অবন্তীর (মালবা) এক গ্রামে ক্ষিপ্রা নদীতটে আমি জম্মগ্রহণ করেছি। আমার কুলের লোকের নিজেদের পরিব্রাজক বলে, যদিও এদের আপন ক্ষেত-খামার , ঘর-বাড়ি বয়ে গেছে এবং সেগুলো আপন স্বন্ধে বহন করে স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়া চলে না । আমাদের কুলের লোকেদের দেহের গড়ন এবং রঙ ও রুপ গ্রামের অন্যান্য লোকজন থেকে কিছুটা পৃথক। আমরা অধিকতর দীর্ঘ, গৌর এবং সেই সঙ্গে আমাদের উৎকর্ষ অন্যদের কাছে ছিল অসহ্য।
১২. সুপর্ণ যৌধেয় (কাল : ৪২০ খৃষ্টাব্দ)
আমার ভাগ্যচক্ত যেন কেমন! কখনও এক জায়গায় স্থির থাকতে পারিনি। সংসার মরঙ্গ আমাকে সর্বদা চষ্ণল এবং বিহবল করে রেখেছে। জীবনে মধুর দিনও এসেছে যদিও তিক্ত দিনগুলোর তুলনায় সংখ্যায় কম আর পরিবর্তন তো যেন বর্ষাশেষে বাদলা দিনের মতো, বৃষ্টি আর রৌদ্রে লুকোচুরি । জানি না, এই পরিবর্তনের চক্ত কেন ঘুরছে।
পশ্চিম উত্তরাপথ গাদ্ধারে এখনও মধুপর্কে বাছুরের মাংস দেওয়া হয়। কিন্তু মধ্যদেশে (উত্তপ্রদেশ, বিহার) গোমাংসের নাম করা পাপ, এখানে গো-ব্রাক্ষণ রক্ষা করাই শ্রেষ্ট ধর্ম। আমি বুঝে উঠতে পারি না, একই ধর্মে এত বৈপরীত্য কেন! এক জায়গার অধর্ম কি অপর জায়গায় ধর্ম রুপে চলতে থাকবে; অথবা এক জায়গার পরিবর্তন আগে সাধিত হয়েছে, অন্যত্র পরে তার অনুকরণ করবে?
অবন্তীর (মালবা) এক গ্রামে ক্ষিপ্রা নদীতটে আমি জম্মগ্রহণ করেছি। আমার কুলের লোকের নিজেদের পরিব্রাজক বলে, যদিও এদের আপন ক্ষেত-খামার , ঘর-বাড়ি বয়ে গেছে এবং সেগুলো আপন স্বন্ধে বহন করে স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়া চলে না । আমাদের কুলের লোকেদের দেহের গড়ন এবং রঙ ও রুপ গ্রামের অন্যান্য লোকজন থেকে কিছুটা পৃথক। আমরা অধিকতর দীর্ঘ, গৌর এবং সেই সঙ্গে আমাদের উৎকর্ষ অন্যদের কাছে ছিল অসহ্য। আমার মা গ্রামের স্ত্রীলোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা সুন্দরী ছিলেন, তাঁর সুগৌর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে-পড়া বাদামী চুলে—বড়ই সুন্দর লাগত। আমাদের পরিবারের লোক নিজেদের ব্রাহ্মণ বলত,কিন্তু আমি লক্ষ্য করতাম গ্রামের লোকের তাতে সন্দেহ রয়ে গেছে। সন্দেহের কারণও ছিল্ এইস্থানে ব্রাহ্মণদের ভিতর সুরাপান মহাপাপ বলে গণ্য হত, কিন্তু আমাদের গ্রহে তা বরাবর তৈরী হত িএবং পান করা হত। উচ্চকুলে স্ত্রী-পুরুষের সম্মিলিত নাচ-গান এখানে অশ্রুতপূর্ব, কিন্তু আমাদের কুলের সাতটি পরিবার—যারা একই বংশজাত, সন্ধ্যা হলেই খোলা জায়গায় এক সঙ্গে মিলিত হতাম। শৈশবে আমি ভাবতাম, সকল জায়গাতেই এই একই নিয়ম,কিন্তু গ্রামের অন্যান্য বালকদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে তাদের বিদ্রুপ বাক্যে বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাদের অদ্ভুত ধরনের