প্রভার মা তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় যাচ্ছ বাবা?”
“ভদন্ত ধর্মরক্ষিতের সঙ্গে দেখা করতে, আর সরধুকে দেখতেও বটে।”
“ভদন্ত ধর্মরক্ষিত নীচেই বসে আছেন । আর সরধু দেখতে আমিও যাব তোমার সঙ্গে।” কথা বলতে বলতে গলা ধরে গেল তাঁর
নীচে গিয়ে ধর্মরক্ষিতকে পস্কপ্রতিষ্ঠিত হয়ে বন্দনা করে অশ্বঘোষ বলল, “ভদন্ত, এ-বারে আমাকে সঙ্গে গ্রহণ করুণ।”
“বৎস, তোমার শোক নিদারুণ।”
“শোকের তাড়নায় আমি বলছি না, প্রভা…..জম্ন্য আমাকে তৈরী করে গিয়েছে।”
“ত’হলেও তোমাকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে, সঙ্গ এত তাড়াতাড়ি তোমাকে গ্রহণ করবে না।”
“প্রতীক্ষা আমি করব ভদন্ত, কিন্তু সঙ্গের আশ্রয়ে থেকে।”
“প্রথমে তোমার পিতার কাছ থেকে সম্মতি আনতে হব। মাতা-পিতার সম্মতি ছাড়া সঙ্গ কাউকে ভিক্ষু হিসাবে গ্রহণ করে না।”
“তা’হলে আমি অনুমতি নিয়েই আসব।”
ঘর থেকে বেরিয়ে এল অশ্বঘোষ। প্রভার মা তার সুস্থ মস্তিকের কথাবার্তা শোনার পরও শস্কিত হয়েই ছিলেন, তাই তিনিও পিছে পিছে এলেন । নৌকা করে সরযুর জলে সারা দিন দু;জনে খোঁজার পরও কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না প্রভার
। পরের দিন আরও এগিয়ে গিয়ে খোঁজ হল, কিন্তু কোথাও কিছু নেই।
বাড়ি গিয়ে অশ্বঘোষ পিতার কাছে ভিক্ষু হওয়ার জন্য অনুমতি চাইল, কিন্তু একমাত্র পুত্রকে কি করে তিনি অনুমতি দেবেন এ পথে যাবার জন্য ! অশ্বঘোষ বলল, “মা আর প্রভার শোকে অস্থির হয়ে আমি এ পথ করতে যাচ্ছি না বাবা। নিজের জীবনে আমি যে কর্মধারা গ্রহণ করছি, এইট তার রাস্তা । তুমি দেখছ না আমার কন্ঠস্বরে, আমার আচরণে কোথাও চিত্তবিকারের এতটুকু লক্ষণ নেই। আমি আর একটা কথাই শুধু বলব-যদি আমাকে জীবিত দেখতে চাও তবে সম্মতি দাও পিতা।”
“কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাববার সময় দাও……”
“আমি সাতদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজী পিতা ।”
পরের দিন চোখের জলে ভেসে অশ্বঘোষকে ভিক্ষু হবার সম্মতি দিলেন তিনি।
সাকেতের আর্ষ সর্বান্তিবাদ সঙ্গ অশ্বঘোষকে ভিক্ষুরুপে গ্রহণ করল। মহাস্থবির ধর্মসেন হলেন অশ্বঘোষের উপাধ্যায় এবং ভদন্ত ধর্মরক্ষিত হলেন তার আচার্য । নৌকাযোগে ভদন্ত ধর্মরক্শিতের পাটলিপুত্র যাবার কথা ছিল , তাঁর সঙ্গে অশ্বঘোষও সাকেত ত্যাগ করল।
পাটলিপুত্রস্ত অশোকারামে (মঠ) ভিক্ষু অশ্বঘোষের দশ বছর কেটে গেল । ‘বৌদ্ধধর্ম, বৌদ্ধদর্শন এবং যবন-দর্শন সম্পকে গভীর অধ্যায়ন করল সে। মগধের মহাসঙ্গের বিদ্বান মশুলীতে অশ্বঘোষের স্থান ছিল অনেক উঁচুতে । এই সময় পশ্চিম থেকে শক সম্রাট কণিক পূর্বাষ্ণল জয় করবার জন্য পাটলিপুত্রে এসে উপস্থিত হল। পাটলিপুত্র এবং মগধ এই সময় বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল্ বৌদ্ধধর্মের প্রতি কণিকের ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। গাদ্দারে নিয়ে যাবার জন্য ভিক্ষুসঙ্ঘ থেকে একজন বিদ্ধান ব্যক্তিকে চেয়ে পাঠাল কণিক। সঙ্ঘ অশ্বঘোষকে পাঠিয়ে দিল।
