মা আমাকে অনেক বোঝাল কিনউত আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। আমার চিত্ত যখন চঞ্চল, সে সময় আমার নাগর সহপাঠী এবং আত্মীয়দের আামার প্রতি সহানুভূতি ছিল। অথবা বলা যায়, আমরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম।
২
আরও কিছুকাল অতিবাহিত হল। আমি তের বছরের হয়ে উঠলাম এবং পাঠশালার শিক্ষা প্রায় সমাপ্ত হয়ে এল। বেদ, ঋগ্বেদ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ব্যাকরণ, নিরুক্ত এবং কিছু কাব্যও আমি পড়েছিলাম। আমার প্রতি গুরুদেবের স্নেহ ক্রমশ বেড়েই চলেছিল। তাঁর কন্যা বিদ্যা আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল। পাঠ মুখস্থ করতে আমি তাকে সাহায্য করতাম। গুরুদেব এবং গুরুপত্বীর ব্যবহার দেখে বিদ্যাও আমাকে খুব মান্য করত, আমাকে “ভাই-সুর্পণ’ বলে ডাকত। গুরু পরিবারে আমার কখনও দুঃসময় আসেনি, কারণ গুরুপত্নীর স্নেহ আমার কাছে মায়ের সমানই ছিল।
এই সময়ে আবার একদিন এক সহপাঠী আমাকে “জুঝওয়া’ বলে বিদ্রুপ করল সম্পূর্ণ অকারণেই। নিজেকে আমি তখন সকল দিক থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলাম। লেখা-পড়ায় আমি অত্যন্ত তীক্ষ্ণধী ছিলাম বলে সহপাঠীদের ঈর্ষা হত, এ ছাড়া বিদ্রুপের আর কোনো কারণ ছিল না। আমার প্রকৃতি গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। মন যে উত্তেজিত হত না, তা নয় কিন্তু আমি ধীরে ধীরে নিজেকে সংযত করতে শিখেছিলাম। আমার ঠাকুর্দার বয়স সত্তর বছরের ওপর। বহুবার আমি তাঁর কাছে দেশ-বিদেশের যুদ্ধ-অশান্তির কাহিনী শুনেছি। এত্ত শুনেছিলাম যে, তিনিই প্রথমে, আপন ভাই-এর সঙ্গে এই গ্রামে আসেন। ঠাকুর্দার কাছ থেকে আপন কুল সম্বন্ধে আসল কথা জানতে আমি দৃঢ়সঙ্কল্প হলাম।
গ্রামের পূর্বদিকে আমাদের আমবাগান ছিল। যথেষ্ট আম ফলেছিল সেখানে, যদিও পাকতে তখনও দেরী। সোনাদাসী ইতিমধ্যেই সেখানে নিজের ডেরা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। শুনেছি, আমার ঠাকুর্দা যখন গ্রামে এলেন তকন সোনাকে তিনি কোনো দক্ষিণদেশীয় ব্যাপারীর কাছ থেকে চল্লিশ রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে কিনেছিলেন। ঐ সময় দক্ষিণ-দেশ থেকে বহু ব্যবসায়ী বিক্রয় করবার উদ্দেশ্য দাস-দাসীদের সঙ্গে করে নিয়ে আসত। সোনা তখন যুবতী চিল, না হলে দাসীরা কখনেই অত মহার্ঘ হয় না। সোনার দেহের কালো চামড়া ঢিলে হয়ে পড়েছিল, মুখমণ্ডল কুঞ্চিত বলিরেখায় ভরে গিয়েছিল, কিন্তু লোকে বলে, একদিন সে সুন্দরী ছিল। সে ছিল ঠাকুর্দার অ্যন্ত প্রিয়পাত্রী; বিশেষ করে যখন নিরালয় শুধু দু’জনে একত্রে থাকত। লোকে অবশ্য এই ঘনিষ্ঠতার অন্য অর্থ করত। বিপত্নীক স্বাস্থ্যবান এক প্রৌঢ় ব্যক্তির ওপর সে সন্দেহ খুবই স্বাভাবিক। সন্ধ্যাবেলা ঠাকুর্দা বাগানে যেতেন, একদিন আমিও তাঁর সঙ্গে গেলাম। ঠাকুর্দা আপন মেধাবী পৌত্রকে বড়ই স্নেহ করতেন। কথা বলতে বলতে আমি এক সময় বললাম, “দাদু, আমি তোমার কাছ থেকে আমাদের কুল সম্বন্ধে সত্যি কথা জানতে চাই, কেন লোকে আমাদের খাঁটি ব্রাহ্মণ বলে স্বীকার করে না, কেন‘জুঝওয়া’ বলে বিদ্রুপ করে? মাকে আমি কতবার জিজ্ঞাসা করেছি, কিন্তু তিনি আমাকে এ সম্বন্ধে কিছুই বলতে চান না।”
“এ কথা তুমি কেন জিজ্ঞেস করছ ভাই?”
