“সৈন্য গণ-শাসন কেমন ছির দাদু?”
“সেই শাসনে প্রত্যেকটি যৌধেয় মাথা উঁচু করে চলত, কারও সমানে দীনতা প্রকাশ করতে তারা জানত না। যুদ্ধ তাদের কাছে একটা খেলাবিশেষ ছিল। এই জন্যই তাদের বংশের নাম যৌধেয় হয়েছে!”
“আমাদের মতো আরও কোনো যৌধেয় পরিবার এমনি রয়ে যায়নি?”
“হ্যাঁ আছে-হাওয়ায় উড়ে-যাওয়া শুকনো পাতার মতো ছড়িয়ে।”
“আর আমাদের মতো কেউ নাগর-বংশের সঙ্গে মিলে-মিশে আত্নবিস্থত হয়ে পড়েনি? তা’ছাড়া আমরা নিজদের ব্রাক্ষণ বলি কেন দাদু?”
“সে আরও প্রাচীন কথা ভাই। প্রথমে সর্বত্রই গণরাজ্য ছিল-রাজা বলে কিছুই ছিল না। সে সময় ব্রাক্ষণ আর ক্ষত্রিয়ের মাঝে কোনো প্রভেদ ছিল না।”
“ব্রক্ষ-ক্ষত্র একই বর্ণ ছিল দাদু?”
“হ্যাঁ, যখন প্রয়োজন হত লোকে পূজা-পাঠ করত, এবং প্রয়োজন মতো অস্ত্র ধরত। কিন্তু পরে বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ এরা এসে বর্ণবিভাগ সুরু করল।”
“ঠিক কথা, তাই তো এক পিতার দুই পুত্রের মধ্যে কেউ রন্তিদেবের মতো ক্ষত্রিয়, কেউ গৌরিথীতির মতো ব্রাক্ষণ ঋষি হতে লাগলেন।”এমন কথা কোথাও কউ লিখেছে ভাই?”
“হ্যাঁ দাদু, বেদ এবং ইতিহাসে এমন কথা পাওয়া যায়। সংকৃতি ঋষির ঐ দুই পুত্র ছিল। এরও কত বিচিত্র কথা পুরাণে পাওয়া যায়, যে সব কথা আজকালকার লোকে বিশ্বাস করে না। চর্মবতীর (চম্বল) তীরে দশপুর দেখেছ দাদু?”
“হ্যাঁ, অবন্তী (মালবা )কতবার গিয়েছি; ওখানেই তো?সেখানে আত্নীয়-স্বজনের বিয়ে উপলক্ষে কতবার না আমি গিয়েছি। ওখানে অনেক ঘর নাগর আছে, আর তাদের ভিতর অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী আছে!”
“এই দশপুর রস্তিদেবের রাজধানী ছিল। আর চর্মণবতী নাম কি করে হল সে এক আশ্চর্য কাহিনী। ব্রাক্ষণ সংকৃতির পুত্র, কিন্তু নিজে ক্ষত্রিয় রাজা রস্তিদেব অতিথিসেবার জন্য খুব প্রসিদ্ধ ছিল। সত্যযুগের ষোলো জন মহান রাজার মধ্যে একজন। রস্তিদেবের ভোজনশালার জন্য প্রতিদিন দু’হাজার করে গরু মারা হত। তাদের চামড়া রসুইখানায় রাখা হত। তা থেকে যে রস গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ত তাতে এক নদীর সৃষ্টি হয়। চর্ম থেকে উৎপত্তি বলে তার নাম চর্মণবতী।”
“বৎস, এ সব কি সত্যিই পুরাণে লেখা আছে?”
“হ্যাঁ দাদু, মহাভারতে পরিষ্কার লেখা আচে?”
“মহাভারতে ,অর্থাৎ পষ্ণম বেদে? গোমাংস ভক্ষণ!”
“রস্তিদেবের ওখানে অতিথিদের খাওয়ার জন্য এই গোমাংস রন্ধনের কজে দু’হাজার পাচক নিযুক্ত ছিল। সেই সঙ্গে ব্রাক্ষণ অতিথিদের সংখ্যাও এত বেড়ে উঠতে যে, মাংস কম পড়ে যাওয়ার বয়ে পাচকরা, মাংসের বদলে ঝোল বেশী করে নেবার অনুরোধ জানাত। মহাভারতেই আছে-
তত্র ম্ম সৃদাঃ ক্রাশান্তি সুমৃষ্টমণিকুলা
সৃপং ভৃয়িষ্ঠমশ্লীধ্বং নাদ্য মাংসং যথা পুরা”
ব্রাক্ষণেরা গোমাংস খেত, কি বলছ ভাই?”
“মহাভারত হচ্ছে পষ্ণম বেদ-তাতে কি মিথ্যা লেখা হতে পারে দাদু!”
