলেম আমার হৃদয়ে বুদ্ধভক্তি প্রবল, শুধু এই ভারতেই নয়, ভারতের বহির্জগৎ ও এ কথা জানে।
আমি, আমার রাজ্যের সকল ধর্মকেই সম্মান করেছি-প্রজারজ্ঞনের জন্যই শুধু তনয়, আপন শীল ( সদাচার ) সংরক্ষণের জন্যেও। প্রতি পষ্ণম বৎকরে আমি রাজকার্যের উদ্বৃত্ত ধন প্রয়োগে ত্রিবেণী তীরে ব্রাক্ষণ এবং শ্রমণদের মধ্যে বন্টন করতাম। এ থেকে ও প্রমাণিত হবে, আমি সকল ধর্মের সমান সমৃদ্ধি কামনা করেছি। এ কথা সত্য যে, আমি সমৃদ্রগুপ্তের মতো দিগ্নিজয়ের জন্য যাত্রা করেছিলাম কিন্তু সে এই শীলাদিত্য নাম ধারণ করার পূর্বে। তাই বলে এই কথা ভাববেন না যে, যদি দক্ষিণাপথের রাজা পূলকেশীর বিরুদ্বে আমি অসফল না হতাম তবে বিক্রমাদিত্যের মতোই কোনো পদবী আমিও ধারণ করতাম। আমি সারা ভারতের সম্রাট হয়েও , চন্দ্রগুপ্ত নয়-অশোকের কলিঙ্গিবিজয়ের মতো পশ্চাতা্প করে শীলতা দ্বারা মানুষকে জয় করতাম- আমার প্রকৃতি এমনই বিনয়নম্র ও কোমল।