“বিশেষ প্রয়োজন আছে দাদু। যদি আমি আসল কথা সঠিকভাবে জানতে পারি, তবে নিজ কুলেয় অপমানের প্রতিকার করতে পারব। ব্রাহ্মণদের সম্বন্ধে আমি এখন অনেক কিছু পড়ে ফেলেছি দাদু। আমার এতখানি বিদ্যাবল আছে যে, নিজের কুল সম্মান আমি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারব।”
“সে কথা আমি ও বিশ্বাস করি। কিন্তু ভাই, তোমার মা বেচারীও আামার কুল সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানে না। কাজেই, সে যে কিছু বলতে চায় না—এমন ভেব না। পৃথিবীতে আমাদের কুলের স্থিতি এখন নাগদত্তের সঙ্গে সম্বন্ধসুত্রে আবদ্ধ। আমাদের বিবাহ ইত্যাদি ওদের সঙ্গেই হয়। অবন্তী এবং লাট-এ (গুজরাট) ওদের সংখ্যাও অনেক, এ জন্য ওদের সঙ্গেই আামদের ডুবতে-ভাসতে হয়। তোমার বংশ যৌধেয় অপেক্ষা নাগরদের সঙ্গেই অধিক সম্পর্কিত।”
“যৌধেয় কি দাদু?”
“আমাদের কুলের নাম ভাই। এই জন্যেই লোকে আমাদের ‘জুঝওয়া’ বলে।”
“যৌধেয়রা কি ব্রাহ্মণ ছিল না দাদু?”
“ব্রাহ্মণের চেয়েও শুদ্ধ আর্য ছিল।”
“কিন্তু ব্রাহ্মণ তো নয়!”
“এর উত্তরে এক কথায় ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’ বলার চেয়ে তোমাকে যৌধেয়দের সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়াই ভাল। যৌধেয়রা শতদ্রু এবং যমুনার মধ্যবর্তী হিমালয় থেকে মরুভূমি পর্যণ্ত বিস্তৃত অঞ্চলের অধিবাসি এবং সমগ্র যৌধেয় পরিবারই এই অঞ্চলের অধিকারী ছিল।”
“সমগ্র যৌধেয় পরিবার?”
“হ্যাঁ, তাদের কোনো একজন রাজা ছিল না, তাদের রাজ্যকে গণরাজ্য বলা হত। গণ বা পঞ্চায়েতই সকল রাজকার্য চালাত। তারা এক রাজার শাসনাধীন রাজত্বের অত্যন্ত বিরোধী ছিল।”
“এমন-রাঝ্যের কথা তো কোনোদিন শুনিনি দাদু?”
“কিন্তু এমন দেশই ছির ভাই। আমার কাছে যৌধেয় গণরাজ্যের তিনটি মুদ্রা আছে, আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। দেশ ছেড়ে আাসবার সময় তাঁর সঙ্গে যে মুদ্রা ছিল, এগুলো তারই এক অংশ।”
“তুমি যৌধেয়দের দেশেই জন্মছিলে দাদু?”
“আমার বাবা-মাকে যখন দেশ ছাড়তে হল, আমি তখন দশ বছরের। আমার দু’জন বড় ভাই ও ছিল, যাদের বংশধরদের তু্মি এখানে দেখছ।”
“দেশ কেন ছাড়তে হল দাদু?”
“পুরকার থেকে ও জায়গা যৌধেয়দেরই ছিল। বহু প্রতাপশালী রাজা-মৌর্ষ, যবন, কেউেই রাজকর আদায় করা ছাড়া আমাদের গণরাজ্যকে কোনো আঘাত করেনি। চন্দ্রগুপ্ত, যিনি নিজেকে বিক্রমাদিত্য বলেন, এবং উজ্জয়িনীতে যাঁর দরবার বসে, সেই চন্দ্রগুপ্তের পূর্বপুরুষ যখন সিংহাসনে বসল, তখন তারা যৌধেয়দের উচ্ছেদ করল। যৌধেয়রা প্রতাপশালী সম্রাটকে কিছু কর দিত, কিন্তু সম্রাট তাতে খুশী হলেন না। তিনি বললেন, ‘আমি এখানে উপরিক (গর্ভনর) নিযুক্ত করব। এখানে আমার নিজের কুমারমাত্য (কমিশনার) থাকবে। আমি আমার সমগ্র রাজ্য যেভাবে শাসন করি, এখানেও তেমনি করব। আমাদের গণ-নায়কগণ অনেক করে বোঝাল যে, যৌধেয়রা অনাদিকাল থেকে গণ-শাসন ছাড়া অপর কোনো-শাসন জানে না; কিন্তু ক্ষমতামদমত্ত রাজা সে কথা মানে কেন? অবশেষে যৌধয়রা আপন ইষ্ট গণদেবীর সামনে শপথ গ্রহণ করে তরবারি ধরল। বহুবার তারা গুপ্ত-সেনানীকে মেরে হঠিয়ে দিল । যৌধেয়দের তুলনায় চার-পাচঁ গুণ বেশী সৈন্যনিয়েও গুপ্তসেনানীরাটি কতে পারত না। বিন্তু ব্রক্ষপুত্র থেকে মরু অষ্ণল পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের সমগ্র সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্দে যৌধেয়রা কতক্ষণ আপনাদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে পারে? গুপ্তদের সৈন্যেরা আমাদের শহর-গ্রাম সমস্ত ধ্বংস করে ুদল, নারীদের নৃশংসভাবে হত্যা করল। আমাদের লোকেরা ত্রিশ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়েছিল। বেশী রে দিতেও তারা প্রস্তুত ছিল, কিন্তু চেয়েছিল, তাদের গণ-শাসন ব্যবস্থা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।”