মানুষ বলে মনে করে এবং আমাদের কৌশীদ্যকে স্বীকার করলেও ব্রাহ্মণত্বকে সন্দেহ করে। আমাদের গ্রামখানা বেশ বড়, দোকান এবং ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরও ছিল। গ্রামে কিছু নাগর পরিবার ছিল, লোকে তাদের বেনে বলত, কিন্তু তারা আমাদের মতোই নিজেদের ব্রাহ্মণ বলত। কিছু নাগর-কন্যা বিবাহসুত্রে আমাদের কুলে এসেছিল, গ্রামের লোকদের আমাদের ব্রাহ্মণ বলে স্বীকার না করবার এটাও একটা কারণ। তাদের ব্ক্তব্য, ব্রাহ্মণের পান-ভোজন-বিবাহ রীতি অবহেরা করে আমরা কি করে ব্রাহ্মণ থাকতে পারি? আমার খেলার সাথী ছেলেদের যদি কখনও আমার ওপর রাগ হত তবে আমাকে ‘জুঝওয়া’ বলে অবজ্ঞায় নাক সিঁটকাত। এ সম্বন্ধে মাকে আমি অনেকবার প্রশ্ন করেছি, কিন্তু তিনি আমার প্রশ্নকে বরাবর এড়িয়ে গিয়েছেন।
দশ বছর বয়স হল আমার, গ্রামের েএক ব্রাহ্মণ গুরুর পাঠশালায় পড়তে যেতে লাগলাম। আমার সহপাঠীরা প্রায় সকলেই ব্রাহ্মণ—লোকের কথা অনুসারে সকলেই খাঁটি ব্রাহ্মণ। এরা ছাড়া আমি এবং অপর দুই নাগর বিদ্যার্থী ছিলাম। সহপাঠীরা আমাদের আধা-ব্রাহ্মণ বলে ডাকত। বিদ্যার্থীগণের মধ্যে আামি সবচেয়ে তীক্ষুধী ছিলাম এবং আমার প্রতি গুরুর বিশেষ স্নেহ ছিল। আামদের কুলে স্বভাব আমার মধ্যেও ছিল, এবং কারও কথা সহ্য না করে তার সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করতাম। একদিন আমার এক সহপাঠী বিদ্রুপ করে বলল, “ব্রাহ্মণ হয়েছে, জুঝওয়া কোথাকার!” আমার কাকার বাল্যকপুত্র আমার পক্ষ নিতে এসেছিল, তাকেও বলল,“যবন কোথাকার, নাগর ব্রাহ্মণ হয়েছে!” শৈশবে ছোট ছেলেদের এমনি খোঁটা দিতে শুনেছি, কিন্তু তখনও সে সব আমাকে এত তীব্রভাবে আঘাত করেনি, অথবা ওতে এত কিছু ভাববারও অবকাশ হয়নি! আমরা তিনজন ছাড়া পাঠশালায় আরও ত্রিশজন বিদ্যার্থী এবং চারজন বিদ্যাথিণীও ছিল। এরা দেখতে আমাদের মতো ফর্সা বা দীর্ঘকায় নয়, তবু তারা এমন ভাব দেখাত যেন আমরা তাদের তুলনায় নিন্মশ্রেণীর মানুষ!
সেদিন ঘরে ফিরে এলে আমাকে বড়ই বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। আমার শুষ্ক অধর দেখে মা আমার মুখ-চুম্বন করে বললেন, “আজ এত বিমর্গকেন তুই?”
মা অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করাতে আমি বললাম, “মা, আমাদের কুলে কি এমন দোষ আছে , যে জন্য লোকে আমাদের ব্রাহ্মণ বলে স্বীকার করতে চায় না?”
“পুত্র, আমরা পরদেশী ব্রাহ্মণ, এ জন্য তারা এ রকম ভাবে।”
“শুধু বাহ্মণ নয় মা, অব্রাহ্মণেরাও আমাদের ব্রাহ্মণত্বে সন্দেহ প্রকাশ করে।”
“ব্রাহ্মণেরা বলে বলেই অন্যরাও বলে।”
“আামাদের যজমানীও নেই; অন্র ব্রাহ্মণেরা পুরোহিতগিরি করে, ব্রাহ্মণ-ভোজনে যায়, আমাদের কুলে তাও দেখা যায় না। এ ছাড়া অন্য ব্রাহ্মণেরা তো আমাদের সঙ্গে পংক্তি ভোজনেও সম্মত হয় না। যদি এর কারণ জানো তবে বল মা।”