রাজধানী পুরুষপুর (পেশোয়ার) গিয়ে অশ্বঘোষ দেখল, সেখানে শক, যবন, তুসস্ক, পারশী তথা ভারতীয় সংস্কৃতির একত্র সমাবেশ। যবন নাট্যকলাকে অশ্বঘোষ আগেই ভারতীয় সাহিত্যে স্থান দিয়েছিল। যবন-দর্শনের গভীর অনুশীলনের পর, তার বহু বিশেষত্ব, বিশ্লেষণ-শৈলী এবং অনুকূল তত্ত্বসমূহকে নিয়ে ভারতীয় দর্শন, বিশেষ করে বৌদ্ধদর্শনকে সে সমৃদ্ধ করে তোলে। বৌদ্ধদের যবন-দর্শন গ্রহণ করবার পথও প্রশন্ত করে দেয় অশ্বঘোষ। তার পরে অপরাপর ভারতীয় দার্শনিকেরাও এই চেষ্টা করেছে এবং বৈশেষিক আর ন্যায়ের পথে সকলের আগে আগে চলেছে। পরমাণু , সামান্য দ্রব্যগুণ, অবয়বী ইত্যাদি তত্ত্ব এরা যবনদের নিকট থেকেই গ্রহণ করেছে।
অশ্বঘোষের হৃদয়কে বিশাল করে দিয়েছিল প্রভা, কাজেই তার কাছে আম্নপর ভেদ ছিল না। প্রভার প্রেরণায় সে বহু কাব্য আর নাটক লেখে। তার অনেক কিছুই আজ লুপ্ত হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও প্রকৃতি তার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন ছিল, তাই উনিশ শত বছর পরে মধ্য এশিযার মহাবালুাকরাশি গোবী অশ্বঘোষের ‘সারিপুত্ত’প্রকরণকে (নাটক) মানুষের হাতে তুলে দেয় [জর্মন ভারত-তাত্ত্বিক অধ্যাপক লুডার্স ১৯১১ খৃষ্টব্দে সারিপুত্ত প্রকরণ নাটকের তালপত্রে লিখিত খন্ডিত পুতি আবিষ্কার করেন]। অশ্বঘোষের ‘বুদ্দ-চরিত্র;আর‘সৌন্দরান্দ’দুই অমর কাব্য।
প্রভার কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল তাকে যথাযথভাবেই পালন করেছিল সে এবং প্রভার অম্লান সৌন্দর্যরাশি তার কাব্যকে সুন্দরতম করে তুলেছিল। জম্মভূমি সাকেত এবং মাতা সুবর্ণাক্ষীকে কখনও সে বিষ্মত হয়নি। আপন গ্রস্থসমূহে সর্বদাই নিজের নাম লিখত ‘সাকেতবাসী আর্ষ-সুবর্নাক্ষী পুত্র অশ্বঘোষ’।
আমার ভাগ্যচক্ত যেন কেমন! কখনও এক জায়গায় স্থির থাকতে পারিনি। সংসার মরঙ্গ আমাকে সর্বদা চষ্ণল এবং বিহবল করে রেখেছে। জীবনে মধুর দিনও এসেছে যদিও তিক্ত দিনগুলোর তুলনায় সংখ্যায় কম আর পরিবর্তন তো যেন বর্ষাশেষে বাদলা দিনের মতো, বৃষ্টি আর রৌদ্রে লুকোচুরি । জানি না, এই পরিবর্তনের চক্ত কেন ঘুরছে।
পশ্চিম উত্তরাপথ গাদ্ধারে এখনও মধুপর্কে বাছুরের মাংস দেওয়া হয়। কিন্তু মধ্যদেশে (উত্তপ্রদেশ, বিহার) গোমাংসের নাম করা পাপ, এখানে গো-ব্রাক্ষণ রক্ষা করাই শ্রেষ্ট ধর্ম। আমি বুঝে উঠতে পারি না, একই ধর্মে এত বৈপরীত্য কেন! এক জায়গার অধর্ম কি অপর জায়গায় ধর্ম রুপে চলতে থাকবে; অথবা এক জায়গার পরিবর্তন আগে সাধিত হয়েছে, অন্যত্র পরে তার অনুকরণ করবে?