“দুনিয়া কি এত ওলোট-পালোট হয়ে গেল?”
“উল্টে-পাল্টেই যায় দাদু, তবু নিজেদের খাঁটি ব্রাক্ষণ বলা এই সব দিবান্ধরা সকলের চোখেই ধুলো দিতে চায়। আমি ্কন বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের পূর্বজ যৌধেয়রা ব্রাক্ষণদের এই ছলাকৌশল ছড়াবার আগের যুগের ধর্ম এবং রীতিনীতি মেনে চলত।”
“হ্যাঁ, আর তারা কখনও ব্রাক্ষণকে নিজেদের চেয়ে উঁচু মনে করত না।”
“এখানে এসে তুমি পুত্র-ভ্রাত্বষ্পত্রের বিয়ে মাননীয় ব্রাক্ষণদের ছেড়ে নাগবদের সঙ্গে দিলে কেন?”
“দুটো কারণ ছিল। এক তো এই সব ব্রাক্ষণেরা আমাদের কুল সম্বন্ধে সন্দেহ করত; কিন্তু তাতে অবশ্য কিছু যেত-আসত না ইচ্ছে করলে আমরা খাঁটি ব্রাক্ষণ কন্যাকেই বিবাহ করতে পারতাম। নাগরদের সঙ্গে আমরা এই জন্যেই বিবাহস্বত্রে আবদ্ধ হলাম
*রাজ্ঞো মহানসে পূর্ব রস্তিদেবস্য বৈ দ্বিজ মহানদী চমারাশরুৎক্লেদাত সংস্বজে যতঃ
অহন্যতনি বধোতে দ্বে সহস্রে গবাং তথা ততশ্চর্ম দ্বতীত্যেবং বিখ্যাতা সা মহানদী”
“কিন্তু উত্তরাপথ (পাজ্ঞাব) এবং কাশ্মীরে এখনও হনেরা আছে, আচার্ষ!”
“বহূ ।ষ্ণল থেকেই তারা বিতাড়িত হয়েছে।”
“এমনিভাবেই ্ক রাজা অপরকে বিতাড়িত করে নিজ রাজ্য বিস্তৃত করে ।”
“কিন্তু গুপ্তবংশ গো-ব্রাক্ষণের রক্ষক।”
“আচার্য, মুঢ় ব্যক্তিদের ধোঁকা দেবার মতো এই সব কথা আমি আপনার মুখ থেকে শুনব আশা করি না। আপনি জানেন, আমাদের পুর্বজ ঋষিরা গো-রক্ষা করতেন গো-ভক্ষনের জন্য। ‘মেঘদুত’-এ আপনিই চর্মণবতীকে গো-হত্যা থেকে উদ্ভৃত রন্তিদেবের কীর্তি বলে বর্ণনা করেছেন-
“ব্যালম্বেথাঃসুরভিতনয়ালস্তজাং মানয়িষ্যন
স্রোতোমুর্ত্তা ডুবি পরিণতাং রস্তিদেবন্য কীর্তিম”
“তুমি ধুষ্ট সুপর্শ, যদিও তুমি আমার প্রিয় শিষ্য “
“আপনার তিরস্কার শুনতে আমি প্রস্তুত, কিন্তু আমি এটা সহ্য করতে রাজী নই যে আমার গুরু গণতন্ত্র হত্যাকারী গুপ্তরাজার সামনে চাটুকারের মতো পড়ে থাকবেন।”
“তুমি ওদের গণতন্ত্র-হত্যাকারী বলছ কেন সুপর্শ?”
“হ্যাঁ নন্দ, মৌর্ষ, শক আর হুনেরাও যে পাপ করেনি এই গুপ্তরা তাও করেছে। ভারতভুমি থেকে এরা, গণ-রাজ্যের নাম মুছে দিয়েছে।”
“গণ-রাজ্য এ যুগের অনুকূল নয় সুপর্ণ। যদি সমুদ্রগুপ্ত এইসব গণ-রাজ্যকে কায়েম রাখতেন, তবে তিনি হুন এবং অপরাপর প্রবল শত্রুদের পরাস্ত করতে পারতেন না।”
“সফলতা! নিজ রাজ্য কায়েম করবার! দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ম্যের্য হবার! কিন্তু চাণক্যের বিশ্ববিশ্রুত বুদ্ধির সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত মেীর্য –সাম্রাজ্যও বেশী দিন টেকেনি। বিক্রমাদিত্য আর কুমাগুপ্তও যাবৎচন্দ্রদিবাকর শাসন করবে না। কিন্তু এরা যে গণ-শাসনের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে দিয়েছে তা কোন ধর্মকর্মের জন্য? অনাদিকাল থেকে চলে আসা গণ-রাজ্যের গণ-শাসনকে উচ্ছেদ করা কি অধর্মের কাজ নয়?”
